৩২৮৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ-ডেসটিনির ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের দুই মামলা

তিন হাজার ২৮৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ডেসটিনি গ্রুপের সভাপতি লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশিদ ও ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীনসহ প্রতিষ্ঠানটির ২২ শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আলাদা দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।


রাজধানীর কলাবাগান থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে গতকাল মঙ্গলবার মামলা দুটি দায়ের করা হয়। দুদকের উপপরিচালক মো. মোজাহার আলী সরদার ও সহকারী পরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন। গতকাল বিকেলে দুদকের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
দুদকের উপপরিচালক মোজাহার আলী সরদার সাংবাদিকদের জানান, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ১২ বছর জেল এবং মানি লন্ডারিং করা টাকার দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রয়েছে।
দুদক জানায়, ডেসটিনি ট্রি প্লানটেশন লিমিটেড (ডিটিপিএল) ও ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কোঅপারেটিভ সোসাইটির মাধ্যমে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বর্তমানে ওই দুই প্রতিষ্ঠানের দুটি অ্যাকাউন্টে ৫৬ লাখ এবং চার কোটি ৮৭ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। বাকি টাকা অভিযুক্তরা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন।
দুদক জানায়, ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে কমিশন হিসেবে তা থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা কর্মকর্তা ও এজেন্টদের কাছ থেকে আত্মসাৎ করে। ডেসটিনি গ্রুপের সভাপতি সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) হারুন ও ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীন ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির যে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তাঁরা হলেন- ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন, পরিচালক সাঈদ-উর-রহমান, গোফরানুল হক, মেজবাহ উদ্দিন স্বপন, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, ইরফান আহমেদ সানি, মিসেস ফারাহ দীবা, জমসেদ আরা চৌধুরী, শেখ তৈয়বুর রহমান, নেপাল চন্দ্র বিশ্বাস, ইঞ্জিনিয়ার শেখ তৈয়বুর রহমান, জাকির হোসেন, আজাদ রহমান, আকরাম হোসেন সুমন, মিসেস শিরিন আক্তার, মো. রফিকুল ইসলাম সরকার, মো. মজিবুর রহমান, মো. সুমন আলী খান, মো. সাইদুল ইসলাম খান (রুবেল), মো. আবুল কালাম আজাদ ও লে. কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম।
দুদকের অভিযোগ, ডিটিপিএল কর্তৃপক্ষ সাধারণ জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের বেশি লাভের লোভ দেখিয়ে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতিতে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের মাধ্যমে অবৈধভাবে ছয় কোটি ১৮ লাখ ৬৩০টি গাছ ও পাওলোনিয়া ট্রি স্ট্যাম্প বিক্রি করে মোট দুই হাজার ৩৩৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ডিটিপিএল কর্তৃপক্ষ মোট ৮১ লাখ ২৮ হাজার ৮০টি গাছ এবং ২১ হাজার পাওলোনিয়া ট্রি স্ট্যাম্প জনগণের মধ্যে সরবরাহ করে বলে দাবি করে। তারা ৮১ লাখ ২৮ হাজার ৮০টি গাছ বিক্রি করে ২৯৮ কোটি ৯৮ লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং ২১ হাজারটি পাওলোনিয়া স্ট্যাম্প বিক্রি করে এক কোটি ১৯ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। এমএলএম পদ্ধতিতে গাছ বিক্রির বিধান না থাকা সত্ত্বেও ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের মাধ্যমে ২০০৬ সালের ২১ মার্চ থেকে ২০০৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন করে গাছ বিক্রি করে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ডিটিপিএল কর্তৃপক্ষ।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের পরিচালকরা নিজ স্বার্থে বেতন-ভাতা, অনোরারিয়াম, ডিভিডেন্ড ও ইনসেনটিভ এবং কমিশন গ্রহণের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেন। লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশিদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ১৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা, মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও ফারাহ দীবার ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ৮১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, মোহাম্মদ হোসেনের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে এক কোটি ৯১ লাখ টাকা, সাঈদ-উর-রহমানের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ১৭৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, গোফরানুল হকের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ৮৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, মেসবাহ উদ্দিন স্বপনের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ৭৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, নেপাল চন্দ্র বিশ্বাস ও মিতু রানী বিশ্বাসের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ৩৪ কোটি টাকা, শেখ তৈয়বুর রহমান ও সেলিনা রহমানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ৩৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ১৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, ইরফান আহমেদ সানীর ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে এক কোটি ৮ লাখ টাকা, জামসেদ আরা চৌধুরীর ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং লে. কর্নেল (অব.) দিদারুল আলমের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ২২ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ডিটিপিএলের প্রতিষ্ঠালগ্নে ২০০৬ সালের সংঘ স্মারকে কোনো মাল্টি লেভেল মার্কেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যবসা করার প্রবিধান ছিল না। তা সত্ত্বেও ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকটি প্যাকেজ বাজারে ছাড়ে। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকার প্যাকেজ থেকে কমিশন হিসেবে কেটে নেওয়া হয় তিন হাজার ৮০০ টাকা। আট হাজার টাকার প্যাকেজ থেকে কেটে নেওয়া চার হাজার ২৬০ টাকা এবং পাঁচ হাজার টাকার প্যাকেজ থেকে কেটে নেওয়া হয় তিন হাজার ৭৫৫ টাকা করে। এটা ছিল অবৈধ।
দুদক জানায়, জনগণের সঞ্চয় করা মূল টাকার প্রায় ৭০ শতাংশ টাকা ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড কমিশন হিসেবে এর পরিচালক ও এজেন্টদের অ্যাকাউন্টে নিয়ে নেয়। ডেসটিনি কর্তৃপক্ষ কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে জনগণের কাছ থেকে অর্জিত টাকা নামসর্বস্ব কম্পানির বিনিয়োগে হস্তান্তর করে এবং কম্পানি শুরু না হওয়ার আগেই ওইসব কম্পানির নামে ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে, যা প্রতারণার শামিল।

No comments

Powered by Blogger.