জন্মদিন-নাটকে ভিন্নধারার স্রষ্টা by বোরহান উদ্দিন আহমেদ

সেলিম আল দীন বলেছিলেন, বাংলাদেশের সাহিত্য ও নাটকের ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরনো। পরিবর্তনের ধারায় বাংলা নাটকের বৈশিষ্ট্য হাজার বছর ধরে বিবর্তিত হয়ে আজকের বিংশ শতাব্দীতে এসে যে জায়গায় পেঁৗছানোর কথা ছিল সেখানে পেঁৗছায়নি। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এবং বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত নাট্যচর্চা চলছিল ইউরোপীয় ধাঁচের।

রবীন্দ্রনাথ এসে প্রথম প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্মিলন ঘটালেন। তার কবিতার মতো, তার শিল্প-চেতনায় যে রকম নাটকেও তেমন ঘটালেন। তার নাটক শেক্সপিয়ার বা মলিয়রের নাটক নয়। রবীন্দ্রনাথের নাটক রবীন্দ্রনাথেরই নাটক। সেলিম আল দীনও বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে নিজস্ব ধারা তৈরি করতে সচেষ্ট ছিলেন। গ্রাম থিয়েটার নামে প্রচলিত নাট্যচর্চা রীতির বাইরে গিয়ে একটি ভিন্নমাত্রার নাট্য আন্দোলন তৈরি করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
সেলিম আল দীন প্রতিষ্ঠিত সবকিছুকে অস্বীকার করে চলছিলেন সন্ন্যাসীর মতো। তাই তিনি প্রতিটি নাটককে আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে তুলে ধরেছেন দেশের মানুষের কাছে। সেলিম আল দীন একদিন বলেছিলেন_ মুনীর চৌধুরীর পরামর্শে নাটক লেখা শুরু করেন। সে অনেক কথা, যা লিখে শেষ করতে পারব না। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন_ সে প্রাণপুরুষটি জীবিত থাকলে আজ আমাকে আরও উৎসাহিত করতেন। ১৯৬৮ সালে তার বেতার নাটক \'বিপরীত তমসায়\' দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ঢাকা থিয়েটারের মাধ্যমে সংবাদ কার্টুন থেকে বনপাংশুল, অতঃপর শেষে জীবনাবসানের পূর্বাহ্নে নিমজ্জন মঞ্চস্থ হয়েছে, প্রতিটি নাটকই ভিন্নরূপে, ভিন্ন আঙ্গিকে। সেলিম আল দীন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনীতিবিদের মতো দেশের রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতির অচলয়াতন ভেঙে দিতে চাইতেন। যেমন মুনতাসীর ফ্যান্টাসি বা সংবাদ কার্টুন। তখন সত্তরের দশক। আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, অন্যদিকে ভিয়েতনামে নির্বিচার গণহত্যার প্রতিবাদে লিখেছিলেন জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন। মুনতাসীর ফ্যান্টাসি নাটকে নৈতিকতা বিবর্জিত রাজনীতির ও সামাজিক অবস্থার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন। অনৈতিকতায় বিপর্যস্ত দেশে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা যে অনেক কষ্টকর মুনতাসীর ফ্যান্টাসি তারই দৃষ্টান্ত। তাই অপারেশন টেবিলে মুনতাসীর মারা গেলে তার ম্যানেজার জানায়, মুনতাসীরের অর্জন সরকারি খরচায় জাতীয় জাদুঘরে পাঠানো হবে। কারণ সে দড়ি, বেলুন, ব্রেসিয়ার, কাগজ, শাড়ি, ওয়াল পেইন্ট, ক্লিপ সবই খেয়ে ফেলত। বাংলাদেশে তখন এ ধরনের খাদক, বঙ্গবন্ধুর ভাষায় চাটার দলের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। যাদের অনন্ত ক্ষুধায় রাষ্ট্রযন্ত্র বিকল হতে থাকে। তারই প্রতিচ্ছবি অভিনয়ের মাধ্যমে মুনতাসীর নাটকে দেখিয়েছিলেন সেলিম আল দীন। বাঙালির সংস্কৃতিতে তার মধ্য থেকে খুঁজেছিলেন বাঙালির নিজস্ব নাটকের সম্ভাব্য রূপ। যার নাম দিলেন দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব। এটি এমন একটি শিল্প মাধ্যম যেখানে ঘটনার সমাবেশ ও সমারোহ এবং তার দুর্বার গতিটা প্রধান নয়। সেখানে নৃত্য-সঙ্গীতের সহযোগ বর্ণনা ও সংলাপের মেলামেশায় এক অখণ্ড রূপ গড়ে ওঠে। সেখানে বাঙালির কাব্য, কাহিনী, উপন্যাস ও নাটকের পিপাসা এক সুতায় বাঁধা থাকে। তিনি এরই মধ্যে চেয়েছিলেন তার নাটকগুলো নাটকের বন্ধন ভেঙে অন্য সব শিল্প তীর্থগামী হোক।
সেলিম আল দীন তার পিএইচডি অর্জনের পর ১.১২.১৯৪৯ সালে আমাকে লেখা পত্রে লিখেছিলেন_
\'স্নেহের বোরহান, আমি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছি। আমার পিএইচডি অভিসন্দর্ভটি দুর্লভ প্রশংসা পেয়েছে। মৌখিক পরীক্ষায় ড. আহমদ শরীফ বলেছেন ভবিষ্যতে কাউকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করতে হলে আমার গবেষণার সাহায্য নিতে হবে। আমার অন্য কাজের তুলনায় এ ডিগ্রিটা তেমন কিছুই নয়। তবুও এর একটি বিশেষ মূল্য এ যে দুই বাংলায় প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা নাটকের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আমিই রচনা করলাম।\'
এ মহান ব্যক্তিটি ১৪ জানুয়ারি ২০০৮ সালে এ জগৎ ছেড়ে চলে গেছেন অনাদিকালের জন্য। শুয়ে আছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পেছনে। প্রথমে কর্তৃপক্ষ সমাধি করতে চেয়েছিল এমন এক স্থানে, যে জায়গায় তার হিতার্থী ও গুণগ্রাহীরা কোনো দিন দাঁড়িয়ে তার কবরটি দেখতে পারতেন না। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে আমাদের অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন; প্রশস্ত ও খোলামেলা জায়গায় নিমগাছের (সেলিম আল দীনের অত্যন্ত পছন্দনীয় গাছ) নিচে সমাধিটি করা হয়।
তবু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপকের সমাধিস্থল পড়ে আছে গহিন জঙ্গলে। সামান্য ৪টি বাঁশের খুঁটি দিয়ে শুধু চিহ্নটি রাখা হয়েছে। মসজিদের পেছনের বাগানটিতে এ মুহূর্তে গেলে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী আঁতকে উঠবেন_ এই বুঝি সাপে কামড়াল এবং দুই বাংলার এত বড়মাপের একজন সাহিত্যিক, নাট্যকার, আচার্য সেলিম আল দীন গহিন খড়কুটোর মধ্যে অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছেন। তার স্মৃতি রক্ষার জন্য আদৌ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তেমন উদ্যোগ নেওয়া হোক এটাই আমাদের চাওয়া। আজ ১৮ আগস্ট জন্মদিনে তার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

বোরহান উদ্দিন আহমেদ : সেলিম আল দীনের ছোট ভাই
mallik.babu6@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.