যুক্তরাজ্যের নির্বাচন-ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের রুশনারা by শামীম আজাদ

পাশের বাড়ির মেয়েটি, যাঁকে বড় আত্মীয় আত্মীয় লাগে, তিনি এমন এক স্থানে উঠে গেলেন, যাঁর রূপ শুধু দূর থেকে দেখতাম। বাংলাদেশি বাঙালি কন্যা রুশনারা আলী পূর্ব লন্ডনের বেনখাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসন থেকে লেবার দলের প্রার্থীহিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।


অক্সফোর্ডইউনিভার্সিটি থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শনে স্নাতক এই নারীব্রিটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এক অপূর্বইতিহাস।
লন্ডন শহরে ওয়েস্ট মিনস্টারে ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে প্রথমবার যখন পার্লামেন্ট ভবনের দিকে তাকিয়েছিলাম, আকাশে চাঁদ ছিল না। তবু রাতের অন্ধকারে ভবনের সোনাজল ধোয়া চূড়া চকচক করছিল। পরে দিনের বেলা যখনই এর ভেতরে প্রবেশ করেছি আর হাঁ হয়ে চলমান সেশন দেখেছি, বেরিয়ে আসার সময় লোকের চোখ এড়িয়ে গোপনে এর আসবাব স্পর্শ করেছি।
ইতিমধ্যে টেমসে কত জল গড়িয়ে গেছে, তারই পাড়ে টাওয়ার ব্রিজের গোড়ায় পিতৃপুরুষের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আত্মদানের এপিটাফ বিমূর্ত দাঁড়িয়ে। ওই দূরে ডকের তীরে এখনো আমাদের ঘামের দাগ লেগে আছে। দাঙ্গায় আলতাব আলীর মৃত্যু আর পূর্ব লন্ডনে কী বড় তার প্রতিবাদ হলো। বর্ণদাঙ্গার বিপরীতে জেগে উঠেছে আমাদের প্রথম তরুণ নেতৃত্ব। ওল্ডহ্যামে তরুণদের মনে লেগেছে আগুন। আর ভারে ভারে কাউন্সিলের কণ্টক হয়েছে আমাদের নেতৃত্ব। প্রচুর জনসংখ্যার দাঁড় বাইলেও একটি গুণগত পর্যায় অতিক্রম করতে পারিনি আমরা। সে স্থানে আসতে আমাদের সত্যিই এত দিন লেগে গেল! অবশেষে হাউস অব পার্লামেন্টে আমাদের প্রতিনিধি প্রবেশের অধিকার জয় করে নিলেন। অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট বাংলাদেশের শ্যামলা মেয়ে রুশনারা আলী দেশের এবং প্রবাসের সব বাঙালির হয়ে বিজয়ের পতাকা ওড়ালেন। কোনো অনুগ্রহ নয়, নয় কোটা, নয় নারী বলে অনুকম্পা, নয় বিরুদ্ধ শক্তির বলহীনতা—বিজয়িনী হয়েছেন তিনি আপন আগুনে। অভিনন্দন হে বাংলাদেশের মাটির মেয়ে। হে বিজয়িনী, আপনি আমাদের ভালোবাসার অর্ঘ্য গ্রহণ করুন।
দুই দশক ধরে আমাদের গোটা কমিউনিটির অবস্থা ততটা সবল ছিল না। একজন বাঙালি বাংলাদেশি এমপির জন্য গোটা কমিউনিটি নিজ ক্ষমতামতো কী না করেছে। পত্রপত্রিকা, মিডিয়া, আন্দোলন, আঘাত, তর্ক ও তুকতাক সবই করেছি আমরা আমাদের সেই অনাগত প্রতিনিধিটির সড়ক তৈরি করতে। আজ তাই রুশনারা শুধু একা বিজয়ী হননি, বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশি কমিউনিটির এত দিনের অধ্যবসায়, ত্যাগ ও তিতিক্ষা। তিনি একা বিজয়ী হতেও পারতেন না। এ দেশে এবং পৃথিবীর কোনো দেশেই কেউ একা তা কখনো হতে পারেনি। অপরদিকে অনেকের মধ্যে একদিন কোনো এক ব্যক্তির অসাধারণত্ব তাঁর মেধা-মনন ও যোগ্যতা সেই অবহেলিত কমিউনিটিকে তাঁদের আকাঙ্ক্ষার জন্য লড়াই করার সুযোগও তৈরি করে দেয়। রুশনারা আলীসহ বাদবাকি সব প্রার্থীই এবার আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছেন।
এখন তাঁদের সবারই বৃহত্তর পরিসরে পা রাখার পথ সুগম হলো। এখন আমাদের চোখের সামনে সেই ঋজু মেয়েটি মুখে হাসি মেখে যখন শপথ নেবেন, তখন বাংলাদেশের বিম্বিত হবে তাঁর সেই হাসি। কিন্তু কেবল আমরাই তখন চোখের বাইরে, তার অতিরেকে দেখতে পাবও তাঁর পিঠে বসা এক অদৃশ্য বোঝা। ব্যাগেজ। সে ব্যাগেজের মধ্যে ‘আমাদের সেই প্রথম সন্তানের জন্য জমা করা আশা-আকাঙ্ক্ষার ফর্দ।’ তার পূর্বপুরুষের দায় ও দাবি। তবে এ শুধু বোঝা নয়, আশীর্বাদও। এরাই তাঁকে দিকনির্দেশনা দেবে দলীয় নীতি পরিণতির সঙ্গে কী করে তাঁর পরিণয় সম্ভব। এ থেকে বিচ্যুত হলে তাঁর সৌভাগ্যের খোসা খুলে যেতে পারে। ওই চকচকে সোনায় মোড়া পার্লামেন্টে এর আগে যিনি আমাদের শুধুই পিঠের বোঝা ভেবেছিলেন, তাকেই উল্টো বোঝা বলে কমিউনিটি তার ভার ফেলে দিয়েছে। জনতা এভাবে রাজনীতির মেরুকরণ করে। এবং তা বড়ই অদ্ভুত ও নির্মম।
রুশনারা আমাদের কন্যা। বিলেতের সোনাজল ধোয়া পার্লামেন্ট ভবনে বাংলাদেশের মাটির মেয়ে। তাঁর পিঠে পূর্বপুরুষের সেই রক্তজবার দাগ। তাঁর চোখে মধুমতী, সুরমা, কুশিয়ারার পলির কাজল। তাঁর প্রতি প্রত্যাশার প্রপাত দুড়দাড় করে ভেঙে তো পড়বেই। আর আমরা তার সেই অতীত, যাকে গোছানোর দায়িত্ববোধ থেকেই জেনেশুনে সে গরলকে অমৃত জ্ঞানে তিনি ধারণ করেছেন।
তবে আমাদের এ ব্যাপক চাহিদার মুখে তিনি একা নন। এত দিন ধরে যাঁরা কাউন্সিলর, মেয়র ও লিডার পর্যন্ত হয়েছেন এবং তাঁরাও এই প্রতীক্ষায় বসে ছিলেন। রুশনারা খুলে দিলেন সেই বোতলের ছিপি। এবার তিনি তাঁদের সবাইকেই পাবেন। সে যে দল বা মতেরই হোক না কেন, আমাদের কমিউনিটির স্বার্থে তাঁরা তাঁর সঙ্গেই থাকবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
রুশনারা বিজয়িনী হয়েছেন। জয়মাল্য এসেছে আমাদের গলায়। আজ শুধু মন ভালো করার গল্প। আজ শুধু মিষ্টি মুখে দেওয়ার ও নেওয়ার দিন। রুশনারা আলীই বিলেতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবেন। আমরা এ বিশ্বাস রাখতে চাই।
শামীম আজাদ: কবি, শিক্ষক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.