সবাইকে হতে হবে শান্তিরক্ষী by ডালেম চন্দ্র বর্মণ

আজ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত শান্তিরক্ষীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা জানানোর দিন। আমি মনে করি, আন্তর্জাতিকভাবে যত দিবস পালিত হয় সেগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


দিনটি আমাদের সামনে কয়েকটি সুযোগ এনে দেয়। প্রথমত শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এবং দ্বিতীয়ত তাদের প্রতি সমবেদনা এবং সহানুভূতি প্রকাশের।
মূলত শান্তিপূর্ণ পৃথিবী বিনির্মাণ এবং মানুষকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি দিতে ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। শান্তিপূর্ণ পৃথিবী বিনির্মাণ জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্য হলেও শান্তি প্রতিষ্ঠা, শান্তিরক্ষা কিংবা শান্তি বিনির্মাণের জন্য জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো বাহিনী নেই। সদস্য দেশগুলোর সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই। এরপর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। শান্তিরক্ষা মিশন সবখানে সফল না হলেও এ কার্যক্রমের অবশ্যই ইতিবাচক একটি দিক রয়েছে। বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে মানুষ যখন জীবনের নিরাপত্তা অনুভব করে না তখন শান্তিরক্ষীর উপস্থিতি তাদের মনে আশার সঞ্চার করে।
আমি মনে করি, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে যারা নিজের শক্তি ক্ষয় করছেন তাদেরও এই দিনটির তাৎপর্য অনুধাবন করা উচিত। শান্তিরক্ষী দিবস আমাদের অনুধাবন করতে সাহায্য করে সংঘর্ষ কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে নয়; ভালোবাসা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আমাদের বিদ্যমান সমস্যা সমাধান করা উচিত।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য দিনটি আরও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পৃথিবীর যেসব দেশ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে তাদের মধ্যে আমাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। শুধু অংশগ্রহণের দিক থেকেই নয়, গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকেও আমরা এগিয়ে। এটি আমাদের জন্য গর্বের একটি দিক। শান্তিরক্ষীরা আমাদের অর্থনীতিকে শুধু শক্তিশালীই করছেন না, বিশ্বের দরবারে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন তারা। এসব গুরুত্ব বিবেচনায় এনে আমাদের সবার উচিত দিবসটিকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করা।
আমরা আমাদের বিভাগের পক্ষ থেকে ২০০৮ সালে আলোচনা সভার আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন রকম সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর তা অব্যাহত রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমি মনে করি, এ রকম আলোচনা অব্যাহত থাকা উচিত। প্রতিবছর এ আলোচনা আয়োজনের ব্যাপারে কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করতে এগিয়ে এলে আমরা তাদের সাদরে গ্রহণ করব। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই নয়, সব পর্যায়েই এ রকম আলোচনা হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে অবস্থিত জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা প্রতিবছর শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে যে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয়। এ অনুষ্ঠানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা করেন। এ রকম অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ দিবসটির গুরুত্ব অনুধাবনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে বলে আমি মনে করি।
শান্তিরক্ষী দিবসের নানা আয়োজনের মাধ্যমে আমরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করি। আমাদের মনে রাখতে হবে, শান্তিরক্ষীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা জানানোর মাধ্যমেই আমাদের দায়িত্ব শেষ নয়। বিশ্বকে শান্তিপূর্ণ করার জন্য আমাদের সবাইকে শান্তিরক্ষীর দায়িত্ব পালন করতে হবে।

ড. ডালেম চন্দ্র বর্মণ : অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাবি
 

No comments

Powered by Blogger.