যুবশক্তি-তারুণ্যের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ by বদিউল আলম মজুমদার

সম্প্রতি ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী ‘অ্যাকটিভ সিটিজেন এচিভার্স সামিট’ বা সফল সক্রিয় নাগরিকদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সারা দেশ থেকে প্রায় দেড় শ তরুণ, যারা বিভিন্ন ধরনের সমাজ উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত ও সফল, তারাই এ মিলনমেলায় অংশ নেয়। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী,


ব্রিটিশ কাউন্সিলের পরিচালক রোজমেরি আরনল্ডসহ দেশ-বিদেশের বেশ কয়েকজন বরেণ্য ব্যক্তি এতে অংশ নেন। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, জেসমিন দানিশসহ আমার নিজেরও একটি অধিবেশনে তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ-আলোচনা করার সুযোগ হয়।
আমি আলোচনা শুরু করি একটি প্রশ্নের মাধ্যমে: তরুণেরা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করে কি না? অনেকক্ষণ ধরে আলোচনার পর তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, তারা অতি গুরুত্বপূর্ণ। আর এ গুরুত্বের মূলত দুটি কারণ—একটি হলো তাদের সংখ্যা এবং অপরটি তাদের সমাজ উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা।
সংখ্যার দিক থেকে আসলেই বাংলাদেশে কিশোর-তরুণেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ কোটি ৮৭ লাখ, যা ২০১১ সালে ১৫ কোটি ৬১ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে, অর্থাৎ ২০২১ সালে এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৮ কোটি ৬১ লাখ, ২০৩০ সালে ২১ কোটি ১৩ লাখ এবং ২০৫০ সালে ২৫ কোটি দুই লাখ।
ইউএস সেন্সাস ইন্টারন্যাশনালের প্রজেকশন অনুযায়ী, ২০১১ সালে বাংলাদেশে কিশোর-যুবদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত কোটি ২২ লাখ, ২০২১ সালে আট কোটি ১৫ লাখ, ২০৩০ সালে আট কোটি ৫১ লাখ এবং ২০৫০ সালে আট কোটি ৩১ লাখ। অর্থাৎ আগামী ৪০ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যায় কিশোর-যুবদের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়তেই থাকবে, যদিও ২০৫০ সালে এ সংখ্যা কিছুটা কমবে।
তবে সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যায় কিশোর-যুবদের সংখ্যা আগামী ৪০ বছরে বাড়লেও আনুপাতিক হারে তা কমবে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে আমাদের মোট জনসংখ্যায় কিশোর-যুবদের অনুপাত ছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ। এ অনুপাত ২০১১ সালে প্রায় ৪৫ শতাংশ, ২০২১ সালে ৪৪ শতাংশ, ২০৩০ সালে ৪০ শতাংশ ও ২০৫০ সালে ৩৪ শতাংশে এসে দাঁড়াবে। অর্থাৎ জনসংখ্যায় কিশোর-যুবদের অনুপাত কমলেও তা এক-তৃতীয়াংশের নিচে নামবে না। অন্যভাবে বলতে গেলে, আগামী কয়েক দশকে কিশোর-যুবরা আমাদের জনসংখ্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েই থাকবে।
নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবার অন্যতম কারণ হলো তাদের সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। সমবেত কিশোর-যুবরা মনে করে, তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত। বস্তুতই তারা অনেক কিছু করছে। কিশোর-যুবদের কাছে আমার আরেকটি প্রশ্ন ছিল: কী ধরনের বাংলাদেশ চায় তারা? তাদের উত্তর ছিল সুস্পষ্ট—তারা একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, আত্মনির্ভরশীল ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে চায়। আর এ লক্ষ্যে তারা ‘লোকালি এনগেজড অ্যান্ড গ্লোবালি কানেক্টেড’ হতে চায়। তারা বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব নাগরিক হতেও অতি আগ্রহী। জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ স্লোগানে তারা বিশ্বাসী নয়। তারা মনে করে, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন তারা এবং তাদের পূর্বসূরিরা বুকে লালন করে, বিশ্ব নাগরিকতার দৃষ্টিভঙ্গি তাদের সে স্বপ্নপূরণে সহায়ক হবে।
সমবেত কিশোর-যুবদের সঙ্গে আলোচনা থেকে আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাদের উপলব্ধিতে আসে। তা হলো, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে কিশোর-যুবরা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয় যে ভবিষ্যতে কী ধরনের বাংলাদেশ আমরা পাব, তা তাদের দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে কিংবা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ দ্বারা তারা প্রভাবিত হতে পারে। অর্থাৎ তাদের সামনে আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ চয়েস বা প্রশ্ন: তারা প্রভাব ফেলতে চায়, না প্রভাবিত হতে চায়? বস্তুত, এ প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে।
আজকের কিশোর-যুবদের মেধা-সৃজনশীলতার যদি পরিপূর্ণ বিকাশ না ঘটে, যদি তারা নিষ্ক্রিয় থাকে, যদি তারা জাতি গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা না রাখে, তাহলে যে সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তারা লালন করে, তা বাস্তবে রূপায়িত হবে না। অর্থাৎ তাদের বিরাট সংখ্যা যদি জনশক্তিতে পরিণত না হয়, তারা যদি বিপথগামী হয় এবং বিশৃঙ্খল আচরণ করে, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে এবং জাতি হিসেবে আমরা নরকে পরিণত হব। এ অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
পারস্পরিক মতবিনিময় থেকে কিশোর-যুবাদের কাছে আরও সুস্পষ্ট হয় যে, তারা যদি তাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের নির্মাতা না হয় এবং এ কাজে নেতৃত্ব প্রদর্শন না করে, তাহলে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের ‘ভিকটিম’ বা শিকারে পরিণত হবে। অর্থাৎ তারা যদি নির্লিপ্ত থেকে জাতি গঠনের ক্ষেত্রে নিতান্তই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তাহলে তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে উঠবে না। আর এর মাশুল তাদের নিজেদেরই গুনতে হবে।
কিশোর-তরুণদের মেধা-সৃজনশীলতার পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ এবং তাদের ইতিবাচক কাজে জড়িত হওয়ার জন্য অবশ্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন হবে নীতিনির্ধারকদের যথাযথ পদক্ষেপ। অর্থাৎ কিশোর-যুবাদের সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য বড়দেরও রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
কিশোর-তরুণদের কাছে আমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল: তারা একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চায়, কিন্তু কী ধরনের বাংলাদেশে এখন তারা বসবাস করছে? ইউনিসেফ থেকে প্রাপ্ত অনেক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের পর তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো অনুন্নত। যেখানে ২০১০ সালে সারা বিশ্বের মাথাপিছু বার্ষিক গড় জাতীয় আয় ছিল আট হাজার ৭৯৬ মার্কিন ডলার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর তিন হাজার ৩০৪ মার্কিন ডলার, সেখানে বাংলাদেশের মাত্র ৬৮০ ডলার। ১ দশমিক ২৫ মার্কিন ডলারের নিচে আয় করে এমন ব্যক্তির সংখ্যা ২০১০ সালে যেখানে সারা বিশ্বে ছিল ২৫ শতাংশ, উন্নয়নশীল দেশে ২৬, বাংলাদেশে তা ছিল ৫০ শতাংশ। গত ৪০ বছরে অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক দূর এগোলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের, এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোর পর্যায়ে পৌঁছাতে আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে।
কিশোর-তরুণদের কাছে আরও সুস্পষ্ট হয় যে শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, আরও অনেক দিক থেকেও বাংলাদেশ অনেক পেছনে পড়ে আছে। যেমন, ২০০৫-১০ সালে সারা বিশ্বে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বয়স্ক শিক্ষার হার ছিল যেখানে যথাক্রমে ৮৪ ও ৮০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে সেই হার ছিল ৫৬ শতাংশ, অথচ আমাদের পূর্বসূরিরাই মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। আর ২০০০-১০ সালে বাল্যবিবাহের হার যেখানে সারা বিশ্বে এবং উন্নয়নশীল দেশে ৩৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা ছিল ৬৬ শতাংশ। ২০১০ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রতি ১০০ জনে সারা বিশ্বে ৭৮ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ৭০ জন হলেও বাংলাদেশে সেই সংখ্যা ছিল মাত্র চারজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ভয়াবহ ঝুঁকির কথা তো কিশোর-তরুণদের জানাই।
আমাদের আলোচনা থেকে যে বিষয়টি কিশোর-তরুণদের সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে তা হলো, ক্রমাগতভাবে আমরা একটি অসম সমাজে পরিণত হয়েছি। ২০০৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে পরিবারভিত্তিক আয় বণ্টনের হার সমাজের সর্বনিম্ন পাঁচ শতাংশের যেখানে ছিল শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ, সেখানে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের ছিল ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তথ্য-উপাত্ত থেকে তাদের কাছে এটি সুস্পষ্ট হয় যে এ অসমতা আমাদের ভবিষ্যৎ সামাজিক সম্প্রীতির জন্য এক বিরাট হুমকি।
ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক আলাপ-আলোচনা শেষে সমবেত কিশোর-তরুণদের মধ্যে এই তাগিদ সৃষ্টি হয় যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মূলত তাদের হাতের মুঠোর মধ্যে। আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করবে তাদের বর্তমান সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তার ওপর। বস্তুত, তারুণ্যের ভবিষ্যৎই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এই উপলব্ধি থেকে তারা তাদের শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বেগবান ও বিস্তৃত করার এবং অন্য কিশোর-তরুণদেরও তাদের কাফেলায় শামিল করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। কিশোর-তরুণদের সক্রিয় ও সোচ্চার থাকার এবং অন্যদের সম্পৃক্ত করার এ প্রত্যয় আমাকেও দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

No comments

Powered by Blogger.