চিরকুট-আরোগ্যশিল্পী by শাহাদুজ্জামান

‘আমরা মেডিকেল কলেজে পড়ি/ কার্ডিওলজি, হেমাটোলজি, ফিজিওলজি আরও কত লজি/ কিছু তার বুঝি আর কিছু নাহি বুঝি/ ...মরা কেটে কেটে পাকাই যে হাত আমরা/ হাড়গোড় সব মেরামত করি সেলাই যে করি চামড়া/ ...যমের দম্ভ ভেঙে, মোরা যে বড়াই করি/ আমরা মেডিকেল কলেজে পড়ি।’


এককালে তোলপাড় করা সিনেমা সাগরিকায় উত্তম-সুচিত্রার সহপাঠী মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা গাইছিলেন এ গান। মজাদার এই গানের দুটো শব্দের দিকে নজর পড়ে আমার; ‘দম্ভ’ আর ‘বড়াই’। ডাক্তারবাবুদের দম্ভ আর বড়াই নিয়ে বিস্তর অভিযোগ আছে রোগীমহলে। ডাক্তারমাত্রই দাম্ভিক, ঢালাওভাবে এ কথা নিশ্চয়ই বলা যাবে না। তবে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক রোগী যে দেশের বাইরে চিকিৎসা করতে চলে যান, তার অন্যতম একটি কারণ, এ দেশের ডাক্তারদের উদ্ধত আচরণ এবং রোগীর প্রতি আন্তরিকতাহীনতা।
ডাক্তারদের বড়াই করার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ইউরোপীয় রেনেসাঁর পর কী করে ক্রমশ একটি ক্ষমতাধর সামাজিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হয়েছে। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তির হাত ধরেই এই চিকিৎসাবিজ্ঞান বা বায়োমেডিসিন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের মাধ্যমে ভারতে বায়োমেডিসিনের আধিপত্য বিস্তারের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন ডেভিড আর্নল্ড (১৯৯৩) তাঁর কলোনাইজিং দ্য বডি বইটিতে। ব্রিটিশ প্রবর্তিত মেডিকেল কলেজে যে ভারতীয়রা পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তাঁদের গায়ে শুরু থেকেই একটি এলিট তকমা লেগেছে, তাঁদের মনে আত্মশ্লাঘাও জন্মেছে। উপনিবেশ-উত্তরকালেও ডাক্তারি একটি অভিজাত পেশা হিসেবেই বিবেচিত। অতিসম্প্রতি কম্পিউটার সায়েন্স আর এমবিএর দৌরাত্ম্য শুরু হলেও এ দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারে এখনো সন্তানকে ডাক্তারি পড়িয়ে ধন এবং মান অর্জনের স্বপ্ন মিলিয়ে যায়নি। ফলে ডাক্তারি পেশায় নিযুক্ত যাঁরা, তাঁদের চারপাশে একটা অহংকারের বাষ্প বরাবরই আছে।
লক ও গর্ডন (১৯৮৮) তাঁদের বায়োমেডিসিন এক্সামিনড গ্রন্থে ডাক্তারদের মানসগঠন নিয়ে চমৎকার ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তাঁরা ডাক্তারদের উদ্ধত আচরণ এবং রোগীর প্রতি আন্তরিকতাহীনতার বীজ দেখতে পেয়েছেন মেডিকেল শিক্ষাক্রমের ভেতরেই। একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত নাজুক মুহূর্তে ডাক্তারের মুখোমুখি হন, যখন ডাক্তারের কাছে একাধারে তাঁর মেডিকেল ও মানবিক দুটো প্রত্যাশাই থাকে। প্রচলিত শিক্ষাক্রম ডাক্তারদের রোগীর মেডিকেল প্রত্যাশা পূরণে প্রস্তুত করলেও, মানবিক প্রত্যাশা পূরণে প্রস্তুত করে না। এই শিক্ষা একটি বিকল ফুসফুস চিনতে শেখালেও সেই ফুসফুসটি যে পূর্ণাঙ্গ মানুষের এবং সেই মানুষটি যে বিশেষ সমাজের, সেটা তাঁকে চিনতে শেখায় না। চিকিৎসার এই বিমানবায়ন নিয়ে পশ্চিমা দেশে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে, বিশেষ করে রোগীর অধিকারের প্রশ্নকে সামনে রেখে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে মেডিকেল কারিকুলামকে ঢেলে সাজিয়েছে তারা। ডাক্তাররা মড়া কেটে যতই হাত পাকান, যতই হাড়গোড় মেরামত আর চামড়া সেলাই করুন, পাশাপাশি তাঁদের নানা রকম মানবিক বিদ্যাতেও পারদর্শী হতে হচ্ছে। ইউরোপে চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞান পড়া এবং পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি দেশে এ বিষয়ে অধ্যাপনার সুবাদে দেখতে পেয়েছি, পৃথিবীর নানা প্রান্তে ডাক্তারকে নেহাত দেহঘড়ি সারানোর মিস্ত্রির বদলে একজন সমাজসচেতন, সংবেদনশীল মানূুষ হিসেবে তৈরি করার সব রকম চেষ্টা চলছে। ব্রিটেনে ‘মেডিসিন ইন দি কমিউনিটি’ বিষয়টির অধীনে প্রতিটি এমবিবিএস ছাত্রছাত্রীকে একজন রোগীর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। ছাত্রছাত্রীরা রোগীর আত্মীয়স্বজন, পেশা, জীবনযাপনের নানা তথ্য সংগ্রহ করে নিয়মিত প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে রোগীকে একটি বৃহত্তর আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখতে শেখে। এর অংশ হিসেবে সমাজবিজ্ঞান, দর্শনের নানা তত্ত্বও তাঁদের পড়তে হয়। তাঁরা এমনকি শেখে রোগীকে কী করে একটি দুঃসংবাদ জানাতে হয়। শুধু ইউরোপে নয়, ভিয়েতনামে দেখেছি মেডিকেল কারিকুলামে এনাটমি, ফিজিওলজির পাশাপাশি আছে মার্ক্স, হেগেল। তুরস্কের একটি মেডিকেল কলেজে দেখেছি, ছাত্রছাত্রীরা প্যাথলজি, ফার্মাকোলজির পাশাপাশি পড়ছে শেক্সপিয়ার, চেকভ।
আমাদের দেশে এমনটা হওয়া কষ্টকল্পনাই মনে হয়। এক হবু ডাক্তারের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে আলাপ করতে গেলে সে আমাকে বলে, সায়েন্সের ছাত্র হয়ে আর্টসের বিষয় পড়া অবান্তর তো বটেই, অপমানকরও। এ দেশের মেডিকেল পাঠ্যসূচিতে ‘কমিউনিটি মেডিসিন’ বলে যে বিষয়টি আছে, তাতেই একমাত্র রোগের সঙ্গে সমাজের সম্পর্কের প্রসঙ্গ আছে। কিন্তু দেখা যায়, মেডিসিন, সার্জারির মতো কর্তৃত্বশালী বিষয়ের পাশে কমিউনিটি মেডিসিনকে নেহাতই ম্লান, গুরুত্বহীন, অনাকর্ষণীয় একটি বিষয় করে রাখা হয়েছে। পরীক্ষা পাসের জন্য কতিপয় সংজ্ঞা মুখস্থ আর দায়সারা একটি মাঠগবেষণায় অংশ নিয়ে অধিকাংশ মেডিকেল ছাত্রছাত্রী কমিউনিটি মেডিসিন বিষয়টি থেকে রেহাই পেতে চান। কোনো রকম মানবিকবিদ্যা তাঁদের টানে না। আধুনিক মেডিকেল শিক্ষার অনিবার্য বিষয় মেডিকেল সোসিওলজি, মেডিকেল এথিক্স ইত্যাদি বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণাই হয় না। ফলে অবাক হই না, যখন অনেক ডাক্তারকে রোগীর সঙ্গে এমন ভঙ্গিতে আলাপ করতে দেখি যেন তিনি সম্রাট, কথা বলছেন তাঁর খানসামার সঙ্গে। এক ডাক্তারকে দেখেছি, রোগীর স্বজনদের মধ্যে এমনভাবে রোগীর ক্যানসার হওয়ার ঘোষণা করছেন, যেন তাঁদের কোনো লটারি জেতার সংবাদ দিচ্ছেন। বলা বাহুল্য, এ দেশে সৌজন্যবোধসম্পন্ন অসংখ্য ডাক্তারও আছেন, যাঁরা মেডিকেল শিক্ষার কারণে নয়, বরং ব্যক্তিগত চারিত্র বৈশিষ্ট্যেই মানবিক।
মেডিকেলের বিখ্যাত সার্জারি টেক্সট বই বেইলি অ্যান্ড লাভ শুরু হয়েছে একটি কবিতা দিয়ে, যেখানে লেখকদ্বয় বলছেন, চিকিৎসাশাস্ত্র একই সঙ্গে একটি সায়েন্স এবং আর্ট। একজন যথার্থ ডাক্তার তাই একজন আরোগ্যশিল্পী। আমাদের মেডিকেল ছাত্রছাত্রীরা চিকিৎসার সায়েন্সের দিকটি শিখলেও এর আর্টের দিকটিতে থেকে যাচ্ছেন নবিশ। আমরা আরোগ্যশিল্পীদের প্রত্যাশায় আছি।
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক
zaman567@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.