জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস-চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে কিছু প্রস্তাব by মোরশেদুল ইসলাম

সরকার এ বছর থেকে ৩ এপ্রিলকে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দিয়েছে। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য এটি একটি আনন্দসংবাদ। আমাদের অবহেলিত চলচ্চিত্রশিল্প বছরের এই একটি দিন অন্তত উঠে আসবে পাদপ্রদীপের আলোয়।


৩ এপ্রিল আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘পূর্ব পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন’ বিল এনেছিলেন, যার ফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আজকের এফডিসি। মুখ ও মুখোশ নির্মাণের মধ্য দিয়ে যদিও আব্দুল জব্বার খান এর আগেই সূচনা করেছিলেন এ দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের। এ কথা বলা হয়তো যুক্তিহীন হবে না যে এফডিসি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এ দেশে সূচনা হয়েছিল চলচ্চিত্রশিল্পের। এই দিনটিকে তাই জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকার একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বই পালন করল। বর্তমান সরকার যে চলচ্চিত্রকে গুরুত্বের সঙ্গেই দেখতে চায়, এই স্বীকৃতি তারও ইঙ্গিত বহন করে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের চলচ্চিত্র বর্তমানে এক মহা সংকটকাল অতিক্রম করছে। এফডিসিতে ভালো কারিগরি মান বজায় রেখে চলচ্চিত্র নির্মাণের সুবিধা নেই, প্রেক্ষাগৃহগুলোর অবস্থা শোচনীয়। প্রতি মাসে কয়েকটি করে সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে বছরে প্রায় ১০০টি করে সিনেমা তৈরি হতো, এখন সেটা নেমে এসেছে ৩০-৪০টিতে। চলচ্চিত্রে পুঁজির সংকট এবং মেধার সংকট তো আছেই। এ অবস্থায় চলচ্চিত্র নিয়ে কিছু বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া গেলে শক্তিশালী এই মাধ্যমটিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারকে একই সঙ্গে অনেকগুলো উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রথমত, এফডিসিকে ঢেলে সাজাতে হবে। ভালো ক্যামেরা আনতে হবে, মানসম্মত আধুনিক ল্যাব গড়ে তুলতে হবে, সাউন্ড কমপ্লেক্সের আধুনিকায়ন করতে হবে। ডলবি ডিজিটাল সাউন্ড ব্যবস্থা যোগ করতে হবে। শুটিং ফ্লোরগুলোর অবস্থারও উন্নতি করতে হবে। একই সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ডিজিটাল ছবি বানানোর পূর্ণাঙ্গ সুযোগ। দর্শক এখন আর কুয়োর ব্যাঙ নেই, কেব্ল টিভি, ডিভিডির কল্যাণে দর্শক এখন সারা বিশ্বের ছবি দেখার সুযোগ পাচ্ছে। আমাদের ছবি ন্যূনতম মানের না হলে দর্শক তা দেখবে কেন? আশার কথা যে এফডিসির আধুনিকায়নের জন্য সরকার সম্প্রতি কিছু অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সে অর্থ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। একজন যোগ্য ও দক্ষ সংস্কৃতিকর্মীকে এফডিসির এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কিছুদিন পরই তথ্য মন্ত্রণালয় তাঁকে অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেওয়ায় এই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
সারা দেশের সিনেমা হলগুলোর অবস্থা এতটাই খারাপ যে কোনো সুস্থ মানুষই এখন আর সিনেমা হলে যেতে চায় না। সিনেমা হলগুলোর দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকার কিছু প্রণোদনা দিলে কাজটা সহজ হয়। সরকার যদি সিনেমা হলগুলোর একটা মানদণ্ড ঠিক করে দেয় এবং ঘোষণা দেয়, যেসব সিনেমা হল এই মানদণ্ড অনুযায়ী সংস্কার করবে, তাদের পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে প্রদান করবে এবং সহজ শর্তে ঋণ দেবে, তাহলে অনেক প্রেক্ষাগৃহের মালিকই হয়তো এগিয়ে আসবেন। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রজেকশন ব্যবস্থা যুক্ত করার শর্তটিও থাকতে হবে। আর যেসব সিনেমা হল ভেঙে শপিং মল বানানো হবে, সেখানে অন্তত একটি মাল্টিপ্লেক্স গড়ে তোলার শর্তটিও অবশ্যই আরোপ করতে হবে।
ডিজিটাল প্রজেকশন সিস্টেমটি চালু করা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে এবং এটি হতে হবে সার্ভারভিত্তিক। অর্থাৎ একটি মূল কেন্দ্র থেকে একটি চলচ্চিত্র স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আপলোড করা হবে এবং একই সঙ্গে অনেকগুলো প্রেক্ষাগৃহ তা নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী ডাউনলোড করে সরাসরি প্রজেকশন করবে। এতে যেমন উন্নতমানের প্রজেকশন মান নিশ্চিত করা যাবে, তেমনি পাইরেসির আশঙ্কাও অনেকাংশে কমে যাবে। শুধু ডিজিটাল মাধ্যমে নির্মিত চলচ্চিত্রই নয়, ৩৫ মিলিমিটারে নির্মিত চলচ্চিত্রও মুক্তি পেতে পারে ডিজিটাল প্রজেকশন ব্যবস্থায়। এতে করে প্রিন্ট তৈরি করার খরচ কমে যাবে এবং প্রযোজক দ্রুত তার পুঁজি ফেরত আনতে পারবেন।
এগুলো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, যা সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে নিতে হবে চলচ্চিত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে টেনে তোলার জন্য। এবার বলব অন্য কিছু বিষয়ে, যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশে।
বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবি চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন। আশার কথা যে বর্তমান সরকার সেটা অনুধাবন করেছে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রাথমিক কাজকর্ম ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এখন যত দ্রুত এটা বাস্তব রূপ লাভ করে ততই মঙ্গল। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের একটি পরিকল্পিত নিজস্ব ভবনের স্বপ্নও দীর্ঘদিন থেকেই দেখে আসছিলাম আমরা। আশার কথা যে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সেটির কাজও শুরু হয়েছে। আর্কাইভকে সমৃদ্ধ করার জন্য উচ্চপ্রযুক্তির কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতিও ইতিমধ্যেই এসে গেছে।
আমাদের আরেকটি স্বপ্ন ছিল ঢাকায় একটি জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার। এটি হবে দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের একটি মিলনকেন্দ্র। যেখানে বিভিন্ন আসনের একাধিক মিলনায়তনে চলবে দেশ-বিদেশের ধ্রুপদি চলচ্চিত্র, থাকবে চলচ্চিত্রের বই, ম্যাগাজিন আর ডিভিডির একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, সেমিনার কক্ষ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, ক্যাফেটেরিয়া ইত্যাদি, যার প্রতিটি কার্যক্রম দেশের চলচ্চিত্রপিপাসুদের ক্ষুধা মেটাবে, তাদের করে তুলবে সমৃদ্ধ। অনেকটা কলকাতার নন্দন বা লন্ডনের ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটারের মতো। বর্তমান সরকারের কাছ থেকে আমরা পাব কি সেই স্বপ্ন পূরণের কোনো উদ্যোগ?
একটি দেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতি কতটা সমৃদ্ধ তা বোঝা যায় সে দেশের চলচ্চিত্র উৎসবের সংখ্যা ও মান দেখে। এটা খুবই আনন্দের যে বাংলাদেশে এখন বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে। তবে তার সব কটিই বেসরকারি উদ্যোগে এবং তার কোনোটিই সিনেমা হলকেন্দ্রিক নয়। এ দেশে সরকারি উদ্যোগে অন্তত একটি চলচ্চিত্র উৎসবও কি আয়োজন করা যায় না, যা অনুষ্ঠিত হবে একই সঙ্গে পাঁচ-ছয়টি সিনেমা হল নিয়ে? সরকারি উদ্যোগে হলে উৎসবকে ঘিরে অনেক কিছুই করা সম্ভব, যা বেসরকারি উদ্যোগে করা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। চলচ্চিত্রকে আমরা কীভাবে দেখতে চাই, চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের ভিশনটা কী সেটা নির্ধারণ করার জন্য একটি জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা থাকা খুবই জরুরি। নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে অতীতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিছু কাজও হয়েছিল, কিন্তু তা কখনো আলোর মুখ দেখেনি। এই সরকার জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালার কাজটিও শেষ করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিটি এ দেশের চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিলেন। যতটুকু জেনেছি, এ মাসের মধ্যেই হয়তো কাজটি সম্পন্ন হবে। শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেলে চলচ্চিত্রের অনেক প্রতিবন্ধকতাই কেটে যাবে, খুলে যাবে অপার সম্ভাবনার দ্বার।
সবকিছু মিলিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস উদ্যাপনের এই শুভক্ষণে আমরা চলচ্চিত্র নিয়ে আরেকটু আশাবাদী তো হতেই পারি।
মোরশেদুল ইসলাম: চলচ্চিত্রনির্মাতা ও চলচ্চিত্র সংসদকর্মী।

No comments

Powered by Blogger.