তেল-গ্যাস অনুসন্ধান-মাইলফলক উদ্যোগে থাকুক স্বচ্ছতা

গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের বাস্তব পদযাত্রাকে আমরা স্বাগত জানাই। বৃহস্পতিবার মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে পেট্রোবাংলা তথা বাংলাদেশ সরকারের স্বাক্ষরিত অংশীদারিত্ব চুক্তি অনুযায়ী গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে আগামী শুষ্ক মৌসুমেই অনুসন্ধান কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশের সীমানাভুক্ত ও সংলগ্ন গভীর সমুদ্র অঞ্চল পৃথিবীর অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় বেশি খনিজসমৃদ্ধ। ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকের আওতাধীন প্রায় সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা। এর মধ্যে ১৬শ' বর্গকিলোমিটার এলাকার মালিকানা নিয়ে আমাদের দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের আপত্তি রয়েছে। বিষয়টি জাতিসংঘে নিষ্পত্তির জন্য বিবেচনাধীন। এর দ্রুত ফয়সালার জন্য আমাদের সরকার ও জাতিসংঘ তৎপর হবে, এটাই প্রত্যাশিত। বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকায় চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকার ও পেট্রোবাংলার পদস্থ কর্মকর্তারা বলেছেন, এ উদ্যোগ মাইলফলক হয়ে থাকবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, 'চুক্তিতে দেশের সব খনিজ সম্পদের রাষ্ট্রীয় তথা মালিকানা নিশ্চিত করা হয়েছে। উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি অনুযায়ী যারা কাজ করবে তাদের যা কিছু আবিষ্কার সব বাংলাদেশকে দিতে হবে। এর সবটা বাংলাদেশ ব্যবহার করবে, নাকি কিছু রফতানি করব, সে সিদ্ধান্ত আমাদের।' অপরদিকে তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির বিবেচনায় 'এ চুক্তি দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ববিরোধী'। তাদের বিশেষভাবে আপত্তি পাইপলাইনে তেল-গ্যাস রফতানির ধারা নিয়ে। চুক্তির পূর্ণ বয়ান সরকারের হাতে রয়েছে এবং তা জাতীয় সংসদ ও একই সঙ্গে জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করে এ সংক্রান্ত যাবতীয় সংশয় নিরসন করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি অনুযায়ী কনোকো ফিলিপস অনুসন্ধান ও উত্তোলনসহ যাবতীয় ব্যয় বহন করবে এবং প্রাপ্ত তেল-গ্যাস থেকে তার হিস্যা নিয়ে নেবে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এসব ক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নানা কৌশলে ব্যয় বাড়িয়ে দেখায়। তা ছাড়া চুক্তির ধারায় এমন কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়, যা আপাতদৃষ্টিতে তেমন ক্ষতিকর মনে না হলেও কার্যক্ষেত্রে তা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে ওঠে। মাগুরছড়ায় অক্সিডেন্টাল কোম্পানির সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির জন্য আমরা খেসারত দিয়েছি। কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তিতে এ ধরনের কোনো ধারা যুক্ত থাকলে সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এ কারণে সরকারের উচিত হবে চুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। অপর পক্ষ যেন চুক্তির ধারার মনগড়া ব্যাখ্যা দিতে না পারে সে বিষয়েও সতর্কতা জরুরি। এ ধরনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের শুধু নয়, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও তিক্ত। আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের নানাভাবে তুষ্ট করে বিদেশি কোম্পানি নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে_ এমন অভিযোগও রয়েছে এবং তা অমূলক নয়। 'নাইকোর কোটি টাকার গাড়ি' কেলেঙ্কারি তো একেবারেই নিকট অতীতের ঘটনা। তবে জাতীয় স্বার্থ লঙ্ঘিত হওয়ার শঙ্কা থেকে তেল-গ্যাস কিংবা কয়লাসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো যুক্তি নেই। আমাদের জ্বালানি সম্পদের ঘাটতি অপরিমেয় এবং এ কারণে অর্থনৈতিক অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের মূল্য ক্রমে বাড়ছে। এ অবস্থায় আমাদের সম্ভাবনা অবশ্যই কাজে লাগাতে উদ্যোগী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটাই অবশ্যপালনীয়_ কোনোভাবেই জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা চলবে না।
 

No comments

Powered by Blogger.