মিডিয়া ভাবনা-মিডিয়া নিয়ে মতামত জরিপ by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় চ্যানেল। ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্টের জরিপ থেকে তথ্যমন্ত্রী এ তথ্য দিয়েছেন। (সূত্র: প্রথম আলো, ৮ জুন, ২০১১)

‘ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্ট’ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই (এটা অবশ্য আমারই ব্যর্থতা)। তাদের এই জরিপের পদ্ধতি বা আনুষঙ্গিক তথ্যও জানা নেই। ট্রাস্টের জরিপটির ফল আলাদাভাবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে বলেও শুনিনি। জরিপ রিপোর্টটি পড়ার সুযোগ পেলে আমার আলোচনাটি আরও অর্থপূর্ণ হতো। এখন তথ্যমন্ত্রীর শুধু একটি মন্তব্যের ওপর ভরসা করে আমাকে লিখতে হচ্ছে।
তথ্যমন্ত্রী জরিপ রিপোর্ট উদ্ধৃত করে বলেছেন, বিটিভিই বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল।
সাধারণ মতামত বা মন্তব্যের চেয়ে যেকোনো জরিপ রিপোর্টই মূল্যবান। কারণ সেখানে ১০০, ২০০ বা এক হাজার লোকের মতের প্রতিফলন ঘটে। যদি জরিপটি বৈজ্ঞানিক ও পেশাদারি পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। আমরা যখন সংবাদপত্রে কলাম লিখে পাঠককে একটি মত জানাই, তা আসলে একজন ব্যক্তিরই মতামত। হয়তো তাতে এক লাখ মানুষের (বা আরও বেশি) মতের প্রতিফলন থাকতে পারে। কিন্তু কোনো লেখকই তা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারেন না। সে জন্য ব্যক্তিগতভাবে মতামত জরিপ রিপোর্টকে আমি খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কারণ তা অনেকের মতের প্রতিফলন।
পাঠক জানেন, ‘বিটিভি’ দেশের একমাত্র টেরিস্ট্রিয়াল টিভি চ্যানেল। অর্থাৎ কেব্ল লাইন বা ডিশ অ্যান্টেনা ছাড়াই বিটিভির অনুষ্ঠান সারা দেশে দেখা যায়। বিটিভির অনুষ্ঠান দেখার জন্য টিভি সেট ও বিদ্যুৎ লাইন (সৌরবিদ্যুৎ বা ব্যাটারি হলেও চলবে) থাকলেই হবে। দেশের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো অবস্থায় বিটিভির অনুষ্ঠান দেখা সম্ভব। পাশাপাশি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোর (১৪টি) অনুষ্ঠান দেখতে হলে কেব্ল লাইন, ডিশ অ্যান্টেনাসহ নানা আয়োজনের প্রয়োজন হয়, যা দেশের বড় বা মাঝারি শহর ছাড়া এখনো সম্ভব হয়নি। কয়েকটি ছোট শহর, এমনকি কিছু কিছু গ্রামেও কেব্ল সংযোগ পৌঁছেছে হয়তো। (অনুমান মাত্র, কোনো জরিপ বা তথ্য নেই!) কিন্তু বাংলাদেশের সব প্রান্তে, সব গ্রামে, চরাঞ্চলে, দ্বীপে বা গহিন পাহাড়ি এলাকায় যে কেব্ল সংযোগ পৌঁছেনি, তা একরকম নিশ্চিত হয়ে বলা যায়। কেব্ল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন কি এ ব্যাপারে প্রকৃত তথ্য দিয়ে আমাদের সহায়তা করতে পারে? বাংলাদেশে কেব্ল টিভির মানচিত্রটা দর্শকের কাছে এখনো স্পষ্ট নয়। এ ব্যাপারে একটা খসড়া প্রতিবেদনও কি কেউ তৈরি করতে পারে না?
যাই হোক, ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্ট এই পরিস্থিতির আলোকেই জরিপ পরিচালনা করে রায় দিয়েছে যে বিটিভিই দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় চ্যানেল। মতামত জরিপ ও গবেষণা পদ্ধতির পেশাদারি সম্পর্কে যাঁরা সামান্য জ্ঞান রাখেন, তাঁরা বুঝতে পারবেন, এই মতামত জরিপটি একটি অসম কাজ হয়েছে। যে অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানিই পৌঁছে না, সে অঞ্চলে পানির বিশুদ্ধতা নিয়ে মতামত জরিপ করলে যা দাঁড়াবে, এখানেও তা-ই হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী হয়তো বিটিভির অনুষ্ঠান সম্পর্কে এত নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে শুনতে একটা ইতিবাচক মন্তব্য পেয়ে জাতীয় সংসদে তা বলার লোভ সংবরণ করতে পারেননি। মানুষ সব সময় নিজের প্রতিষ্ঠানের ভালোটাই দেখতে চায়।
বিটিভি নিয়ে মতামত জরিপের নানা সুযোগ রয়েছে এবং তা কেব্ল চ্যানেলের সঙ্গেও করা যায়। সে ক্ষেত্রে জরিপটি শুধু শহরকেন্দ্রিক হতে হবে। যেখানে বিটিভি ও কেব্ল চ্যানেলের অনুষ্ঠান সব দর্শকই দেখতে পারে। মতামত জরিপটি হতে পারে টিভি অনুষ্ঠান-সম্পর্কিত, চ্যানেল-সম্পর্কিত নয়। যেমন কোনো টিভি চ্যানেলের খবর, টক শো, ধারাবাহিক নাটক, প্রতিভা সন্ধান শো, উন্নয়ন অনুষ্ঠান, সংগীতানুষ্ঠান, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, সাক্ষাৎকার (ও অন্যান্য) দর্শকের ভালো লাগে। এখানে জানা যাবে কোন চ্যানেলের কোন অনুষ্ঠান জনপ্রিয় (পাঁচ হাজার বা ১০ হাজার দর্শকের মধ্যে)। খুব বেশি দর্শকের মতামত নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা সম্ভবও নয়, বৈজ্ঞানিকও নয়।
ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্ট প্রতিবছর এ ধরনের একটা মতামত জরিপ করলে তা একটা অর্থপূর্ণ কাজ হতো। এই জরিপের ভিত্তিতে একটা বার্ষিক পুরস্কারও দেওয়া যায়। বর্তমানে বহুল প্রশংসিত ‘মেরিল-প্রথম আলো’ পুরস্কার কোনো পেশাদারি বা বৈজ্ঞানিক জরিপের ভিত্তিতে পরিচালিত জনমত জরিপ নয়। এখানে যে কেউ জরিপে কুপন পাঠাতে পারে বা এসএমএসের মাধ্যমে ভোট দিতে পারে। তা ছাড়া দর্শকের বয়স, পেশা, জেন্ডার, এলাকা ইত্যাদি দেখারও সুযোগ নেই। একজন ‘আগ্রহী’ শিল্পী ১০০ ফরম পূরণ করেও পাঠাতে পারেন, যা টিভির ‘প্রতিভা সন্ধানে’ এসএমএসের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হচ্ছে। কাজেই এসব পুরস্কারকে পেশাদারি ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে পরিচালিত জনমত জরিপ বলার কোনো সুযোগ নেই।
বিজ্ঞাপনদাতাদের কথা বিবেচনায় রেখেও কিছু প্রতিষ্ঠান মতামত জরিপ পরিচালনা করে। এসব জরিপ নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু এই বিতর্ক অবসানের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। টিভি চ্যানেল, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, বিজ্ঞাপনদাতা, গবেষণা বিশেষজ্ঞ ও মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা আলোচনার আয়োজন করে এই বিতর্ক অবসানের উদ্যোগ নেওয়া যায়।
সরকারি জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট (নিমকো) ও বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) দর্শক, পাঠক, শ্রোতা মতামত জরিপ নিয়ে নানা কাজ করতে পারত। দুঃখের বিষয়, এই দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘মতামত জরিপে’ কখনো উৎসাহ দেখায়নি। কোনো সরকারের তথ্যমন্ত্রী বা তথ্যসচিব প্রতিষ্ঠান দুটিকে এ ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনাও দেননি। সরকারি প্রতিষ্ঠান তো আদিষ্ট না হলে কোনো কাজ করতে চায় না। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।
নিমকো, পিআইবি, ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্ট বা এ ধরনের আরও যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, তারা প্রতিবছর মিডিয়ার পাঠক, দর্শক, শ্রোতাদের নিয়ে নানা মতামত জরিপ পরিচালনা করতে পারে। তবে তা অবশ্যই পেশাদারি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হতে হবে; কাউকে খুশি করার জন্য নয়। এ ধরনের জরিপ বিভিন্ন টিভি, রেডিও চ্যানেল ও সংবাদপত্রকে একটা ভালো ফিডব্যাক দিতে পারে।
খামকাহিনি
আমার চেনা এক মেয়ে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দিয়েছে। ‘ছাত্র’ গন্ধটি এখনো তার চরিত্র থেকে মুছে যায়নি। ছাত্রজীবনে সাংবাদিকতা পেশার মহত্ত্ব, নৈতিকতা, সাহস, সততা ইত্যাদি সম্পর্কে নানা বক্তৃতা শুনে সে অনুপ্রাণিত। সে রকম অনুপ্রেরণা নিয়েই সে যোগ দিয়েছে একটি দৈনিক পত্রিকায়। তার বিট: মিডিয়া ও সংস্কৃতি জগৎ। প্রথম সপ্তাহেই তার দায়িত্ব পড়েছে একটি টিভি সিরিয়ালের শুটিং কভার করা ও তারকাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার। দায়িত্ব পালন শেষে সে যখন অফিসে ফেরার উদ্যোগ নেয়, তখন তার হাতে গুঁজে দেওয়া হয় একটি খাম। নবীন সাংবাদিক ভেবেছিল, হয়তো খামে ভরে প্রেস রিলিজ দিয়েছে। সে খুশি হয়। আটোরিকশায় ওঠার পর কৌতূহলবশত খাম খুলে তার চক্ষু চড়কগাছ। খামের ভেতরে দুই হাজার টাকা! সে স্তম্ভিত! তার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের ক্লাস লেকচারগুলো একে একে মনে পড়তে থাকে। সে তার বসকে ফোনে বিষয়টি জানায়। তার বস নাকি মৃদু হেসে বলেছে, ‘এটা আজকালকার নিয়ম। রেখে দাও।’ নবীন সাংবাদিক অবশ্য টাকাসহ খামটি পত্রিকার অ্যাকাউন্টস বিভাগে জমা দিয়ে মুক্তি পেয়েছে।
সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশের এক সপ্তাহের মধ্যে মেয়েটি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা নিয়ে আলোচনার দাবি রাখে। অনেকেই হয়তো বলবেন, ‘এটা পুরোনো কথা। এ নিয়ে কথা বলার কোনো মানে হয় না। এটাই এখনকার মিডিয়ার নিয়ম।’ তাই কি?

নানা পুরস্কার
আজকাল মিডিয়ার নানা অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র নিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকা বার্ষিক পুরস্কার দিয়ে থাকে। এটা খুবই প্রশংসনীয়। বলা বাহুল্য, সব পুরস্কার একই মানদণ্ডের হয় না। পাঠক, দর্শকই বিচার করেন কোন প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার গুরুত্বপূর্ণ। আমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারগুলো সম্পর্কেই লিখছি।
আমার মনে হয় টিভিবিষয়ক পুরস্কারগুলো সুপরিকল্পিত নয়। কারণ কয়েকটি নাটক বা ধারাবাহিকই একমাত্র টিভি অনুষ্ঠান নয়। টিভিতে নানা ধরনের অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। প্রতিটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার থাকা উচিত। এমনকি টিভি রিপোর্টারদের জন্যও। প্রতিটি দিনের অনুষ্ঠান বিচার করে পুরস্কার দেওয়া সম্ভব না হলেও একটা সামগ্রিক বিচার থেকেও জুরি বোর্ড সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটা করা সম্ভব না হলে বলতে হবে, উদ্যোক্তারা টিভি মিডিয়ার প্রতি সুবিচার করছে না এবং নাটকের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে। মডেলের জন্য পুরস্কার রাখার চেয়ে তার বদলে ‘টিভি বিজ্ঞাপনের’ জন্য পুরস্কার দেওয়া যায়।
বাংলাদেশে টিভি মিডিয়া এখন একটি শক্তিশালী, জনপ্রিয় ও সৃজনশীল সেক্টর। আমার ধারণা, আগামী পাঁচ বছরে টিভি মিডিয়া আরও শক্তিশালী ও জনপ্রিয় হবে। কাজেই টিভি মিডিয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়া সমাজের কর্তব্য। নোবেল পুরস্কার থেকে শুরু করে যেকোনো নগণ্য পুরস্কারই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। কাজেই পুরস্কার সঠিক হলো বা বেঠিক হলো, সেই আলোচনায় আমি যাব না। পুরস্কার দিয়ে সব লোককে সন্তুষ্ট করা কোনো দিন সম্ভব হবে না। কাজেই বিতর্কের দিকে না তাকিয়ে যোগ্য জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপরই পুরস্কারের ভার ছেড়ে দিতে হবে। তবে টিভি মিডিয়ার জন্য পুরস্কার বললে টিভির প্রধান সব ক্যাটাগরির জন্য পুরস্কার দেওয়া উচিত। আশা করি, উদ্যোক্তারা এই দিকটি বিবেচনা করবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

No comments

Powered by Blogger.