দুর্র্নীতি দমন-স্বাধীন ও কার্যকর দুদক চাই

দুর্নীতির জন্য রাজনীতিবিদরাই প্রধানত দায়ী, নাকি দুর্নীতির সূতিকাগার সরকারি খাত বিধায় সরকারি কর্মকর্তারাই কাঠগড়ায় থাকবে_ এ নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। আবার এভাবেও কেউ বলতে পারেন, দুর্নীতির সুফল মূলত ভোগ করে ব্যক্তি এবং চূড়ান্ত বিচারে বিষয়টি ব্যক্তিগত।


এ কারণে সর্বগ্রাসী দুর্নীতির মূলে ব্যক্তি কিংবা সামষ্টিকভাবে ব্যক্তি অর্থাৎ বেসরকারি খাত। যুক্তিতর্ক যে পথেই চলুক, সার কথা হচ্ছে দুর্নীতি বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা এবং এর সমাধানে প্রধান প্রধান প্রতিবন্ধক হচ্ছে : দুর্নীতি দমনে বিদ্যমান আইনে দুর্বলতা, দুর্নীতি মামলার সময়মতো নিষ্পত্তি না হওয়া, দুর্নীতির অনেক মামলা রাজনৈতিক প্রভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া, দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব ইত্যাদি। দুর্নীতির কারণে সমাজের সবাই সমান সুযোগ পায় না, আইনের সমান আশ্রয় পায় না এবং সরকারি সেবা খাত থেকে সমান সেবাও পায় না। দুর্নীতির এক বা একাধিক কারণ যেহেতু স্পষ্টভাবে চিহ্নিত, সে কারণে সমস্যা সমাধানে পথ হাতড়ানোর দরকার পড়ে না। রোববার দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের আলোচনা থেকেও সুপারিশ তাই স্পষ্ট_ দেশের প্রাণশক্তি নিঃশেষ করে চলা এ কালান্তক ব্যাধি থেকে নিষ্কৃতি পেতে বিদ্যমান আইনের সংস্কার করতে হবে। আর এটা সম্ভব করার জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী সব পক্ষের ভূমিকা বাঞ্ছনীয়। তবে সংসদে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাজনৈতিক সরকারের ওপর অর্পিত, তাই দুর্নীতি দমনে তাদেরই গ্রহণ করতে হবে মুখ্য ভূমিকা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে যথার্থই বলেছেন, 'দুর্নীতির প্রসার ঠেকাতে হবে_ পহেলা রাতে বিলি্ল মারতে হবে এবং সদাশয় সরকারকে যথাযথ আইন প্রণয়ন করে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে হবে।' বর্তমান মহাজোট সরকারের সামনে তাই করণীয় স্পষ্ট_ দুদককে কার্যকর সংস্থায় পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা। দুদক চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান বারবার বলেছেন, সংস্থাটিকে নখদন্তহীন ব্যাঘ্রে পরিণত করা যাবে না। এ জন্য একটি জরুরি কাজ হচ্ছে দুদক আইনের সংশোধনী জাতীয় সংসদে অনুমোদন। এ প্রতিষ্ঠানটিকে কোনোভাবেই সরকারের ওপর নির্ভরশীল রাখা যাবে না, তাদের স্বাধীনতা হতে হবে নিরঙ্কুশ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার এ কার্যক্রম যেমন ব্যবহার করা যাবে না, তেমনি 'প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ রাজনীতিককে তার জামিন দেওয়া-নেওয়া নিয়ে প্রহসন করা' এবং নিজ বলয়ভুক্তদের দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দুদক আয়োজিত আলোচনা সভার শিরোনাম ছিল, 'দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা'। প্রকৃতপক্ষে অঙ্গীকার বলতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিশেষ করে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের নির্বাচনকালীন প্রতিশ্রুতির কথাই বলা হয়েছে। গণমাধ্যমও সর্বদা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। আর শুধু সুশীল সমাজ নয়, সমাজের সব অংশ থেকেই ধিক্কার ওঠে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। এ কারণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তার সপক্ষে জনমত থাকবেই।

No comments

Powered by Blogger.