গোলটেবিল বৈঠক-দেশের প্রায় আড়াই কোটি নারীই দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির শিকার

দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ আড়াই কোটি নারীই দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির শিকার। এ ছাড়া আয়োডিন ঘাটতিতে ৩৪ শতাংশ এবং রক্তস্বল্পতায় ভুগছে ৪২ শতাংশ নারী। এই নারীদের ওপরেই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টি। তাই নারীর অপুষ্টি প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।


প্রথম আলোর কার্যালয়ে গতকাল রোববার ‘নারীর সুস্বাস্থ্য ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে পুষ্টির ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৈঠক আয়োজনে সহযোগিতা করে বেসরকারি সংগঠন প্ল্যান বাংলাদেশ।
বৈঠকে বক্তারা নারীর অপুষ্টি প্রতিরোধে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর পুষ্টি কার্যক্রমে বিনিয়োগ বাড়ানো, নারীর পুষ্টি উন্নয়নে পরিবার ও পুরুষদের সম্পৃক্ত করা এবং সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
বৈঠকের মূল বক্তব্যে প্ল্যান বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক (পুষ্টি) তাসকীন চৌধুরী বলেন, অপুষ্টি নারীর কর্মদক্ষতা কমায়। এতে তার উৎপাদনশীলতা কমে এবং আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে একজন অপুষ্ট মা অপুষ্ট সন্তানের জন্ম দেন। সেই অপুষ্ট সন্তানটি মেয়ে হলে সে আবার অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেয়। অপুষ্টি চক্র চলতেই থাকে। অপুষ্ট মা ও সন্তানের বিভিন্ন অসুখের চিকিৎসার পেছনে খরচ বাড়তেই থাকে। এভাবে অপুষ্টি চক্র একটি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়।
বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মুহম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, সরকারের নতুন কার্যক্রম জাতীয় পুষ্টিসেবায় নারী ও শিশুকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু খাদ্য দিলেই পুষ্টি নিশ্চিত হবে না। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের দিকেও নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের সভাপতি এস কে রায় বলেন, উচ্চতা কম থাকলে দক্ষতা কমে এবং তা আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন গবেষণায় তা স্বীকৃত। গড়ে দেশের ৫০ শতাংশ নারীরই উচ্চতা ও ওজন ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি থাইল্যান্ডের একটি জরিপের কথা উল্লেখ করে জানান, চা-বাগানের যেসব নারী শ্রমিককে আয়রন ট্যাবলেট দেওয়া হয়, অন্যদের তুলনায় তাদের আয় বেড়ে যায়। তাই পুষ্টির পেছনে বিনিয়োগ কখনো বিফলে যায় না।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টিপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. এখলাসুর রহমান বলেন, কম ওজনের শিশু জন্ম দেওয়া বা মায়ের জরায়ুতেই যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, তা প্রতিরোধে মায়ের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির প্রতি, বিশেষ করে কিশোরী বয়স থেকেই নজর দিতে হবে।
নারী মূল কেন্দ্রবিন্দু: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প পরিচালক মাখদুমা নার্গিস বলেন, নারীকে উৎপাদনের শক্তি হিসেবে চিন্তা করে পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে এবং নারীর সার্বিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে।
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের পরিচালক জেবা মাহমুদ বলেন, দেশের নারীদের এক-তৃতীয়াংশই দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির শিকার। অপুষ্টি নারীদের কর্মদক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা—সবকিছু কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে এ বিষয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
প্ল্যান বাংলাদেশের দেশীয় প্রকল্প ব্যবস্থাপক সেলিনা আমিন বলেন, নারীর স্বাস্থ্য বলতেই নারী মা হবে, সুস্থ সন্তানের জন্ম দেবে—এ বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়। একজন ব্যক্তি হিসেবেই নারীর পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি, সে বিষয়টি গুরুত্ব পায় না।
জাতীয় সামাজিক ও রোগ প্রতিরোধ প্রতিষ্ঠানের রোগতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইকবাল কবীর বলেন, শিশু, কিশোরী, বিবাহিত নারী, বয়স্ক নারী—এভাবে নারীর জীবনের প্রতিটি ধাপকেই গুরুত্ব দিয়ে বয়স উপযোগী পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার ট্রাইবাল হেলথের উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক শুভ্রা চাকমা বলেন, টিকাদান কর্মসূচিতে মেয়েশিশুদের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া, জরুরি প্রসূতিসেবাসহ বিভিন্ন সেবার মাধ্যমে নারীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে।
নারীর অপুষ্টি দেশে একটি বড় সমস্যা। তবে বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে অতিপুষ্টি (বেশি ওজন) বা ওবেসিটি বাড়ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শিশু বিশেষজ্ঞ খুরশীদ তালুকদার। তিনি বলেন, এতে করে নারীদের ডায়াবেটিস, ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
প্ল্যান বাংলাদেশের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মো. ইফতেখার হাসান খান বলেন, নারীর অপুষ্টি শুধু নারীর স্বাস্থ্যের ওপরেই প্রভাব ফেলছে না, তা দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। সেই বিবেচনায় সরকারি ও বেসরকারি কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় করে জোরদার কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।
পুষ্টিজ্ঞান বাড়াতে হবে: জাতীয় পুষ্টিসেবার কর্মসূচি ব্যবস্থাপক এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খাবার তৈরি করে তা টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতেই পুষ্টিগুণ অনেকটুকুই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুধু জ্ঞানের অভাবে। পুষ্টিসেবার আওতায় মানুষের আচরণ পরিবর্তনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুষ্টি ক্লাব করার কথাও জানান তিনি।
অতিরিক্ত সচিব মাখদুমা নার্গিস কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি গ্রুপ ও সাপোর্ট গ্রুপ পুষ্টিজ্ঞান সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (এমসিএইচ সার্ভিসেস) মোহাম্মদ শরীফ বলেন, পুষ্টিজ্ঞানের অভাবে অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারও অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তিনি শিশুকে বুকের দুধ না দিয়ে গুঁড়া দুধ খাওয়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন।
পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ বলেন, স্থায়ীভাবে পুষ্টিজ্ঞান বাড়াতে হলে পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ কে এম আমির হোসেন বলেন, এখনো অনেক বাবা-মা অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত। কিন্তু তাঁদের সন্তানকে তাঁরা স্কুলে পাঠাচ্ছেন। তাই পুষ্টিজ্ঞান বাড়াতে হলে প্রাথমিক স্কুলের পাঠ্যসূচিতেই পুষ্টি বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। শিশু যা শিখবে, তা অভিভাবকদেরও বলতে পারবে।
পুরুষ ও পরিবারকে সম্পৃক্ত: দ্য ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স-৩ প্রজেক্টের (ফানটা) দেশীয় ব্যবস্থাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন, নারীর পুষ্টি নিশ্চিত করতে পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্ল্যান বাংলাদেশের উপদেশীয় পরিচালক আনোয়ার হোসেন সিকদার জানান, এ সংগঠনের বিভিন্ন প্রকল্পে পুরুষদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
বৈঠকের সঞ্চালক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘পরিবারে সবার খাওয়া শেষে অবশিষ্ট যা থাকে, তাই মা, চাচি, বোনেরা খান। এটাকেই নিয়ম বা রীতি হিসেবে মেনে নেওয়া হয় আমাদের সমাজে।’

No comments

Powered by Blogger.