কালের পুরাণ-বাংলাদেশ-বিদ্বেষী কাদির খান ও পাকিস্তানের পরবর্তী অভ্যুত্থান by সোহরাব হাসান

গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে পাকিস্তানে প্রতি দশকে একটি করে সেনা-অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছে দেশের তথাকথিত সার্বভৌমত্ব ও জনস্বার্থ রক্ষার নামে। ১৯৫৮ সালে প্রথম সামরিক শাসন জারি করেন জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৬৯ সালে তাঁকে হটিয়ে মসনদে বসেন ইয়াহিয়া খান।


১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতা দখল করেন জুলফিকার আলী ভুট্টোকে সরিয়ে। ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতাচ্যুত করে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানে আরেকটি সামরিক শাসন আসন্ন-প্রায়। আমেরিকান বাহিনীর ওসামা বিন লাদেন-বধ অভিযানের পর তার ক্ষেত্রও মোটামুটি প্রস্তুত। অ্যাবোটাবাদের সামরিক একাডেমির কাছে সুরক্ষিত এক ভবনে কী করে বিন লাদেন ২০০৫ সাল থেকে আত্মগোপন করেছিলেন, তা বিস্ময়কর বটে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও সেনাবাহিনী পাকিস্তান সামরিক স্টাবলিস্টের দিকেই সন্দেহের তীর ছুড়েছে। তাদের বিশ্বাস, পাকিস্তান সেনাবাহিনী তথা আইএসআইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বিন লাদেনের সেখানে বসবাস করা অসম্ভব ছিল। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কায়ানি এর সদুত্তর দিতে পারেননি। আইএসআইয়ের প্রধান জেনারেল পাশা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে দায় শেষ করছেন, না নতুন কোনো দায়িত্বের প্রস্তুতি নিচ্ছেন—সে প্রশ্নের জবাব ভবিষ্যৎই দিতে পারবে।
তবে ওসামা-বধ অভিযান রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের ভঙ্গুরতা ও অকার্যকরতাই প্রমাণ করেছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিজেদের যতই শক্তিধর ভাবুক এবং দেশটির বেসামরিক নাগরিকদের ওপর যতই দাপট দেখাক, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গর্তে লুকানো ইঁদুর বৈ কিছু নয়। ওসামা-বধ অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি যেসব বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে সামরিক বাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের কণ্ঠস্বরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
ভারতের প্রখ্যাত কলাম লেখক ও সামরিক বিশ্লেষক সি রাজা মোহন গত ৯ মে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ একটি লেখায় পাকিস্তানে সম্ভাব্য পাঁচটি অভ্যুত্থানের পূর্বাভাস দিয়েছেন।
এক. জারদারির অভ্যুত্থান: পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আইএসআই দেশটির স্বঘোষিত রক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে চাইছে। বিন লাদেন-বধ অভিযানের পর জারদারি তাদের বেসামরিক বিষয়ে নাক না গলাতে বাধ্য করতে পারেন। সেটি হবে সামরিক বাহিনীর প্রতি বেসামরিক প্রশাসনের অভ্যুত্থান। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ত্রাতা ও বন্ধু তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সৌদি আরবের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
দুই. কায়ানি অভ্যুত্থান: আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে জেনারেল আশফাক কায়ানি আগ্রাসী অবস্থান নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেনা অভিযান এবং লাদেন-সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহের জন্য বেসামরিক প্রশাসনকে দায়ী করতে পারেন এবং বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে সরাসরি দেশের দায়িত্বভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারেন।
বেইজিং অভ্যুত্থান: সারা বিশ্ব যখন সেনাপ্রধান কায়ানির দিকে আঙুল তুলেছে, তখন তাঁর প্রতি বেইজিংয়ের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন বিশেষ ইঙ্গিত দেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান অংশীদারি আফগানিস্তান ও পারস্য উপসাগরে বেইজিংয়ের স্বার্থ সম্প্রসারিত করবে বলেই ধারণা করা হয়।
ওবামা অভ্যুত্থান: পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অভিযান চালিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ইতিমধ্যে বিজয়ী হয়েছেন। গত এক দশকে ইসলামাবাদের ওপর ওয়াশিংটনের কর্তৃত্ব প্রকাশের বিরল দৃষ্টান্ত এটি। ওসামা বিন লাদেনের অন্যান্য সহযোগীকে পাকড়াও করতে ওবামা কায়ানিকে বেছে নিতে পারেন। আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে আসতেও যুক্তরাষ্ট্রের কায়ানি ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন।
নৈরাজ্যবাদী অভ্যুত্থান: পাকিস্তানের জিহাদি গ্রুপগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার মতো সুসংগঠিত নয়। তবে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের হত্যাসহ যেকোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটাতে সক্ষম। এ ধরনের তৎপরতা নতুন পরিস্থিতি তৈরি করবে।
কেবল রাজা মোহন নন, ভারতের অনেক বুদ্ধিজীবী, কূটনীতিক ও সাংবাদিক পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ ওসামা বিন লাদেন-বধ অভিযানের অনুরূপ অভিযান চালানোরও পরামর্শ দিয়েছেন সরকারকে। তাঁদের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তানে সেনা অভিযান চালাতে পারে, তাহলে ভারত কেন পারবে না? মুম্বাইয়ের বোমা হামলার হোতারা তো পাকিস্তানেই পালিয়ে আছে। এ ব্যাপারে ভারতের নীতিনির্ধারকেরা বিভক্ত। এক পক্ষ চাইছে, এই মুহূর্তে সেনা অভিযান চালানো হোক। আরেক পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পক্ষপাতী। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দ্বিতীয় ধারার অনুসারী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘ভারত যুক্তরাষ্ট্র নয়।’

২.
পাকিস্তানের পরমাণুবিজ্ঞানী আবদুল কাদির খান বরাবরই বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে সংবাদের শিরোনাম হতে পছন্দ করেন। ১৯৯৮ সালে পাকিস্তানে যে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, তার কৃতিত্ব কাদির খানের। একই সময়ে ভারতেও দ্বিতীয় দফা পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হলে পাকিস্তানও পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ শুরু করে। আবদুল কাদির খানের দাবি অনুযায়ী, তিনিই পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রস্তাব রাখেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে।
বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর আগে ও পরে কাদির খান অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। পাকিস্তানে পারমাণবিক বোমা তৈরিকে তিনি দেখেছেন মুসলিম বিশ্বের রক্ষাকবচ হিসেবে। এরপর কাদির খান গোপনে পারমাণবিক প্রযুক্তি পাচার করেন ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়ায়। পাচারের ঘটনা উদ্ঘাটিত হলে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত গৃহবন্দী করে রাখে। পরে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ তাঁকে ক্ষমা করেন এবং এ-সংক্রান্ত কথাবার্তা বলতে নিষেধ করেন।
সেই কাদির খান সম্প্রতি নিউজউইক-এ বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পর্কে যে কথা লিখেছেন, তা পারমাণবিক বোমার চেয়ে কম ভয়ংকর নয়। তাঁর দাবি, ভারতকে মোকাবিলা করতে পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমার প্রয়োজন আছে। পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশটির পারমাণবিক বোমা থাকা অপরিহার্য। পাকিস্তানে পারমাণবিক বোমা আছে বলেই গত ৪০ বছর ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ হয়নি। পারমাণবিক বোমা না থাকলে দেশটিকে ইরাক ও লিবিয়ার ভাগ্য বরণ করতে হতো।
এ পর্যন্ত না-হয় ঠিকই আছে। এর পরই কাদির খান যে মারাত্মক কথাটি বলেছেন তা হলো, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। কী ভয়ংকর কথা! পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে স্বাধীনতা ঠেকানো। কাদির খানের জেনে রাখা উচিত, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পরিণতিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। পাকিস্তানি শাসকদের গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবিলা করে এ দেশের মানুষ দীর্ঘ নয় মাস লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। সেদিন এ দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষই ছিল যোদ্ধা। তারা লড়াই করছে একটি দুর্ধর্ষ বাহিনীর বিরুদ্ধে, তারা লড়াই করেছে একটি বাতিল রাষ্ট্রদর্শনের বিরুদ্ধে। যে লড়াইয়ে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন, কয়েক লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন, সেই লড়াইকে এতটা খাটো করে দেখা কাদির খানের পক্ষেই সম্ভব। তাঁর কাছে ন্যায় নয়, মানবতা নয়, পারমাণবিক অস্ত্রই হলো মূল শক্তি। একাত্তরে পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকলেও ১৯৯৮ সালে তো তারা সেই অস্ত্রের মালিক হয়েছে। তারপর কেন কারগিলে পর্যুদস্তু হলো? কেন দেশটি একবার তালেবান ও আল-কায়েদা ঘাঁটি, একবার আমেরিকান ঘাঁটিতে পরিণত হলো?
বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছে আজ ৪০ বছর। এত দিন পর কাদির খানের উপলব্ধি হলো, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক বোমা থাকলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। তাঁর এই যুক্তি মেনে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে কিউবা, চীনের পাশে তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, যুক্তরাজ্যের পাশে আয়ারল্যান্ড, রাশিয়ার পাশে পোল্যান্ড টিকে থাকতে পারত না। পারমাণবিক অস্ত্রধারী বড় দেশগুলো ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলো দখল করে নিত। আমরা জানি, বিজ্ঞানীরা অন্ধ আবেগ নয়, যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ দ্বারা পরিচালিত হন। কিন্তু কাদের খান বিজ্ঞানী হয়ে সেই অন্ধ আবেগ ও জাত্যভিমান ছাড়তে পারেননি। পাকিস্তানের প্রতি কাদির খানের অনুরাগ থাকতে পারে। তাই বলে বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মানুষকে, তাঁদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকে অপমান করার অধিকার তাঁর নেই। আমরা তাঁর এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছি। নিন্দা জানাচ্ছি।
কেবল কাদির খান নন, পাকিস্তানের আরও অনেক বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক মনে করেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ কিংবা ভারতের ষড়যন্ত্রের কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাঁদের ধারণা যে কত ভুল, তার প্রমাণ ঘরে ঘরে শহীদ, গ্রামে গ্রামে বধ্যভূমি, সারা দেশজুড়ে প্রতিরোধের অগ্নিশিখা। না হলে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায় নিরস্ত্র একটি জাতি লড়াই করে জয়ী হতে পারত না।
কাদির খানের এই বক্তব্যের সঙ্গে অদ্ভুত মিল খুঁজে পাই ভারতীয় বংশোদ্ভূত শর্মিলী বসুর কথিত গবেষণার। তিনিও পাকিস্তানিদের বরাতে প্রমাণ করতে চাইছেন, একাত্তরে বাংলাদেশে কোনো গণহত্যা বা নারী ধর্ষণ হয়নি। তাঁর বই নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ার পর কাদির খান নতুন করে আসর জমাতে চাইছেন। কয়েক দিন আগে পাকিস্তানের সাংবাদিক হামিদ মির ঢাকায় যে তথ্য দিয়েছেন, তা আমলে নেওয়ার মতো। তিনি বলেছেন, শর্মিলী বসু আসলে পাকিস্তান ও ভারত—দুই দেশের এজেন্ট হয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশে গণহত্যা হয়নি বলে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাপ মোচন করতে চাইছেন। অন্যদিকে ভারতকে বোঝাতে চাইছেন, সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই একাত্তরে তারা জয়ী হয়েছে। কাদির খান ও শর্মিলী বসুর যোগসূত্রটা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
কাদির খানরা আসলে একটি জাতির বীরত্ব ও গৌরব সেই দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ও অস্ত্রের সম্ভার দিয়ে মাপেন; সমগ্র জনগোষ্ঠীর বীরত্ব, দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে নয়।
কাদির খানের জানার জন্য বলছি, পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান অনেক আগেই অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক না হয়েও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক ভালো আছে। বাংলাদেশ অন্তত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কারও লাঠিয়াল হয়নি। কেউ এখানে সন্ত্রাসী খতমের নামে চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) থেকে বোমাও ফেলতে পারেনি। গত সপ্তাহে অরণ্যে রোদন কলামে বন্ধু আনিসুল হক লিখেছেন, ‘হাজার শোকর আমরা পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছি।’ আমি তাঁর সঙ্গে যোগ করব, ‘লাখো শোকর, আমাদের দেশে একজন কাদির খান নেই।’
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.