ইতি-নেতি-ঢাকা : নগর ও নাগরিক কে কারে বধিবে? by মাসুদা ভাট্টি

গণমাধ্যম, উগ্রবাদ ও বাকস্বাধীনতা বিষয়ক একটি সেমিনারে অংশ নিতে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা যাওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সাত বছর পর আবার জাকার্তার মাটিতে পা রেখে ভেবেছিলাম, এ সাত বছরে শহরটির কী কী পরিবর্তন হলো তা বোঝার চেষ্টা করব। প্রথমেই বিমানবন্দর দেখে চমকে উঠলাম।


বিমানবন্দরটিকে যে কেউ ইন্দোচীনের মন্দির আকৃতির বসতবাড়ি বলে ভুল করতে পারেন। একতলা ভবনটির বিশেষত্ব হচ্ছে, দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং অত্যন্ত সুচারুভাবে যাত্রীদের সুবিধাদি নিশ্চিত করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সুকর্ন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হাত্তার নামানুসারে এ বিমানবন্দরের নামকরণ করা হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে বেরোলেই যে সুপ্রশস্ত রাস্তা রাজধানীর দিকে এগিয়েছে তা মূলত উড়াল সেতু। সেতুর দুই পাশে ম্যানগ্রোভ বা সুন্দরী গাছ আর গোলপাতার বাদা জঙ্গল। বর্ষাকাল বলে অপূর্ব সব রঙিন ফুল ফুটে আছে। আর গাছপালাগুলো যে কী সতেজ তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না, অন্তত ঢাকায় বসে ওরকম সতেজতার আন্দাজ করাটা কঠিন। রাজধানীর দিকে একটু এগোতে শুরু করতেই সাত বছর আগে দেখা জাকার্তার চেহারার সঙ্গে নতুন এ চেহারা মেলাতে দৃষ্টিবিভ্রম হয়। সুউচ্চ সব ভবন, উজ্জ্বল রোদ সেসব ভবনের কাচে প্রতিবিম্বিত হয়ে ফিরে আসে নিজেরই কাছে। যতই শহরের কেন্দ্রের দিকে এগোনো যাবে ততই এ চাকচিক্য, ঔজ্জ্বল্য বেড়ে জাকার্তাকে মনে হতে থাকে নিউ ইয়র্ক কিংবা শিকাগোর মতো। পার্থক্য শুধু সবুজে, এই শহরে এ ইটের পাহাড়ের মাঝেও সবুজ রঙের ব্যাপক উপস্থিতি, বর্ষায় ফুল আসায় সেই সবুজ যেন আরো ভিন্নতা পেয়েছে। আরো একটি পার্থক্য ক্রমশ জাকার্তা শহরকে ভিন্ন করে তোলে, তা হলো এই শহরে বলতে গেলে কোনো 'ফুটপাত' বা পথচারীর চলাচলের জন্য কোনো রাস্তা নেই। তবে কি এ শহরের কারোরই হাঁটার প্রয়োজন পড়ে না? নাকি এ শহরে হেঁটে ঘুরে বেড়ানোর মতো কোনো সাধারণ মানুষ নেই? ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি কি এতটাই সুদৃঢ় যে, এখানে সবাই নিজেদের চলার জন্য যন্ত্রবাহনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে?
এ রকম অনেক প্রশ্ন নিয়ে কোনো জাকার্তাবাসীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁরা প্রথমেই শহরের নিন্দা করেন। এ ব্যাপারে ঢাকাবাসীর মতোই তাঁরা নিন্দামুখর, কিন্তু এ শহর ছেড়ে অন্যত্র যেতেও রাজি নন। কেন এ শহর ছেড়ে যাচ্ছেন না, জানতে চাইলে বলেন, 'না না, এ শহরকে আমরা খুবই ভালোবাসি।' জাকার্তা শহরের ভেতরে-বাইরে, চতুর্দিকে অসংখ্য সুপ্রশস্ত ব্যুলভার্ড, যার মাঝে অপূর্ব সব গাছের সারি। রেইন ফরেস্ট বেল্টভুক্ত বলেই হয়তো জাকার্তাকে মনে হচ্ছিল বৃষ্টিধোয়া সবুজ বন কিংবা ঢাকা থেকে যাওয়ায় খুব সহজেই দুই শহরের সঙ্গে তুলনায় ঢাকার সবুজহীনতা প্রকট হয়ে চোখে লাগছিল। মজার ব্যাপার হলো, এসব সুপ্রশস্ত রাস্তা ব্যবহার করতে প্রত্যেককেই এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় প্রবেশের আগে টোল গুনতে হয়। এ টোলের পরিমাণ কিন্তু কম নয়। অন্যদিকে জাকার্তায় পাবলিক ট্রান্সপোর্টের এত স্বল্প আয়োজনও চোখে পড়ার মতো। কয়েকটি বাস সার্ভিস রয়েছে, যা আসলে মেট্রোর মতোই, বাস থেকে ওঠা-নামার দরজাগুলো অনেক উঁচুতে, যাতে চাইলেই যেখানে সেখানে কেউ নামতে না পারেন, একটি নির্দিষ্ট বাস স্টপে যেখানে উঁচু বেদির স্টেশন, সেখানেই কেবল যাত্রীরা উঠতে বা নামতে পারেন। কর্মদিবসেও যাত্রীদের খুব একটা ভিড় চোখে পড়েনি এসব বাসে। এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হলো, এখানকার সাধারণ মানুষের বেশির ভাগই মোটরসাইকেল ব্যবহার করে থাকেন, কী নারী, কী পুরুষ_সবাই মোটরসাইকেলেই অভ্যস্ত। আবারও তুলনাটা এসে যায় ঢাকার সঙ্গে। ঢাকায় পুরুষরা মোটরসাইকেল আগের চেয়ে বেশি ব্যবহার করলেও দু'একজন নারী ছাড়া ঢাকায় মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী দেখাই যায় না। ঢাকায় যদি মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ানো যায় তাহলে কি এ শহরের যান-যন্ত্রণা (দুঃখিত এখন আর এই শহরে যানজট ঘটে না, ঘটে যানযন্ত্রণা) কিছুটাও কি কমবে না? নগরবিদরা কী বলেন?
ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা মালয়েশিয়ার মতো শনৈঃ শনৈঃ না হলেও খারাপ নয়। তবে ঢাকার তুলনায় নিঃসন্দেহে ভালো। এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়, নগর পরিকল্পনা, নগর ব্যবস্থাপনা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় জাকার্তা বহু এগিয়ে আছে। শহরের রাস্তায় কোনো ভিক্ষুকের দেখা না পেয়ে জাকার্তাবাসীর কারো কারো কাছে কারণটা জানতে চেয়েছিলাম, আগে বহু ভিক্ষুক সেখানে দেখেছি। উত্তরে জানালেন, যাঁরা ভিক্ষাবৃত্তি করতেন তাঁদের কাজ দেওয়া হয়েছে। কেমন কাজ? রাস্তার পাশে ছোট্ট ঠেলা-ভ্যানগুলো যে রয়েছে, যাতে বিক্রি হচ্ছে কখনো খাবার, কখনো অন্যান্য জরুরি জিনিসপত্র, সরকার থেকে তাদের অর্থ সাহায্য দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এ কাজে। জাকার্তার নারী-পুরুষ কর্মক্লান্ত দিন শেষে এদের কাছ থেকে ঘরে তৈরি করা খাবার কিনে নিয়ে বাড়ি ফেরে এবং নিজেদের বাড়তি রান্নার চাপ থেকে রক্ষা করে। ব্যাপারটা মন্দ লাগেনি। বরং মনে হয়েছে, বেশ ভালো তো, যদি ঢাকার রাস্তায়ও এ রকম ঘরে তৈরি খাবার বিক্রি হয় এবং তাতে ভিক্ষাবৃত্তি খানিকটা লাঘব হয়, মন্দ কী?
রাজধানী জাকার্তা এবং ঢাকা নিয়ে যখন এ রকম চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তখন দি ইকোনমিস্টে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা নজরে এল, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস-উপযোগী ও অনুপযোগী শহরের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। ঢাকার ওপরে স্থান করে নিয়েছে জিম্বাবুয়ের হারারে শহর। আর পৃথিবীর সবচেয়ে বসবাস-উপযোগী শহর কোনটি? টানা পাঁচবারের মতো এবারও কানাডার ভ্যাংকুভার। ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ার এ শহর কেবল প্রকৃতির কারণে নয় নগর পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, যানবাহন, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ইত্যাদি বহু সূচকেই সবচেয়ে এগিয়ে আছে। এ তালিকায় সবচেয়ে বেশি স্থান জুড়ে যেগুলো প্রশংসনীয় স্থানে রয়েছে এর বেশির ভাগই অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের শহর। আর বসবাসের অনুপযোগীর তালিকায় প্রথম দশে ঢাকার সঙ্গে ভারত উপমহাদেশের আরো দুটি শহর রয়েছে_করাচি ও কলম্বো।
মনে আছে, গত বছর এ তালিকা দেখে একটি লেখা লিখেছিলাম, যার শিরনাম ছিল, 'ঢাকা তোমার যতন জানিনে', এবারও জাকার্তার সঙ্গে ঢাকার তুলনা টানতে হচ্ছে এবং মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন ডালপালা মেলছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে ঢাকাকে সাজানো হয়েছে বর্ণিল সাজে, ভিআইপি রোডের দুই পাশের ভবনগুলোর ময়লাক্লিষ্ট দেয়ালে রং ফেরানো হয়েছে। তাতে তার সৌন্দর্য বেড়েছে বলে মনে হয়নি, বরং চিন্তাক্লিষ্ট মুখে প্রসাধন দিলে যেমন অসৌন্দর্য আরো বাড়তি মনে হয় সে রকমটাই লাগছে। বিদেশি অতিথিরা হয়তো বিষয়টি বুঝতে পারবেন না কিন্তু আমরা যারা এ শহরে দিনরাত ঘুরি-ফিরি তাদের চোখে তা লুকানো সম্ভব নয়। সবচেয়ে কষ্ট হয় ঢাকার সবুজহীনতায়। এমনকি যতটুকু সবুজ আছে তাও ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে থাকে। এ এক তীব্র বিষাদের কথা। এ বিষাদে আক্রান্ত এ নগরীর গরিষ্ঠজন। আর এ বিষাদ থেকে বেরিয়ে বাইরে কোথাও আশ্রয় গ্রহণের সুযোগও যে আমাদের নেই, এ অসহায়ত্ব থেকে জন্ম নেওয়া অসম্ভব এক ক্রোধ নিয়ে বেঁচে থাকি আমরা, এ নগরীর প্রায় দুই কোটি বাসিন্দা। এ অসহায় ক্রোধে হয় নিজের চুল ছেঁড়া বা আঙুল কামড়ানো যায় কিংবা অন্যকে অহেতুক আক্রমণ করা যায়। ধৈর্যের বাঁধ ছিঁড়লে কী অবস্থা দাঁড়ায়, তা ঢাকার রাস্তায় যাঁরা নিয়মিত বের হন তাঁরা অনুধাবন করতে পারবেন। ছোটখাটো হাতাহাতি, মারামারি আর মৌখিক গালিময় দুর্ঘটনা প্রতিদিন ঘটে, তার হিসাব আসলে এ শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা চিন্তিত তাঁদের গবেষণার বিষয় হতে পারে।
একটি জায়গায় অবশ্য জাকার্তা শহরের সঙ্গে ঢাকার দারুণ এক মিল রয়েছে। সেই মিলটি হচ্ছে, জলবায়ুজনিত কারণে যে কটি শহর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে তার প্রথম দশটির তালিকায় ঢাকার সঙ্গে জাকার্তাও রয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক দপ্তর গত বছর এ তালিকা প্রকাশ করেছে এবং বলা হয়েছে, এ শহরগুলোর বেশির ভাগই ক্রমশ সুপেয় পানির স্তর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং বন্যাঝুঁকির সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার কথা বলা হয়েছে যে, ঢাকা শহরটি ক্রমশ নিচের দিকে দেবে যাচ্ছে এবং এখানকার পানীয় জলের স্তর ইতিমধ্যেই এত দূরে নেমেছে যে শহরটির দুই কোটি মানুষ খুব দ্রুত পানিসংকটে পড়তে যাচ্ছে। এটা অবশ্য শুধু ঢাকা নয়, গোটা বাংলাদেশেরই চিত্র। জানি না, রবীন্দ্রনাথ এ কারণেই লিখেছিলেন কি না, 'আমি জলেরও মাঝারে বাস করি তবু তৃষ্ণায়ও শুকায়ে মরি, প্রভু দয়া করো হে' কিংবা লালন লিখেছিলেন না কি, 'ফকির লালন মরলো জল পিপাসায় রে, কাছে থাকতে নদী মেঘনা, ও যার আপন খবর আপনার হয় না'_আসলে কবিরা তো ভবিষ্যতের নবী-ই, তাই না?
সাত বছর আগে দেখা জাকার্তার সঙ্গে এ সপ্তাহে দেখা জাকার্তাকে মেলাতে একটু কষ্ট হয়েছে। নিঃসন্দেহে জাকার্তা আধুনিক হয়েছে, ভালো লেগেছে এ শহরের মানুষের বিনোদনের ব্যবস্থা দেখে। সিনেমা, নাটক, শপিং মল, প্রদর্শনী_বিমানবন্দরে নামলেই যেসব লিফলেট পাওয়া যায় সেসব ভর্তি এ বিনোদনের খবর। সেসবের কয়েকটি জায়গায় গিয়ে বোঝা গেল এসব শুধু বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নয়, শহরের নাগরিকদের জন্যও এবং তারা রীতিমতো ভিড় জমিয়েছে এখানে। আবার মাথায় ঢোকে ঢাকা শহরের মানুষের এই যে যন্ত্রণা, ক্রোধ, অসহায়ত্ব, তার কিছুটা হলেও লাঘব হতো যদি এ শহরবাসীর জন্য কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা থাকত। এখানে বিনোদনেরও যে কত অভাব সে দুঃখে এ নগরের একজন সামান্য নাগরিক হিসেবে প্রতিনিয়ত মানবিক-আত্মহত্যায় প্ররোচিত হই বলেই উপলব্ধির স্নায়ুগুলোকে বুড়িগঙ্গার নোংরা জলে ডুবিয়ে মারতে প্রাণ চায়।

লেখক : সম্পাদক, একপক্ষ
editor@ekpokkho.com

No comments

Powered by Blogger.