কৃষিমজুরি বেড়েছে, যোগ হয়েছে সম্ভাবনা ও সংকট by ইফতেখার মাহমুদ

গ্রামের কৃষক ও নিম্ন আয়ের মানুষের মতো উৎপাদিত পণ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় নেই কৃষি শ্রমিকেরা। দেশের উত্তর ও দক্ষিণে মাঠে-ঘাটে খুশি মনেই কাজ করতে দেখা গেছে তাঁদের। কারণ, দুই বছরে মজুরি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। অঞ্চল ভেদে এখন একজন কৃষিশ্রমিকের দৈনিক আয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।


ভ্যানচালক, রিকশাওয়ালা, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক ও শিল্প খাতের দিনমজুরদের আয়ও বাড়তির দিকে। এই খাতের শ্রমিকদের দৈনিক আয় গড়ে ৩০০ টাকার ওপরে পৌঁছেছে। তবে সারা বছর কাজ পাচ্ছেন না তাঁরা। তা ছাড়া আয় বাড়লেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাঁরাও বিপদে আছেন।
এদিকে দেশের মধ্য, উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল ঘুরে একই রকম একটি চিত্র দেখা গেছে। সেটি হলো কৃষিপণ্যের দাম কম হওয়ায় ভূমি মালিকেরা কৃষিকাজে ক্রমশ উৎসাহ হারাচ্ছেন। ফলে অনেক জমি চলে যাচ্ছে বর্গাচাষের আওতায়।
১৯৮৪ সালের কৃষিশ্রম (ন্যূনতম) মজুরি আইন অনুযায়ী, একজন শ্রমিককে কৃষি ক্ষেত্রে শ্রম দেওয়ার জন্য দৈনিক তিন কেজি ২৭০ গ্রাম চালের সমতুল্য অর্থ মজুরি হিসেবে দিতে হবে। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী, এই পরিমাণ চালের অর্থমূল্য সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। তবে এই আইন যখন হয় তখন বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ৪০০ ডলারের নিচে ছিল। বর্তমানে তা ৮০০ ডলার অতিক্রম করে গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য সাত্তার মণ্ডল কৃষি ও অকৃষি খাতের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে মত দিয়ে বলেন, এতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে তাঁরা নিজেদের জীবনযাত্রাকে খাপ খাওয়াতে পারছেন। তবে কৃষিমজুরি বৃদ্ধিকে কৃষির জন্য সমস্যাজনক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অকৃষি খাতে কাজের সুযোগ ও আয় বাড়ায় কৃষিমজুরি বাড়তির দিকে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবশ্যই কৃষিকাজে যন্ত্রপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
কোন খাতে কত শ্রমিক: পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ-২০১০ অনুযায়ী, দেশের দুই কোটি ৫৭ লাখ মানুষ কৃষি, মৎস্য ও বনজ সম্পদে তাঁদের শ্রম বিক্রি করছেন। পরিবহন, সংরক্ষণ ও যোগাযোগ খাতে রয়েছেন ৪০ লাখ শ্রমিক ও নির্মাণ খাতে ২৬ লাখ শ্রমিক।
শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, পাঁচ কোটি ৪১ লাখ শ্রমশক্তির মধ্যে মাত্র এক কোটি ছয় লাখ দিনমজুর। মূলত পরিবহন পেশার সঙ্গে যুক্ত দিনমজুরদের আয় বেড়েছে। বাকি শ্রমিকেরা সরকার-নির্ধারিত বেতন কাঠামোয় আয় করেন। সরকারি-বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের বেতন গত তিন বছরে মাত্র এক দফা বেড়েছে। তা-ও নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা রয়েছে।
দিনমজুর ও শ্রমিকদের হাল: ময়মনসিংহের ভালুকার নিশাইগঞ্জ গ্রামের ভ্যানচালক তাইজুদ্দিন মিঞার সঙ্গে কথা হয়। বিভিন্ন খামার থেকে মাছ বাজারে নেওয়ার কাজই বেশি করেন তিনি। আয় বাড়ার কথা জানিয়ে তিনি বললেন, ‘দিনে আড়ে দেড় শ টাকা ইনকাম হইতো, এখন তিন শ-সাড়ে তিন শ হয়। আয়-উপার্জন বাড়ছে বইলা ছেলেমেয়েরে পড়াশোনা করাইতে পারতাছি। এক ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দিব, আরেকটা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। কয়েক বছরে পড়াশোনার খরচও বাড়ছে। আগে মাসে একেকজনের পেছনে এক-দেড় হাজার টাকা খরচ হতো। এখন মাসে তিন হাজার টাকা লাগে।’
ঠাকুরগাঁও সদরের বৈকণ্ঠপুর গ্রামের দিনমজুর বদিউজ্জামান জানালেন, কামলা (দিনমজুর) কাজে দিনে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় হয় তাঁর। ধান কাটার সময় মজুরি বেড়ে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত হয়। তবে বছরে ২০০ দিনের বেশি কাজ পান না তিনি। বাকি সময় বসে থাকতে হয়।
দুই সন্তান ও স্ত্রীসহ সংসারে চারজন খাওয়ার লোক। দিনে মজুরি বাড়লেও সারা বছর কাজ পান না উল্লেখ করে বদিউজ্জামান বলেন, বছরে কমপক্ষে ৩০০ দিন কাজ না পেলে সংসার চালানো কঠিন। তবে মজুরি আগের চেয়ে বেড়ে যাওয়ায় এখন কিছুটা ভালো আছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধান-পাটের দাম এত দিন ভালো ছিল বলে কৃষকেরা ভালো মজুরি দিত। কিন্তু দাম এভাবে কম পেতে থাকলে মজুরি আবারও কমে যাবে বলে তাঁর আশঙ্কা।
ঠাকুরগাঁও সদরের দেওগাঁও গ্রামের ভ্যানচালক রবিউল ও বৈকণ্ঠপুরের দিনমজুর মোশাররফ জানালেন, কৃষিপণ্য থেকে আয় কমে যাওয়ায় অনেক জমি বর্গায় দিয়ে দিচ্ছেন। এতে তাঁদের মতো ভূমিহীন ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা নিজেরা চাষাবাদ করার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি অন্যের জমিতেও কাজ করছেন। ফসলের ভালো দাম পেলে বর্গাচাষেই বেশি সময় দিতেন বলে জানান মোশাররফ।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন কৃষিমজুরি বেড়ে যাওয়া ও বেশির ভাগ জমি বর্গাচাষের আওতায় চলে যাওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ফসলের দাম পাওয়ার সমস্যা মূলত বড় কৃষকের। তাঁরা তাঁদের জমি বর্গা দিলে ও কৃষিমজুরি বাড়লে সম্পদের পুনর্বণ্টনও বাড়ে। তবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সুরক্ষা দিতে সরকারকে অবশ্যই জরুরি ভিত্তিতে মনোযোগ দিতে হবে। (শেষ)

No comments

Powered by Blogger.