শ্রদ্ধাঞ্জলি-এক স্বপ্নবানের বিদায় by রবিউল হুসাইন

স্থাপত্যকর্ম ছাড়াও স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এ দেশের উপযুক্ত স্থাপত্য শিক্ষার সঠিক প্রসার ও শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্থাপত্য পরিবেশ নির্মাণে এবং স্থাপত্য পেশার সুষ্ঠু আন্দোলন গঠনে সচেষ্ট হন। স্থাপত্য শিক্ষাকে একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়িত করার জন্য স্থপতি ইসলামের উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের


সাহায্যক্রমে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের আমন্ত্রণে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শক্তিশালী দল ঢাকায় উচ্চমানের স্থাপত্য শিক্ষার প্রচলনের সম্ভাবনা যাচাই করতে আসে

চলে গেলেন বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের পথিকৃৎ_ স্থাপত্য শিল্পী মাজহারুল ইসলাম। মাজহার ভাই_ জীবনব্যাপী সুন্দর স্বদেশের স্বপ্নে নিবেদিতপ্রাণ এক আধুনিক মানুষ। স্থাপত্য শিল্প যে অন্যান্য শিল্পের মতোই অনন্য একটা শিল্পমাধ্যম_ এ বিষয়টা তিনিই প্রথম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশে। মাজহার ভাই বলতেন, স্থাপত্য শিল্প বিচ্ছিন্ন কোনো শিল্প নয়, বরং সব শিল্পের মূল এই শিল্প। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই তৈরি হবে আমাদের স্থাপনা, স্বপ্নের সাজানো আবাস। তার চিন্তা ও স্বপ্নের স্বাক্ষর লিপিবদ্ধ হয়ে আছে দেশের বিখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনায়।
তিন বছর ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা ধরনের সমস্যায় ভুগছিলেন মাজহার ভাই। শেষ দিনগুলোতে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাকে দেখতে গেলে হাতটা ধরে কথা বলার চেষ্টা করতাম কিন্তু পারতাম না। মাজহার ভাই তার অসাধারণ স্বপ্নময় চোখে শুধু তাকিয়ে থাকতেন, কিছু বলতেন না। তেমন কিছুই আর মনে করতে পারতেন না।
মাজহার ভাই স্বপ্নের একটা গ্রামের কথা বলতেন। আর সারাদেশটাকে এমন স্বপ্নের গ্রামে ভরিয়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। ঢাকার অদূরে রায়পুরায় তেমনই একটা গ্রামের কাজ হাতে নিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুকে তিনি মিনিস্ট্রি অব ফিজিক্যাল প্ল্যানিংয়ের কথা বলেছিলেন। যার মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু তার কথায় সম্মতি জানিয়েছিলেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ায় মাজহার ভাইয়ের সে স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হয়নি।
মাজহার ভাই ছিলেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রথম সভাপতি। বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে ছিল তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ।
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজ থেকে যথাক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ওই কলেজ থেকেই পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ স্নাতক পাস করেন। এরপর শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে প্রকৌশল বিদ্যা পড়া শেষ করেন ১৯৪৬ সালে। দেশ ভাগের পর ১৯৪৭ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্র যান এবং অরিগন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যের পাঠ নিয়ে আড়াই বছর পর দেশে ফিরেই একনাগাড়ে ছয় মাসের পরিশ্রমে ডিজাইন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট ও লাইব্রেরি ভবন।
এরপর ১৯৫৬ সালে বৃত্তি নিয়ে তিনি ট্রপিক্যাল আর্কিটেকচার পড়তে লন্ডনের স্কুল অব আর্কিটেকচারে যান। ১৯৬০ সালে যান ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে। দেশে ফিরে একে একে জাতীয় গণগ্রন্থাগার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্থাপত্য, জীবন বীমা করপোরেশন ভবনসহ বিভিন্ন ভবন ও প্রকল্পের নকশা তৈরি করেন এই দেশপ্রেমী প্রতিভাবান স্থপতি। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের নকশা তারই করার কথা ছিল। কিন্তু দেশের জন্য এ ভবনের গুরুত্ব ও ব্যাপকতার কথা চিন্তা করে মাজহারুল ইসলাম যোগাযোগ করেন লুই আই কানের সঙ্গে। তারপরের সবকিছুই আমাদের জানা। নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন হিসেবে বিশ্বের বুকে বিখ্যাত ভবনগুলোর একটি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াল আমাদের জাতীয় সংসদ ভবন।
স্থাপত্যকর্ম ছাড়াও স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এ দেশের উপযুক্ত স্থাপত্য শিক্ষার সঠিক প্রসার ও শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্থাপত্য পরিবেশ নির্মাণে এবং স্থাপত্য পেশার সুষ্ঠু আন্দোলন গঠনে সচেষ্ট হন। স্থাপত্য শিক্ষাকে একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়িত করার জন্য স্থপতি ইসলামের উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সাহায্যক্রমে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের আমন্ত্রণে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শক্তিশালী দল ঢাকায় উচ্চমানের স্থাপত্য শিক্ষার প্রচলনের সম্ভাবনা যাচাই করতে আসে। কিন্তু তার সে চেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৬৬ থেকে '৬৮ পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প উপদেষ্টা ছিলেন। তার প্রস্তাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তন, একাডেমিক ভবন ও কিছু আবাসিক ভবন নকশা করার জন্য পৃথিবী বিখ্যাত আমেরিকান আধুনিক স্থপতি, তার শিক্ষক এবং তৎকালীন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদের প্রধান পল রুডলফকে মনোনীত করা হয়। এ ভবনগুলো আমাদের দেশের আধুনিক স্থাপত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
আমাদের স্থাপত্য শিল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখতেন এই গুণী মানুষটি। সুশৃঙ্খল এবং মানবিক এক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে গেছেন সমস্ত জীবন। যে কাজ শেষ হয়নি। মাজহারুল ইসলাম নেই। আমাদের পাথেয় হিসেবে রয়ে গেছে তার রেখে যাওয়া দৃষ্টান্ত, অসমাপ্ত কাজ আর স্বদেশের জন্য সীমাহীন স্বপ্ন।

রবিউল হুসাইন :স্থপতি ও কবি

No comments

Powered by Blogger.