বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৩৪৫ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। কাজী আকমল আলী, বীর প্রতীক কৌশলী এক মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধারা অতর্কিতে আক্রমণ চালালেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে। তাঁদের নেতৃত্বে কাজী আকমল আলী।

এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সহযোগী কয়েকজন। প্রচণ্ড আক্রমণে দিশাহারা পাকিস্তানি সেনারা। কয়েক ঘণ্টার তুমুল যুদ্ধে নিহত হলো বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা। এরপর তারা পালাবার পথ খুঁজতে থাকল। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আত্মসমর্পণ করল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। এ ঘটনা মনোহরদীতে। ১৯৭১ সালের ২০ বা ২১ অক্টোবর।
নরসিংদী জেলার অন্তর্গত মনোহরদী। জেলা সদর থেকে উত্তরে। কিশোরগঞ্জ জেলার সীমান্তে। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় থেকে মনোহরদী থানা সদরে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প। তাদের সঙ্গে ছিলেন একদল বাঙালি ইপিআর সেনা। এই ইপিআর সেনাদের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সেনারা বন্দী করেছিল। পরে তাঁদের কিছু অংশকে নিয়োগ করা হয় ঢাকা ও নরসিংদী জেলার বিভিন্ন থানায়। মনোহরদী থানায়ও ছিলেন এমন কিছু বাঙালি ইপিআর সদস্য।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণের আগে মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে হাত করেন ওই ইপিআর সদস্যদের। বাঙালি ইপিআররা প্রতিশ্রুতি দেন মুক্তিযোদ্ধারা যখন আক্রমণ চালাবেন, তখন তাঁদের পক্ষে থাকার। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা কাজী আকমল আলীর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্প অবরোধ করেন। যুদ্ধ শুরু হলে বাঙালি ইপিআর সদস্যরা পক্ষত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। বাঙালি ইপিআররা পক্ষত্যাগ করায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধা ও পক্ষত্যাগী ইপিআর সদস্যদের সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা দিশাহারা হয়ে পড়ে।
কয়েক ঘণ্টা ধরে সেখানে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৫ জন সেনা নিহত হয়। ১১ জন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। জীবিত পাকিস্তানি সেনাদের মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে পাঠানোর সময় পথিমধ্যে ক্রুদ্ধ জনতা কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যা করে। চারজনকে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে সেক্টর হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। মনোহরদীর যুদ্ধে কাজী আকমল আলী যথেষ্ট কৌশলী ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন।
কাজী আকমল আলী চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে কিছুদিনের জন্য ভারতে আশ্রয় নেন। পরে মুক্তিবাহিনীর ৩ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাঠানো হয় দেশের অভ্যন্তরে। তিনি তাঁর দল নিয়ে নরসিংদী ও এর আশপাশের এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অবস্থানে দুঃসাহসিক কয়েকটি অপারেশন করেন। উপর্যুপরি অ্যামবুশ পরিচালনা করে পাকিস্তানি সেনাদের বিপর্যস্ত করেন। তিনি বেশির ভাগ সময় সহযোদ্ধাদের নিয়ে দেশের অভ্যন্তরেই অবস্থান করতেন। তাঁর অধীনে ছিল প্রায় একশ মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা বেশিরভাগ ছিলেন গণবাহিনীর যোদ্ধা।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য কাজী আকমল আলীকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৮১।
কাজী আকমল আলীর পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের যশাতুয়া গ্রামে। বর্তমানে রংপুর সিটি করপোরেশনের অধীন সাতগড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে বাস করেন। সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে ১৯৮৪ সালে অবসর নিয়েছেন। তখন তাঁর পদবি ছিল সুবেদার মেজর। তাঁর বাবার নাম আকামত আলী। মা মরিয়ম খাতুন। স্ত্রী খোদেজা বেগম। তাঁদের পাঁচ ছেলে।
সূত্র: কাজী আকমল আলী, বীর প্রতীক এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র, দশম খণ্ড। ছবি: মঈনুল ইসলাম।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.