নগর দর্পণ: চট্টগ্রাম-ইতিহাসের নিশানা রক্ষায় দায় কার? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

প্রবীণ বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরী তাঁর বাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছেন—স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত এ রকম একটি সংবাদ চট্টগ্রামের সুধীসমাজে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। শতবর্ষী এই বিপ্লবী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিধন্য তাঁর বাড়িটি (বিপ্লব কুটির নামে পরিচিত) বিক্রি করে দিয়ে প্রকারান্তরে ইতিহাসের নিশানা মুছে দিয়েছেন বলে আবেগময় মন্তব্যও করেছেন অনেকে।

মূলত একটি বার্তা সংস্থা প্রথম এ সংবাদটি প্রকাশ করার পর কয়েকটি জাতীয় দৈনিক ও চট্টগ্রামের সব কটি স্থানীয় দৈনিকে এ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ১৭ বছর আগে, ১৯৯৫ সালে বাড়িটি বিক্রি করা হলেও এত দিন সেটা ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি সেখানে বহুতল ভবন তোলার কাজ শুরুর পর বিষয়টি জানাজানি হয়।
বার্তা সংস্থা ও পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনগুলো থেকে বোঝা যায়, বাড়িটি যে বিনোদবিহারীর নিজস্ব সম্পত্তি, এ নিয়ে দ্বিধা-সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। অর্থাৎ বাড়ি বিক্রির আইনি অধিকার তাঁর আছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, বাড়িটি বিক্রি করে তিনি ইতিহাসের প্রতি দায়হীন আচরণ করলেন কি না। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিনোদবিহারীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘আমাদের ইচ্ছা ছিল বিপ্লব কুটিরকে জাদুঘর বানানোর। সেখানে বিপ্লবীদের কথা থাকবে, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস লেখা থাকবে। কিন্তু বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়ার কথা শুনে আমি মর্মাহত হয়েছি।’
এ কথা তো সত্যি, এ রকম ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত একটি বাড়িকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা গেলে তা তার মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো এবং এটি বিক্রি হওয়ার ঘটনা সচেতন মানুষকে ‘মর্মাহত’ করতেও পারে। কিন্তু এ আবেগতাড়িত বক্তব্যের উল্টো পিঠে যে প্রশ্নটি উঠে আসবে, তা হচ্ছে—এ ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায় কার? যিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, যিনি ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয়টি আমলে না এনে চিরকাল এ দেশের প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম ছিলেন, ছাত্র পড়ানোর সামান্য কটি টাকা দিয়ে যিনি জীবিকা নির্বাহ করেছেন—ঋণগ্রস্ত অবস্থায় চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও নিজের সম্পত্তি বিক্রি না করে ঐতিহ্য রক্ষার দায়টিও তাঁর কাঁধেই তুলে দিতে হবে? সরকার, সিটি করপোরেশন বা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—কেউ কি এ রকম একটি ঐতিহ্য সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নিয়েছিল? নানা রকম সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আইনজীবী রানা দাশগুপ্তও কি তাঁর মনে সুপ্ত ‘জাদুঘর’ তৈরির বাসনাটি কখনো প্রকাশ করেছিলেন জনসমক্ষে, কোনো উদ্যোগ নিয়েছিলেন তা বাস্তবায়নের?
যাঁরা ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্য এখন উচ্চকণ্ঠ, ‘বিপ্লব কুটির’ বিক্রির ঘটনায় মুষড়ে পড়েছেন যাঁরা, বক্তৃতা-বিবৃতির ফুলকি ছড়াচ্ছেন; তাঁরা কি কেউ বলবেন, এ চট্টগ্রামেই মাস্টারদা সূর্য সেন, বীরকন্যা প্রীতিলতা, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, কাজেম আলী মাস্টার, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের মতো প্রবাদপ্রতিম মানুষদের স্মৃতি ও কর্মকৃতির ইতিহাস কীভাবে ও কতটা সংরক্ষিত হচ্ছে? অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সেই ঐতিহাসিক স্থান চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইন, জালালাবাদ যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত জালালাবাদ পাহাড় বা বর্তমান রেলওয়ে মিউজিয়ামের পাশে অবস্থিত ব্রিটিশ আমলের সেই প্রসিদ্ধ ইউরোপিয়ান ক্লাব, যেখানে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন প্রীতিলতা, সেই ইতিহাসখ্যাত স্থানগুলোই বা সংরক্ষণের কি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে গিয়ে আমরা দেখতে পেয়েছি, সূর্য সেনের বসতভিটায় একটি সরকারি শিশু ও পরিবারকল্যাণকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। একটি ভবনে চিকিৎসাকেন্দ্রটি পরিচালিত হলেও বাকি দুটি ভবন আছে তালাবদ্ধ পরিত্যক্ত অবস্থায়। একটি ছবি ও একটি সমাধিফলক ছাড়া সূর্য সেনের আর কোনো স্মৃতিচিহ্ন সেখানে নেই। তাও মন্দের ভালো বসতভিটাটি অন্তত দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ আবদুল্লাহ আল হারুনের অক্লান্ত পরিশ্রমে সূর্য সেনের বসতভিটা উদ্ধার ও সীমানা চিহ্নিত করে ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। কত সরকারি আমলার নামে, কত অখ্যাত ব্যক্তির নামে চট্টগ্রামে সড়কের নামকরণ হয়েছে, কিন্তু যে সূর্য সেনের নামে ব্রিটিশ-ভারতে চট্টগ্রামের গৌরব ছড়িয়ে পড়েছিল, সারা বিশ্বে তাঁর নামে একটি সড়কের নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কখনো।
বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরীর বাড়িটি বিক্রি হয়ে গেল বলে যাঁদের আফসোসের সীমা নেই, তাঁরা কেউ কি খোঁজ নিয়েছেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর চেয়ে অনেক বেশি অবদান যাঁদের, চট্টগ্রামের সন্তান সেই লোকনাথ বল বা অনন্ত সিংয়ের বাড়ির হালহকিকত কী? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথাই যদি বলা হয়, তাহলে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, কাজেম আলী মাস্টার বা কবি নবীন সেনের স্মৃতি রক্ষার্থে কী করা হয়েছে এ শহরে? সর্বভারতীয় কংগ্রেসের এককালের সভাপতি যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের বাড়িটি ছিল (জে এম সেন) চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ এলাকায়। ছয় মেয়াদে কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড করেছিলেন এই জে এম সেন। চট্টগ্রামে তাঁর বাড়িটিতে এসে থেকেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। সেই বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ কি নেওয়া হয়েছে কোনো দিন?
মাহবুব উল আলম, আবুল ফজল, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, বুলবুল চৌধুরী, রমেশ শীল, ড. এনামুল হক, আবদুল হক চৌধুরী বা আহমদ ছফার মতো যুগোত্তীর্ণ ব্যক্তিদের স্মৃতিকে যোগ্য শ্রদ্ধা ও মর্যাদায় স্মরণীয় করে রাখার কাজটি করতে পারেনি চট্টগ্রামবাসী। এ লজ্জা আমাদের সবার। বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী—কেউই এড়াতে পারবেন না এর দায়। তাই একটি বাড়ি বিক্রি করলেন বলে একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে অসম্মান করার পরিবর্তে প্রকৃত বাস্তবতা অনুধাবন করা দরকার। যে আত্মীয়দের বাড়িতে থেকে তিনি লেখাপড়া করেছেন এককালে, যাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় অর্থ-সাহায্য নিতে হয়েছে তাঁকে, তাঁদের কাছে নামমাত্র মূল্যে বাড়িটি বিক্রি করে তিনি ঋণমুক্ত হতে চেয়েছেন। বাড়ি বিক্রির টাকা এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁকে দেওয়া সম্মাননার টাকা তিনি দান করেছেন বিভিন্ন গঠনমূলক প্রকল্পে। যেমন, মাস্টারদা সূর্য সেন স্মারক বক্তৃতা প্রবর্তনের জন্য এশিয়াটিক সোসাইটি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছেন যথাক্রমে তিন লাখ ও দুই লাখ টাকা, ছাত্রবৃত্তি বাবদ হিন্দু ফাউন্ডেশন ও রামকৃষ্ণ মিশনকে দিয়েছেন দেড় লাখ ও এক লাখ টাকা। যে ব্যক্তির ভরণপোষণ চলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের অর্থ-সাহায্য দিয়ে, তিনিই যখন নিজের যাবতীয় সঞ্চিত অর্থ সমাজসেবার কাজে দান করে যান, তখন তাঁকে লোভী হিসেবে চিহ্নিত করার যাবতীয় প্রয়াসকেই অসৎ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হতে বাধ্য।
বিনোদবিহারী চৌধুরী চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন কিছুদিন আগে। অনুপস্থিতির সুযোগে তাঁর কোনো বক্তব্য না নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এমনকি বাড়ি বিক্রি করে তিনি চিরতরে ভারতে চলে গেছেন বলে প্রচার করতেও দ্বিধা করেনি কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম। কিন্তু চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে এসেছেন তিনি। কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই।
গত বছর শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে চট্টগ্রামবাসী বিপুল সংবর্ধনা দিয়েছিল এ প্রবীণ বিপ্লবীকে। রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও এ রকম সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল তখন। পরশ্রীকাতরতার এই দেশ! শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর সেই আয়োজনই হয়তো অসহ্য হয়ে উঠেছিল কারও কারও কাছে। বাড়ি বিক্রি নিয়ে প্রতিবেদনের পেছনে সেই হীনম্মন্যতারই প্রকাশ ঘটল বলে আমাদের ধারণা।
যা-ই হোক, ‘বিপ্লব কুটির’ বিক্রি নিয়ে চট্টগ্রামের সুধীসমাজের মধ্যে যে হঠাৎ ওঠা আলোড়ন, আলোচনা-সমালোচনার ঢেউ, তার সূত্রে যদি এ অঞ্চলের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জনমত গড়ে ওঠে, সেটাই হবে বড় প্রাপ্তি।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwa_chy@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.