সমসময়-দুর্ভোগ শেষ হবার লক্ষণ নেই by আতাউস সামাদ

বাংলাদেশের ললাট থেকে দুর্নীতির কলঙ্কতিলক না মোছা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনে বিশ্বব্যাংক যে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন স্থগিত করেছে সেটা এখন আর কোনো হালকা বিষয় বা ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপার বলে মনে হয় না। কানাডার কোন কোম্পানি কাজ পাওয়ার জন্য কোথায় কোন দুর্নীতি করেছে আর বাংলাদেশ সে জন্য অহেতুক দুর্ভোগ পোহাবে, এ রকম অনুযোগ করার বা এভাবে প্রবোধ দেওয়ার পর্যায়েও নেই বিষয়টি। ঘটনাটি এখন


বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর এলেন গোল্ড স্টেইন এ বিষয়ে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'দোয়েল' নামে বাংলাদেশে তৈরি ল্যাপটপ বিক্রি উদ্বোধন করেছেন। এই ল্যাপটপের চারটি মডেল ১০ হাজার টাকা থেকে ২৪ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে। ওজনে হালকা হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রশংসা করে বলেছেন, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ভারী বইয়ের বোঝা পিঠে করে বয়ে নেওয়ার বদলে এই যন্ত্রটি সহজেই তাদের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। এতে স্কুলে যাওয়া তাদের জন্য আনন্দের বিষয় হবে। তিনি বলেছেন, সমস্ত স্কুলপাঠ্য বই দোয়েল ল্যাপটপে তোলার ব্যবস্থা যেন করা হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সজ্জিত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেই লক্ষ্যে পেঁৗছার পথে 'দোয়েল' ল্যাপটপ বাজারে আসা একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ল্যাপটপটি তৈরি করেছে সরকারি টেলিফোন শিল্প সংস্থা এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ২এম করপোরেশনের সহযোগিতায়। ল্যাপটপ তৈরি করার কাজে টেলিফোন শিল্প সংস্থার প্রবেশ আশা করি প্রতিষ্ঠানটি টিকে যাওয়ার জন্য সহায়ক হবে। শুনেছি, এর আগে ভূমিভিত্তিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় চলে আসা, বিদেশ থেকে আকর্ষণীয় টেলিফোন সেট আমদানি, টেলিফোন বিভাগের অদক্ষতা ও দুর্নীতি এবং সবশেষে মোবাইল ফোনের দেশব্যাপী ব্যবহার শুরু হয়ে যাওয়ায় টেলিফোন শিল্প সংস্থা গভীর সংকটে পড়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি নতুন পণ্যের ব্যবসায় এসে নতুন সাফল্য অর্জনের সুযোগ পেল। তবে আমাদের টেলিফোন বিভাগ যেভাবে হেলাফেলা করে স্থির টেলিফোনের দায়িত্ব পালন করছে এবং টেলিটক মোবাইল ফোন প্রতিযোগীদের যত পেছনে পড়ে রয়েছে তা দেখে দোয়েল ল্যাপটপ শেষ পর্যন্ত বাজারের কতটুকু দখল করতে পারবে এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তদুপরি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কামেল ব্যক্তিরা ও সুযোগসন্ধানী আমলারা গৃহসজ্জার জন্য অথবা নিজ সন্তানের ব্যবহারের জন্য সাশ্রয়ী দামে পাওয়া দোয়েল ল্যাপটপগুলোকে দখল করে ফেলতে পারেন এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। খুব দুঃখের সঙ্গেই বলতে হচ্ছে, যেই কামেল ও আমলাদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলাম তাদের কাছে দেশ ও সমাজের কল্যাণ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় নয়। দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি। সেই নামে নাম রাখা মূল্য-সাশ্রয়ী ল্যাপটপ কম্পিউটার কারও লোভের খাঁচায় আবদ্ধ হোক সেটা জনগণের কাম্য হতে পারে না। তাছাড়া লেখাপড়া করার জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করতে হলে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। ঘরে ঘরে কম্পিউটার বসে যাওয়ার মতো বা কাঁধে কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ দেখতে অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের দেশে নেই। এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি স্কুলে কয়েকটি করে দোয়েল ল্যাপটপ পেঁৗছে দিয়ে বিদ্যালয়েই কম্পিউটার ব্যবহার শেখানোর কথা মনে আসে। তবে এখানেও সম্ভাবনা থেকে যায় যে, স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির বলদর্পী কোনো না কোনো নেতা নিজের পারিবারিক মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্য এগুলো কোনো ছুতায় হাতিয়ে নিয়ে বিদ্যালয়ের দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবেন। তবু এভাবে সাধারণ্যে কম্পিউটার ব্যবহার শুরু করার চেষ্টা হলে ভালোই হয়।
আপাতত আমাদের দেশে ভালো কিছু হোক তার অপেক্ষায় ধৈর্যে বুক বাঁধতে হবে। এ ছাড়া উপায় নেই। কারণ, বাংলাদেশের তিন প্রধান আতঙ্ক, যথা_ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি ও খারাপ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তথা ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতা দেশটির পিছু ছাড়েনি। বিরোধী নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে নির্দর্লীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমন সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আগামী সংসদ নির্বাচন দলীয়, তথা আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে 'হবে, হবে, হবেই', সেই একই রকমভাবে খালেদা জিয়া তার বিপরীত দাবিটি তুলেছেন। তিনি গত মঙ্গলবার সিলেটে এক বিশাল জনসমাবেশে সরকারকে লক্ষ্য করে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, 'শান্তি চাইলে সময় থাকতে তত্ত্বাবধায়ক অবস্থায় ফিরে আসুন।'
খালেদা জিয়ার কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, বিএনপি ও তার মিত্র দলেরা হরতাল, সমাবেশ ও রোডমার্চ করে প্রমাণ করেছে, তারা নিঃশেষিত রাজনৈতিক শক্তি নয় এবং তারা রাজপথের আন্দোলন করার জন্য তৈরি। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলে থাকার সময় রাজপথ ও জনগণের আন্দোলনের কথা বলে যা যা করেছে বিএনপি সেসব কর্মসূচিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে রেখে তালিম নিয়ে তেমনই কিছু করতে ব্রতী হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়ার নির্বাচন তথা জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হলে অর্থাৎ নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ রেখে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে হলে নির্বাচনের সময় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকার অত্যাবশ্যক প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়েছে এবং এ কথাটা জনগণকে বোঝানো সম্ভব। সোজা কথায়, ১৯৯৬ এবং ২০০৬ সালের কথা শেখ হাসিনাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন খালেদা জিয়া।
এ কথা উপলব্ধি করতেও অসুবিধা হয় না যে, মূল্যস্ফীতি আবার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া, নিত্যপণ্যের বাজারে জিনিসপত্রের দাম নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও অরাজকতা অনুভব করা যায় এমন উন্নয়নমূলক কাজের অনুপস্থিতি, দৃশ্যমান ধনবৈষম্য ও আঞ্চলিক বৈষম্যের ফলে জনমনে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে, বিএনপি ও তার সহযোগীরা সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে তা কাজে লাগাবে। আর তা যদি তারা না করে তাহলে তারা বিরোধী দল কেন? যে কোনো দেশে যে কোনো বিরোধী দল এ কাজটিই করবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশেও সাধারণ মানুষের অনেকের মধ্যে এ রকম অভিমত আছে যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন যে, বিরোধী দল সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুক। তারা মনে করেন, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ভালো কাজ করতে অথবা কমপক্ষে নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটাতে বাধ্য করার জন্য হলেও তাদের রাজনৈতিক চাপ দিতেই হবে এবং সেটা ন্যায্য।
বাংলাদেশের ললাট থেকে দুর্নীতির কলঙ্কতিলক না মোছা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনে বিশ্বব্যাংক যে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন স্থগিত করেছে সেটা এখন আর কোনো হালকা বিষয় বা ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপার বলে মনে হয় না। কানাডার কোন কোম্পানি কাজ পাওয়ার জন্য কোথায় কোন দুর্নীতি করেছে আর বাংলাদেশ সে জন্য অহেতুক দুর্ভোগ পোহাবে, এ রকম অনুযোগ করার বা এভাবে প্রবোধ দেওয়ার পর্যায়েও নেই বিষয়টি। ঘটনাটি এখন বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর এলেন গোল্ড স্টেইন এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। এ রকম ঘটনা অতীতে অন্তত বিশ্বব্যাংক নিয়ে খুব একটা হয়নি। এই বিবৃতিতে গোল্ড স্টেইন বলেছেন, বিশ্বব্যাংক সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রতারণা ও দুর্নীতির ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিষয়টির সঙ্গে বাংলাদেশের জনসাধারণের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বিবৃতির ভাষা যথেষ্ট কাঠখোট্টা তো বটেই, তদুপরি বিষয়টির সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ জড়িত রয়েছে এ কথা বলে বিশ্বব্যাংক হয়তো বোঝাতে চেয়েছে, যা হয়েছে বা হতে যাচ্ছিল তাতে বাংলাদেশেরই ক্ষতি হতো অথবা তদন্তাধীন দুর্নীতির অভিযোগটির কোনো কোনো অংশে বাংলাদেশেও কেউ জড়িত আছে। বাংলাদেশের মানুষ গত দু'বছর ধরে দেশে দুর্নীতি যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য সরকারের কাছে বহু কান্নাকাটি করেছে। তাতে কাজ হয়নি। এখন দেশে বিদ্যমান দুর্নীতির আবহের মধ্যে বিদেশিদের এতদ্সংক্রান্ত কথাবার্তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হতেই পারে।
একটা দেশে যখন দুর্নীতি বাড়ে তখন এর সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সহিংস অপরাধ বাড়ে। বাংলাদেশে মনে হয় সে রকম হচ্ছে এই মুহূর্তে।
ত্রুটি স্বীকার : সমকালের সমসময় কলামে আমার গত লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম, ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ সংরক্ষিত নারী আসনের তিনটি জামায়াতে ইসলামীকে দিয়েছিল। আমার ওই তথ্য ভুল। সংরক্ষিত নারী আসনের ২৭টি নেয় আওয়ামী লীগ ও তিনটি ছেড়ে দেয় জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টিকে। আমার ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন এক সম্মানিত পাঠক জনাব আলমাস উদ্দিন, কষ্ট করে টেলিফোন মারফত। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

আতাউস সামাদ :সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.