স্মৃতিচারণা-এখনো অন্ধকারে ডুবে যাইনি’ by জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

খন ছাত্র ছিলাম আমি যখন স্কুল-কলেজের ছাত্র, সময়টা তখন ব্রিটিশ শাসনামল। তখন আমরা ছাত্র হিসেবে দেশের কথা ভাবতাম এবং একটা ধারণা জন্মেছিল যে স্বাধিকার বা স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য আমাদের যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, তার একটা সুরাহা ঘটবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলো ১৯৩৯ সালে। যুদ্ধ চলার সময়েই আমাদের ধারণা হয়েছিল, যুদ্ধের পরপরই একটা রাজনৈতিক সমাধান হবে। অবশ্য পরিবর্তনটা ঠিক কী হবে, তা নিয়ে নানা ধরনের ভাবনা ছিল।


একটা ছিল ভারতবর্ষ স্বাধীন হবে, ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হবে। কিছুদিনের মধ্যে আরও একটা দাবি এসে গেল—মুসলমানদের জন্য একটা আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি। ছাত্রজীবনে আমরা বলতে গেলে কিছুই না বুঝে মনে করলাম, মুসলমানপ্রধান রাষ্ট্র পাকিস্তান হলে আমাদের জন্য ভালো হবে। তখন দুটি আকাঙ্ক্ষা আমাদের মধ্যে খুব ব্যাপকভাবে দেখা দেয়—এক. স্বাধীনতা, দুই. মুসলমানপ্রধান একটি রাষ্ট্র। যখন দেশ স্বাধীন হলো, পাকিস্তান হলো তখন আমরা দেখলাম, মুসলমানদের চাওয়া পাকিস্তান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, সেটা পূরণ হয়নি। এই বোধটা শুরু থেকেই আমাদের ভেতর দেখা দিল। যার সূত্রপাত হলো ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এখানে ছাত্রদের বড় রকমের ভূমিকা ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসের এ ঘটনার সময় আমার ছাত্রজীবন শেষ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারেকাছেই থাকতাম। পুরো ঘটনাটা খুব কাছ থেকেই প্রত্যক্ষ করেছি। কিছুদিনের মধ্যে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতিও মিলল। চুয়ান্নর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে শোচনীয় পরাজয় ঘটল মুসলিম লীগের। তাদের ঘোষিত ২১ দফায় বাঙালির রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার অনেক কিছুই ছিল। যেটি লিখেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। একাত্তর পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসনামলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার স্বপ্নটা তৈরি হয়েছিল ষাটের দশকজুড়ে। রাজনৈতিক নেতারা রাজনীতির আকাঙ্ক্ষাটা তৈরি করেন। অন্যদিকে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীরা প্রভূত ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি দুটো কাজই একসঙ্গে হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়লাভ করেছি।

এ সময়ের অন্ধকার
স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছি। এরপর ৪০ বছর পেরিয়ে গেল। স্বভাবতই এই ৪০ বছরে আমরা কী পেয়েছি, কী চেয়েছি, এর হিসাব-নিকাশ চলছে। প্রথমেই বলতে হয়, আমরা স্বাধীন রাষ্ট্রের উপযোগী একটা সংবিধান পেয়েছি। এই সংবিধান যে দেশের স্বপ্নটা তুলে ধরে, সেই স্বপ্ন পুরোপুরি সার্থক হয়নি।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা দেশ শাসিত হওয়ার কথা থাকলেও এই ৪০ বছরে সেটা হয়নি। একটা বড় অংশজুড়ে আমরা সেনাশাসন পেয়েছি। কখনো সরাসরি সেনাশাসন, কখনো বা অপ্রত্যক্ষ সেনাশাসন। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সেনাশাসন অপসারিত হয়। ওই সময় প্রথম যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, সেখানে আমিও ছিলাম। ত্রিদলীয় জোটের সমবেত ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। সেই সমবেত ঘোষণাটাকে আমাদের একজন বিচক্ষণ আইনজীবী বলেছিলেন, এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের ম্যাগনা কার্টা। তার পর থেকে এ পর্যন্ত যে কটা নির্বাচিত সরকার পেলাম, তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি সরকার অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যান। বর্তমানে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিয়ে কথা উঠছে, অথচ এটা আমাদের বাহাত্তর সালের সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে আসল কথাটাই চাপা পড়ে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন নিয়ে যে আইনটি বাস্তবায়ন করার কথা ছিল, কোনো নির্বাচিত সরকারই সেই আইন আজ অবধি বাস্তবায়ন করছে না।

এবং কিছু আলো
বাস্তবতার চিত্র একদিক থেকে অত্যন্ত হতাশাজনক। কেননা, অনেক কিছুর মধ্যে ফাঁকা প্রতিশ্রুতিই থেকে যাচ্ছে। কিছু কিছু আশার দিকও আছে। আমরা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কয়েকটি নির্বাচনও পেয়েছি। আমরা আশা করছি, নতুন নির্বাচন কমিশন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এটা আমাদের কাছে নৈরাশ্যের মধ্যেও আশার কথা যে আমরা একেবারে অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যাইনি। আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি, দিশা হারিয়ে ফেলেছি, ঠিক তা-ও নয়। এর মধ্য দিয়েই আমরা এগিয়ে চলেছি।
আমরা প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের ব্যাপারটা বুঝি না। আমরা পালনও করি না। অথচ মুখে বলি। আমরা ক্ষমতা ব্যাপারটা বুঝি। নিজেদের সুবিধা বুঝি। কিন্তু দেশের জন্য কিছু করা, গণতন্ত্রের জন্য ছাড় দেওয়া, সেটা বুঝি না।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং অ-রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে একটা বোঝাপড়া থাকা উচিত ছিল, যা আমাদের এখানে হয়ে ওঠেনি। যেমন, ২০১১ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী। সেটা সবাই যে যার মতো পালন করছে। রবীন্দ্রনাথ যে আমাদেরকে অনেক কিছু দিয়েছেন, তার স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্ক ছিল। কিন্তু আজকের পরিবেশে কেউ আর মনে করছে না যে, এটা একটা বিতর্কিত বিষয়। বাংলাদেশ তাঁকে গ্রহণ করেছে এবং শিক্ষাও নিতে চায়। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা নিতে চাওয়া এক কথা আর রবীন্দ্রনাথকে সত্যিকারভাবে গ্রহণ করা আরেক কথা। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাটা হচ্ছে কেউ তোমাকে হাতে তুলে কিছু দেবে না। তোমাকে সবকিছু অর্জন করতে হবে। তোমাকে তোমার পায়ে দাঁড়াতে হবে। নিজের সমস্যার সমাধান নিজেকেই বের করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ সর্বদা নিজের আত্মশক্তির ওপর বলীয়ান হওয়ার কথা বলেছেন। সেটা কি আমরা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পেরেছি? বোধ হয় না। পারলে তো আমাদের অবস্থা আজ একেবারে অন্য রকম হয়ে যেত।
দুঃখজনক হলো, শিক্ষাটা এখন সনদনির্ভর হয়ে গেছে। শিক্ষিতের হার বেড়েছে, শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রেও তারা অনেক বেশি ভালো করছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়ও বেড়েছে। কিন্তু কেন বেড়েছে, এর পেছনে কারা দায়ী, আমরা তা জানি না। কিংবা জানলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছি না। পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শিক্ষার সুফল গ্রহণ করার সুযোগ দিচ্ছে না।

যা দেখতে চাই
নতুন বছরের স্বপ্ন হলো, আমরা যতটুকু অর্জন করেছি, সেটাকে যেন যথেষ্ট মনে না করি। আমাদের আরও অনেক কিছু অর্জন করার আছে। আমাদের নির্বাচনগুলো যেন সুষ্ঠু হয়, সেটা আমাদেরকে দেখতে হবে। ক্ষমতার হাতবদলটা যেন নির্বাচনের পথেই হয়, অন্য কোনো পথে যেন কোনো অবস্থাতেই না হয়। কখনোই যেন সেনাশাসন আমাদের দেশে ফিরে না আসে। সবাই যেন দেশটাকে বেশি বেশি ভালোবাসে। এটাই স্বপ্ন, এটাই প্রত্যাশা।
অনুলিখন: কাজল রশিদ।

No comments

Powered by Blogger.