লন্ডনে খালেদার ভাষণ-সত্য ও অর্ধসত্য by এ কে এম জাকারিয়া

এরশাদের সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় সুপ্রিম কোর্ট বহাল রাখার পর বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটে গেছে। এরশাদের সামরিক শাসন অবৈধ হিসেবেই বিবেচিত হবে এখন। গত বছরের ২৬ আগস্ট হাইকোর্টের এক রায়ে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়।


রায়ে সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে এরশাদের সামরিক আইন জারি, আদেশ, আইন, সামরিক ফরমান জারি ও কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করা হয়। অবৈধ শাসকের এই আনুষ্ঠানিক খেতাব পাওয়ার আগে অবশ্য স্বৈরশাসকের খেতাব এরশাদের নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এই স্বৈরশাসকের সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সখ্য, বন্ধুত্ব বা দেনা-পাওনার সম্পর্ক শুরু থেকেই। বর্তমান মহাজোট সরকারের অন্যতম শরিকও স্বৈরশাসকের দল জাতীয় পার্টি।
দেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখন দেশের বাইরে। গত রোববার তিনি বিএনপি যুক্তরাজ্য শাখার কর্মী সমাবেশে ভাষণ দিয়ে আওয়ামী লীগের এই অবৈধ সরকারপ্রীতির বিষয়টি সবাইকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি যা বলেছেন, তার মর্মার্থ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ অতীতের সব অবৈধ সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। ‘তারা (আওয়ামী লীগ) এরশাদের অবৈধ সরকারকে স্বীকৃতি দিতে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।’ আর সর্বশেষটি হচ্ছে ‘মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার’। এরশাদের সামরিক শাসন সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে অবৈধ হয়ে গেলেও ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবশ্য এখনো এমন কোনো রায়ের মুখোমুখি হয়নি। এখন গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিবেচনায় ফখরুদ্দীন আহমদের ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে যদি আমরা ‘অবৈধ’ হিসেবে ধরে নিই এবং খালেদা জিয়ার দাবি অনুযায়ী ‘মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের’ সঙ্গে আওয়ামী লীগের আঁতাতের বিষয়টি মেনে নিই, তবে ‘অবৈধ সরকার মানেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত’—এমন একটি ধারণা হালে পানি পেতে পারে। খালেদা জিয়া সম্ভবত এ বিষয়টির প্রতিই সবার নজর আনার চেষ্টা করছেন।
বিষয় যখন বাংলাদেশের ‘অবৈধ সরকার’, তখন আরও একটি অবৈধ সরকারের কথাও আমাদের স্মরণে থাকা জরুরি। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কি সেই অবৈধ সরকারের কথা ভুলে গেছেন? নাকি ভুলে থাকতে চাইছেন? দুটির যেটিই হোক, আমরা তাঁকে বিষয়টি আবার মনে করিয়ে দিতে চাই, তাঁর নজরে আনতে চাই। ২০০৫ সাল, বিএনপি তখন ক্ষমতায়; ২৯ আগস্ট এক রায়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দেন হাইকোর্ট। আদালতের রায়ে বলা হয়, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাকের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ সংবিধানবহির্ভূত এবং বেআইনি। একইভাবে ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছে খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা হস্তান্তরও অবৈধ।’ সে সময়ের ধারাবাহিক ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়ার পুরোটিই অবৈধ ঘোষণা করে আদালত বলেছেন, প্রধান বিচারপতির রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা গ্রহণ ও তাঁকে সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ এবং জিয়াউর রহমানকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগও সংবিধানবহির্ভূত। জিয়াউর রহমানের কাছে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব অর্পণও ছিল সংবিধানবহির্ভূত ও অবৈধ। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে তাঁকে (জিয়াউর রহমানকে) প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ সংবিধানের সীমা-বহির্ভূত। তাঁর এই নিয়োগ বেআইনি, সংবিধানবহির্ভূত ও অবৈধ—একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে তাঁর নেওয়া সব সিদ্ধান্তও অবৈধ। আপিল বিভাগ মোশতাক ও জিয়ার সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের এই রায়কে বহাল রেখেছেন।
এরশাদের সামরিক শাসন অবৈধ ঘোষণার আগেই জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে অবৈধ হয়ে গেছে। লন্ডনে খালেদা জিয়ার দেওয়া ভাষণটি কি তাঁর মনের ভুলে অসম্পূর্ণ রয়ে গেল? নাকি ইচ্ছে করেই বললেন সত্যের অর্ধেক? খালেদা জিয়ার ভাষণে জিয়াউর রহমানের অবৈধ সরকারের প্রসঙ্গ এবং এই অবৈধ সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আঁতাত বা সম্পর্ক কেমন ছিল, তার উল্লেখ থাকলে ভাষণটি সত্যিই অসামান্য হয়ে উঠত!
জেনারেল মইন উ আহমেদ নাকি জিয়াউর রহমান হতে চেয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার কথায় ‘মইনউদ্দিন জিয়া হতে চেয়েছিলেন’। কীভাবে? সে ব্যাখ্যা অবশ্য আমরা তাঁর ভাষণে পাইনি। অন্য যা বলেছেন তা হচ্ছে, জেনারেল মইন আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে বিশ্বাসঘাতক নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সাজানো নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিলেন বলে জিয়া হতে পারেননি। তবে কি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘গোপন চুক্তি’ করে ‘বিশ্বাসঘাতক’ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ‘সাজানো’ নির্বাচন না দিয়ে যদি জেনারেল মইন উ আহমেদ নিজেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করতেন, তাহলে তিনি জিয়াউর রহমান হতে পারতেন?
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.