আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল-আতঙ্কের নাম বেড়িবাঁধ by মিঠুন চৌধুরী

৯১ সালে জেঠাতো ভাইয়ের বউ ও ভাতিজিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় পানি। আমার ভাইঝি তার মাকে জড়িয়ে ধরে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু পানির তোড়ে দুজনই ভেসে যায়। পরে তাদের লাশ উদ্ধার হলে দেখা যায়, দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে আছে।’


১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়াবহ স্মৃতির কথা বলছিলেন নগরের উত্তর পতেঙ্গার হাদিপাড়ার কাজীবাড়ির বাসিন্দা মোহাম্মদ কবির। সেই বিভীষিকা এখনো ভুলতে পারেননি তিনি। নগরের উপকূলের বাসিন্দাদের আজও তাড়া করে ফেরে সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতি। সেদিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এখনো ভয়ে শিউরে ওঠেন অনেকে। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা এখনো আতঙ্কিত। আতঙ্কের কারণ বেড়িবাঁধ।
সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরপাড়া, মুসলিমাবাদ, খেজুরতল, আনন্দবাজার ও জেলেপাড়া এলাকার কিছু অংশে বেড়িবাঁধে ছোট-বড় কয়েকটি ভাঙন আছে। গত দুই বছরে ছোটখাটো কিছু সংস্কারকাজ করা হলেও এসব ভাঙন স্থায়ীভাবে সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। চলতি অর্থবছরে সংস্কারকাজ শুরুর সম্ভাবনাও নেই। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এসব ভাঙন বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে স্থানীয় লোকজন আশঙ্কা করছেন।
আশঙ্কার পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৭ সালের নভেম্বরে সিডরে সৃষ্ট জোয়ারে বাঁধে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। ২০০৮ সালে জোয়ারে বাঁধের আরও কয়েকটি স্থানে ভাঙন দেখা যায়। ওই সময় জোয়ারের পানি বাঁধসংলগ্ন এলাকায় ঢুকে পড়ে। তলিয়ে যায় ৩০টি চিংড়িঘের। পরে এডিবির অর্থায়নে ২০০৯ সালে বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করা হয়।
গত শুক্রবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম শহর রক্ষাবাঁধের চরপাড়া, মুসলিমাবাদ, খেজুরতল ও জেলেপাড়া এলাকায় বাঁধে ছোট-বড় ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিমাবাদ এলাকার বাসিন্দা শাহ নূর বলেন, ‘বছর দুয়েক আগেও বাঁধ মেরামত করা হয়েছিল। এখন আবার ভেঙে গেছে। ভয় লাগে কখন জোয়ারের পানি ঢুকে যায়।’
৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুল বারেকও বললেন ঝুঁকির কথা। তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে এই এলাকার কয়েক হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। শুধু আমার বাড়ি হোসেন আহমদপাড়ায় মারা যান ২১ জন। প্রায় সব স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এখনো জেলেপাড়া, চরপাড়া ও খেজুরতল এলাকায় বাঁধের অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকায় লক্ষাধিক মানুষের বাস। বাঁধের কোনো ক্ষতি হলে লাখ খানেক মানুষ ঝুঁকিতে পড়বেন।’
প্রসঙ্গত, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও লোনা পানি থেকে উপকূল ও শহর রক্ষার জন্য পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ২১ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯৬৫-৭০ সালের গৃহীত এ প্রকল্পটির কাজ ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ করা হয়। এতে পানি নিষ্কাশনের জন্য ১৩টি স্লুইসগেটও রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ছিল ১১৩ কোটি টাকা।
বাঁধের বিষয়ে জানতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফ জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাটির বাঁধ হওয়ায় কিছু অংশে ভাঙন হওয়াটা স্বাভাবিক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির উচ্চতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাড়ছে। তবে বাঁধের কয়েকটি অংশে পাথরের ব্লক ফেলে সাময়িক মেরামত করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের উপপরিচালক শহীদ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পরিদর্শনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সংস্কারের জন্য কয়েকটি স্থান নির্ধারণ করে একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের দপ্তরে আছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ অর্থবছরে প্রকল্পটিতে অর্থ বরাদ্দের সম্ভাবনা কম। অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলেই দ্রুতগতিতে কাজ করা হবে।’

No comments

Powered by Blogger.