যুগসন্ধিক্ষণে মিয়ানমার-আন্তর্জাতিক by থান্ট মিন্ট-উ

চীন এবং পাকিস্তানের মাঝখানে অবস্থিত মিয়ানমার ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনাধীনে পরিচালিত হওয়ার পর এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। এখন যে ঐতিহাসিক সংস্কার পরিচালিত হচ্ছে সেটা এশিয়ার নবতম গণতান্ত্রিক উত্তরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে কি-না আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলিতেই তা স্পষ্ট হবে। ছয় মাস আগেও মিয়ানমারকে নিয়ে আশাবাদী হওয়া কঠিন ছিল। সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ওই নির্বাচন মোটেই


স্বচ্ছ ও অবাধ ছিল না বলে নিন্দার ঝড় উঠেছিল। মিয়ানমারের বয়োবৃদ্ধ একনায়ক জেনারেল থান সুই তার অনেক সাবেক জেনারেলসহ ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া ও নতুন সাংবিধানিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও কম সংখ্যক লোকই দেশটিতে যৎসামান্য সংস্কারের বেশি কিছু আশা করেনি।
কিন্তু নতুন প্রেসিডেন্ট উ থেইন সেইন (যিনি নিজেও একজন সাবেক জেনারেল) সবাইকে বিস্মিত করলেন। তিনি তার উদ্বোধনী ভাষণে জোরের সঙ্গেই দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানো, দেশের বহুমাত্রিক সশস্ত্র সংঘর্ষের অবসান এবং রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবেন বলে উল্লেখ করলেন। জুনের মধ্যেই প্রায় ১০ লাখ মানুষের (যাদের অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণীভুক্ত) পেনশন এক লাফে এক হাজার গুণ বেড়ে গেল, কর হ্রাস করা হলো এবং বাণিজ্যের কার্টেলগুলো ভেঙে দেওয়া হলো। সরকার তার ব্যাংকিং ও বিদেশি বিনিয়োগবিধি পুনরায় লিপিবদ্ধ করল এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নীতি সংশোধন করা শুরু করল। আর এ সবই করা হচ্ছে ব্যবসায়ী ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে। এভাবে বেসামরিক ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ বিরাট পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সামরিক শাসকরা দীর্ঘকাল ধরেই এই পথ গ্রহণ থেকে বিরত থেকেছেন।
এর পর গত নভেম্বরে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চিকে গত ১৯ জুলাইয়ের শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনা ঘটেছে। এ দিবসে তার বাবাকে ১৯৪৭ সালে হত্যা করা হয়। তার বাবা অং সানকে মিয়ানমারের স্বাধীনতার স্থপতি মনে করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রথমবার এদিন অং সান সু চির হাজার হাজার সমর্থককে শান্তিপূর্ণ মিছিল-সমাবেশ করতে দেওয়া হয় এবং অনেক স্বাধীন সংবাদপত্রও আলোর মুখ দেখে। এক বছর আগেও যেখানে অং সান সু চির নাম পর্যন্ত পত্রিকার পাতায় খুঁজে পাওয়া যেত না, সেখানে এখন নিয়মিত তার সংবাদ প্রকাশিত হয় পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায়।
আগস্টের মধ্যে সংসদে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তিসহ স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় এবং গ্রামীণ গরিবদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প ও স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার আইনসম্মতভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়। তুলে নেওয়া হয় ইন্টারনেট সুবিধার ওপর থেকে সব বিধিনিষেধ। নাগরিক অধিকার গ্রুপগুলোর সঙ্গে ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত আলোচনায় প্রেসিডেন্ট বিদেশে নির্বাসিত জীবনযাপনকারী মিয়ানমারের সব নাগরিককে দেশে ফিরে আসার জন্য এবং দেশের জাতিগত বিদ্রোহীদের শান্তি আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। পরদিন প্রেসিডেন্ট বিরোধী নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে দুই ঘণ্টার বেশি একান্ত আলোচনায় মিলিত হন।
ওই আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসার পর পর ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম আমি অং সান সু চিকে দেখি। তিনি আমাকে বলেন, প্রেসিডেন্ট প্রকৃতই দেশে পরিবর্তন চান এবং মিয়ানমারের রাজনীতিতে একটি নতুন যুগ শুরু হতে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
এই শেষ সপ্তাহে আমরা কল্পনার অতীত অগ্রগতি লক্ষ্য করি। গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট জনবিক্ষোভের পর ইরাবতী নদীর ওপর চীনা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেন। ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পার্শ্ববর্তী চীনের রাজ্যে বিদ্যুৎ নেওয়ার কথা ছিল। এটা মিয়ানমারের জায়মান পরিবেশবাদী আন্দোলন ও সংখ্যালঘু কাচিন জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের বিজয়। এত বড় একটা চীন সমর্থিত প্রকল্প প্রেসিডেন্ট বন্ধ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে মিয়ানমার যে একটি ক্রান্তিলগ্নে উপস্থিত হয়েছে তার লক্ষণ ফুটে উঠেছে। এখন দেশটির অধিকাংশ মানুষই আশা করে যে, সেখানকার সব রাজবন্দি অচিরেই মুক্তি পাবেন।
তবে এখনও দেশটির সামনে বিরাট সমস্যা চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে : জাতিগত মিলিশিয়া সমস্যা। সরকার সম্প্রতি এদের বড় গ্রুপের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর কয়েকটি গ্রুপ এখনও সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে। এসব দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ও সংঘর্ষ অব্যাহত থাকলে শান্তিপূর্ণ পথেই দেশটির গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে_ প্রত্যাশা করাটা কঠিন। এই নতুন পদ্ধতিতে সংস্কারবাদীদের কণ্ঠই কেবল যে শোনা যাচ্ছে তা নয়, কট্টরপন্থিরাও সক্রিয়। সুতরাং তিনটি বিষয় সম্পাদনের ওপর জোর দিতে হবে ।
প্রথমত, বর্তমান সংস্কারের পক্ষে যে দ্ব্যর্থহীন সমর্থন রয়েছে তাকে অব্যাহত রাখতে হবে। তবে এ সংস্কার প্রক্রিয়া দ্রুততর করার পরিবর্তে স্বাভাবিক গতিতেই তাকে চলতে দিতে হবে। এর বিকল্প হবে আবার অতীতে ফিরে যাওয়া।
দ্বিতীয়ত, সংস্কার প্রচেষ্টার জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল উপদেশ ও জ্ঞান প্রশাসনের নিশ্চিত করতে হবে। কয়েক দশক ধরে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে মিয়ানমারের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষ লোকের বড় অভাব রয়েছে। সুতরাং জাতিসংঘসহ মিয়ানমারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সব বাধানিষেধ তুলে নিতে হবে, যাতে দেশটি এ ক্ষেত্রে তাদের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারে। কেবল অর্থ দিয়ে সাহায্য করলেই হবে না, তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তাসহ সম্ভাব্য সব উপায়ে সাহায্য করতে হবে, যাতে তারা সংস্কারকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
তৃতীয়ত, মিয়ানমারের ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। দেশটি উন্মুক্ত হতে পারলেই এটিকে উন্নয়নের জন্য কেবল বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হবে না। দায়িত্বশীল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণীও বিকশিত হওয়ার পথ পাবে।
এভাবে চললে আগামী ৫০ বছরের মধ্যেই মিয়ানমারের উন্নততর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। মিয়ানমার যাতে দ্রুত তার বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে পারে তার জন্য সবার সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে হবে।

থান্ট মিন্ট-উ : সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও 'হয়্যার চায়না মিটস ইন্ডিয়া : বার্মা অ্যান্ড দ্য নিউ ক্রস রোডস অব এশিয়া' গ্রন্থের প্রণেতা
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর করেছেন সুভাষ সাহা
 

No comments

Powered by Blogger.