রেখো মা দাসেরে মনে... by ইমতিয়ার শামীম

ন্ধকার আর হিংস্রতায়, অবমাননা আর নিষ্ঠুরতায় ডুবুডুবু ভিক্টোরীয় যুগের ইংল্যান্ডকে চার্লস ডিকেন্সের চেয়ে ভালো করে আর কে চিনেছিল? অথচ এত দিন পর জানলাম, আরো এক চেহারা রয়েছে আমাদের এই প্রিয় লেখকের। কুখ্যাত জ্যামাইকান গভর্নর এডওয়ার্ড আয়ারের সাফাইকারী ছিলেন তিনি! জ্যামাইকার দ্বীপ মোরান্ট বের ক্রীতদাসরা মুক্ত হওয়ার পর নিমজ্জিত হয় প্রচণ্ড দারিদ্র্যে। ক্ষতিপূরণ দেওয়া তো দূরের কথা, ভোটার হওয়ার জন্য নতুন ফি আরোপ করা হয়


তাদের ওপর। বিভিন্ন অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে এসব মুক্ত দাস কৃষকরা বিক্ষোভ ও বিদ্রোহে ফেটে পড়ে ১৮৬৫ সালে। গভর্নর আয়ার তাদের প্রতিবাদের প্রত্যুত্তর দেন খুন ও সন্ত্রাস চালিয়ে। আয়ারের নির্বিচার খুন ও সন্ত্রাস অব্যাহত ছিল টানা এক মাস। তাঁর সেনাদল হত্যা করে কমপক্ষে ৪০০ মানুষকে। শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিল তাদের ভেতর। বেত দিয়ে একনাগাড়ে পেটানো হয় কমপক্ষে ৬০০ মানুষকে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় এক হাজার বাড়িঘর। পরে আরো অসংখ্য মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় বিচারের নামে। দাস ব্যবসার অবসানের পর ক্রোধোন্মত্ত বর্ণবাদের ক্রান্তিকাল ফুটে ওঠে এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ রাজনীতিই দুই ভাগ হয়ে যায়। জন স্টুয়ার্ট মিলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে 'জ্যামাইকান কমিটি', যেটায় ছিলেন জন ব্রাইট, চার্লস ডারউইন, হার্বার্ট স্পেন্সারের মতো মনীষীরা। এই কমিটি হত্যার অপরাধে আয়ারের শাস্তি দাবি করে।
অন্যদিকে চার্লস ডিকেন্স, ইতিহাসবিদ ও প্রাবন্ধিক থমাস কার্লাইল, কবি ও আলোচক ম্যাথু আরনল্ড এবং কালেক্টর জন রাস্কিনদের নিয়ে গড়ে ওঠে 'আয়ার ডিফেন্স কমিটি'। আয়ারকে সাহায্য করার জন্য এই কমিটি সংগ্রহ করে ১০ হাজার পাউন্ড। ১৮৫৩ সালে কার্লাইল 'অকেশনাল ডিসকোর্স অন দ্য নিগ্রো কোয়েশ্চেন' বইটি লিখে চূড়ান্ত বর্ণবাদিতার পরিচয় দিলে তাঁর বিরুদ্ধে কলম ধরেন জন স্টুয়ার্ট মিল। ফলে আগে থেকেই কার্লাইল ক্ষুব্ধ ছিলেন। জ্যামাইকান কমিটির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষায় লেখেন, "জ্যামাইকান কমিটি 'নিগার মানবপ্রেমিকদের' এমন একটি গোষ্ঠী, যারা নর্দমার মধ্যে উন্মত্ত অবস্থায় ঘেউঘেউ করছে।" আয়ারের সব অপরাধই খারিজ হয়ে যায়। কেননা বিচারকরা মনে করেন, তাঁর অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছে 'শুধু নিগ্রোরক্তের' বিরুদ্ধে!
বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনও নন্দিত আমাদের সবার কাছে। অথচ দাস ব্যবসার জন্য কুখ্যাত সাউথ সি কম্পানির শেয়ারহোল্ডার ছিলেন তিনি। লোভনীয় মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিলেও কম্পানিটি ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত। ১৭২০ সালে কম্পানির জাহাজে ডাকাতদল হামলা চালায়। ওই বছর শেয়ারহোল্ডারদের তালিকায় ছিলেন হাউস অব কমন্সের ৪৬২ জন সদস্য, হাউস অব লর্ডসের ১০০ জন সদস্য, আইজ্যাক নিউটন, থমাস গাই প্রমুখ। থমাস গাইয়ের শেয়ার ছিল ৪২ হাজার পাউন্ড। কিন্তু তিনি ডাকাতির ঘটনায় কম্পানির শেয়ার ব্যবসায় ধস নামার আগেই লন্ডনে তাঁর হাসপাতালের কথা বলে প্রতিটি শেয়ার ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি করে দেন। এতে এত লাভ হয় যে হাসপাতাল বানাতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি তাঁর। অন্যদিকে শেয়ার মন্দার ফলে নিউটনের লোকসান হয় ২০ হাজার পাউন্ড। তবে ডাকাতির ধকল সত্ত্বেও সাউথ সি কম্পানি ১৭১৫ থেকে ১৭৩১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার দাস চালান করে।
শুধু কি নিউটন, ১৭১২ সালে 'দ্য রেপ অব দ্য লক' লিখে, পরে 'হোমার' অনুবাদ করে বিখ্যাত কবি আলেকজান্ডার পোপও সাউথ সি কম্পানির দাস ব্যবসায় টাকা খাটান। টাকা মার যায় তাঁরও। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যিনি ইংল্যান্ডের শিল্পকলা নিয়ন্ত্রণ করেছেন, সেই পোট্র্রেট পেইন্টার স্যার গডফ্রে নেলারও লোকসান দেন এই কম্পানিতে টাকা খাটিয়ে।
বিখ্যাত 'উদারনৈতিক' দার্শনিক জন লকও ৬০০ পাউন্ড বিনিয়োগ করেছিলেন ব্রিটেনে দাস ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকারী রয়্যাল আফ্রিকান কম্পানিতে। তা ছাড়া ১৬৯০ সালে তিনি লেখেন 'অ্যাসেস কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং', যা ছিল বর্ণবাদী চিন্তা বিকাশের বাইবেল। আফ্রিকানরা শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়দের তুলনায় সব দিক বিচারেই হীন ও ছোট_এই ছিল তাঁর উদারনৈতিক ধারণা!
১৬০২ সালে অজ্ঞাত এক শিল্পী ছবি এঁকেছিলেন স্যার ওয়াল্টার রালেগের। রালেগ ছিলেন লেখক। লিখতেন কবিতা। কিন্তু তাঁকে ক্ষমতাবান করে তুলেছিল তাঁর অভিযান আর যুদ্ধাভিযান চালানোর কূট অভিজ্ঞতা। তাই রানি এলিজাবেথেরও প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপনকারী এবং দাসব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। ইংল্যান্ডে আলু আর টোব্যাকো নিয়ে আসেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে স্বর্ণ আহরণের ব্যাপারেও উদ্যোগ নেন বেশ কয়েকবার। আয়ারল্যান্ডের বিদ্রোহ দমনে, কাডিজ ও অ্যারোজেসের যুদ্ধাভিযানে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। দেশ চালাতে গেলে এ রকম কীর্তিমান মানুষকে পছন্দ না করে উপায় আছে? কিন্তু রানি প্রথম এলিজাবেথের আনুকূল্য থাকা সত্ত্বেও জেলে যেতে হয় তাঁকে। তিনি তখন আত্মনিয়োগ করেন সাহিত্য ও বিজ্ঞান চর্চায়। শুরু করেন 'হিস্ট্রি অব ওয়ার্ল্ড' (১৬১৪) লেখা। জেল থেকে বেরিয়ে আবারও অভিযানে বের হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন স্প্যানিয়ার্ডকে হত্যার দায়ে প্রথম জেমস ফাঁসি দেন তাঁকে। রালেগের স্ত্রীই ক্রীতদাসের মালিক এবং প্রতিপালক হওয়াকে ষোড়শ শতাব্দীতে আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক এবং ফ্যাশনেবল করে তোলেন। এই ফ্যাশন অব্যাহত থাকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত। কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী আর বিজ্ঞানীদের ব্যবসাভাগ্য অবশ্য কখনোই ততটা ভালো নয়। এ জন্য তাঁদের প্রতি আমাদের সহানুভূতির অন্ত নেই। তাই বলে তাঁদের মতো স্পর্শকাতর আর অনুভূতিপ্রবণ মানুষরা দাস হত্যাকারীদের পক্ষে দাঁড়াবেন, দাস ব্যবসায়ীদের খাতায় নাম লেখাবেন, তা কি মেনে নেওয়া যায়?
২০০ বছর পর 'অবসানের পথে'
কালের বিবর্তনে ডিকেন্স-নিউটনদের ঢেকে যাওয়া এই খণ্ড অতীত জানা গেল ব্রিটেনে দাস ব্যবসা অবসানের ২০০ বছর (১৮০৭-২০০৭) পূর্তির বিভিন্ন প্রদর্শনী আর আলোচনা থেকে। ১৮০৭ সালের ২৫ মার্চ ব্রিটেনের পার্লামেন্ট 'ট্রান্স-আটলান্টিক স্লেইভ ট্রেড অ্যাবলিশন অ্যাক্ট' করে আইনগতভাবে বিভিন্ন উপনিবেশে দাস বেচাকেনা ও চালানের অবসান করে। প্রায় ৩০০ বছর দাসদের নিয়ে রক্তের হোলি খেলেছে ব্রিটিশ। তাতেও রক্ষা নেই। দাসদের তারা মনে রেখেছে। তাই ২০০ বছর পূর্তির আবরণে নতুন করে দাসদের মুক্তি দেওয়ার গৌরব আর আনন্দবার্তাও তারা ঘোষণা করেছে ২০০৭ সালের প্রায় পুরোটা সময়ই। পূর্তির এই আয়োজন যত সমন্বয়ই করা হোক না কেন, কোনো আয়োজনেই দাস বিদ্রোহকে তুলে ধরা হয়নি। বরং আড়ম্বরের সঙ্গে দেখানো হয়েছে এ ব্যাপারে ব্রিটেনের সংসদীয় প্রচেষ্টাকে, শ্বেতাঙ্গ মানুষের মহীয়ানতাকে।
২০০ বছর পূর্তির বিভিন্ন আয়োজন করেছিল সমন্বিতভাবে ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল গ্যালারি, ন্যাশনাল পোট্র্রেট গ্যালারি, হাউজেস অব পার্লামেন্ট, টেট ব্রিটেন, ওয়েস্টমিনস্টার সিটি আর্কাইভ আর ওয়েস্টমিনস্টার সিটি কাউন্সিল। বিভিন্ন প্রদর্শনী, আলোচনা, কথোপকথন আর দ্রষ্টব্য জায়গাগুলো চিনে নেওয়ার এসব আয়োজনের শিরোনাম ছিল 'অন দ্য রোড অব অ্যাবলিশন'। বাংলায় কী বলব একে? 'অবসানের পথে'?
'অবসানের' এই পথ প্রথম নজরে এল আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার পথে আমাদের পুরনো সহকর্মী, এখন ভোরের কাগজের নির্বাহী সম্পাদক সুকান্ত গুপ্ত অলক লন্ডনে এলে। অলকের প্রচুর প্রাণশক্তি, পারলে এক দিনেই পুরো লন্ডন হেঁটে হেঁটে দেখে ফেলে। তা ছাড়া সময়ও কম; প্যারিস আর রোম দেখতে না গেলে তাঁর এই বিদেশ ভ্রমণ অসমাপ্ত থেকে যাবে। অলকের সঙ্গে আমি ঘুরছি পিকাডেলি সার্কাস, ল্যানচেস্টার স্কয়ার, ট্রাফালগার স্কয়ার, পার্লামেন্ট হাউস ইত্যাদি। ওই সময়ই আমরা জানতে পারলাম, ১৮০৭-২০০৭-কে ঘিরে এত সব আয়োজনের কথা। দেখলাম আমরা, এক অর্থে অ্যাবলিশন অ্যাক্টের স্মৃতির বৃত্তে হাঁটাহাঁটি করছি। ন্যাশনাল গ্যালারিতে তখন চলছে 'স্ক্র্যাচ দ্য সারফেস' প্রদর্শনী। শুরুর রুমেই এই প্রদর্শনীতে ছিল শিল্পী জোফানির 'মিসেস অসওয়াল্ড' (১৭৬৩-১৭৬৪)। ছিল কালো তরুণ ইনকা শোনিবের নতুন একটি কাজ। আর ন্যাশনাল পোট্র্রেট গ্যালারিতে তখন চলছে 'পোট্র্রেটস, পিপল অ্যান্ড দ্য অ্যাবলিশন অব দ্য স্লেইভ ট্রেড : এ জার্নি থ্রু দ্য ন্যাশনাল পোট্র্রেট গ্যালারি কালেকশন'। হাউজেস অব পার্লামেন্টের ওয়েস্টমিনস্টার হলে চলছে 'দ্য ব্রিটিশ স্লেইভ ট্রেড : অ্যাবলিশন, পার্লামেন্ট অ্যান্ড পিপল' প্রদর্শনী। ঘরে-বাইরের যেসব উদ্যোগ ও ঘটনা সংসদকে দাস ব্যবসার অবসানের দিকে নিয়ে যায়, সেগুলোর প্রমাণপত্র, বিভিন্ন আবেদনপত্র, সারা ব্রিটেন ঘোড়ায় চড়ে ছুটে বেড়ানো থমাস ক্লার্কসনের বিখ্যাত আফ্রিকান বঙ্ ইত্যাদি ছিল এই প্রদর্শনীতে। আর টেট ব্রিটেনে ছিল '১৮০৭ : ব্লেক, স্লেইভারি অ্যান্ড দ্য র‌্যাডিক্যাল মাইন্ড' প্রদর্শনী। দাস ব্যবসার অবসানে উইলিয়াম ব্লেক (১৭৫২-১৮২৭) এবং প্রকাশক জোসেফ জনসনসহ (১৭৩৮-১৮০৯) ১৭৯০ ও ১৮০০ দশকের উল্লেখযোগ্য সব র‌্যাডিক্যাল লেখক ও শিল্পীর ভূমিকা তুলে ধরা হয় টেট ব্রিটেনের আয়োজনে। আর ওয়েস্টমিনস্টার সিটি আর্কাইভে ছিল স্থানীয় পর্যায়ে দাস ব্যবসার প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করে এক প্রদর্শনী 'ওয়েস্টমিনস্টার অ্যান্ড দ্য ট্রান্স-আটলান্টিক স্লেইভ ট্রেড'। দাস ব্যবসার কালে ওয়েস্টমিনস্টারে বসবাসরত আফ্রিকানদের জীবনযাপনের বিভিন্ন উপকরণ আর ছবিও ছিল এখানে। অন্যদিকে ওয়েস্টমিনস্টার সিটি কাউন্সিল আয়োজন করেছিল বিভিন্ন পথযাত্রা ও কথোপকথনের, সিনেমা প্রদর্শনী ও পারফরম্যান্সের।
তা ছাড়া সারা দিন হাঁটতে হাঁটতে দিন শেষে টাওয়ার ব্রিজের কাছে গিয়ে আমি আর অলক দেখেছিলাম খোলা টেমসের বুকে এক স্থাপনা শিল্প : ইতিহাসখ্যাত জং ম্যাসাকারের সেই জং নামের কার্গোটির রেপ্লিকা।
সব কিছু দেখা হয়নি, যদিও সুকান্ত গুপ্ত অলক চলে যাওয়ার পরও বেশ কয়েকবার এসব প্রদর্শনীতে গেছি আমি।

ত্রিভুজের এক অসমকোণ
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে নতুন জনপদ আবিষ্কার, বিজয় এবং বসতি স্থাপন করাটা ছিল সমুদ্রতীরঘেঁষা ইউরোপীয় অক্ষশক্তিগুলোর 'মুই কী হনু রে!' প্রমাণ করার প্রধান উপায়। স্প্যানিয়ার্ড, পর্তুগিজ ও ডাচ্রা ছিল এই সমুদ্র ব্যবসার সফল নায়ক। ইংরেজরা অনেক পিছিয়ে ছিল এ ব্যাপারে। এতই পিছিয়ে ছিল যে পাল্লা দেওয়ারও কোনো উপায় ছিল না। প্রথম দিককার ইংরেজ সমুদ্র অভিযাত্রীদের মনোযোগ ছিল আফ্রিকার গোল্ড বা স্বর্ণের দিকে। এ জন্যই শুরুর দিকে ইংল্যান্ডের মুদ্রা পরিচিতি পায় 'গিনি' নামে। শেষমেশ ইংরেজরা সাফল্য খুঁজে পায় দাস ব্যবসায়। কেননা ইউরোপের অন্য কোনো দেশেরই আফ্রিকা থেকে দাস আনার ব্যাপারে তেমন মনোযোগ ছিল না। আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে বসতি স্থাপন শুরু হলে আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপের ব্যবসায়িক সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এসব স্থানে শুরু হয় চিনি উৎপাদন। চিনির চাষবাস শুরু করে স্প্যানিয়ার্ডরা, পরে একে পরিণত রূপ দেয় ডাচ্রা। এই শ্রমঘন চিনিপণ্য উৎপাদনের জন্য তাদের চোখ পড়ে আফ্রিকান ক্রীতদাসদের দিকে।
ওই সময় ক্রীতদাসদের ৭০ শতাংশকেই জাহাজে করে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে, চিনির চাষবাস করাতে। এই জঘন্য ব্যবসায় ব্রিটিশ জাতির সম্পৃক্তির শুরুটা জানা যায়নি। তবে জন হকিন্স প্রথম জ্ঞাত ব্রিটিশ প্রাইভেটর, যিনি ১৫৬২ সালে আফ্রিকার মানুষকে ক্রীতদাস হিসেবে আটলান্টিক সাগর পাড়ি দিয়ে ক্যারিবীয় দেশগুলোতে নিয়ে যেতেন। হকিন্সের আরেকজন সহযাত্রী ছিলেন স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক। তার আগে থেকেই অবশ্য অনেক দেশ জড়িয়ে পড়ে ক্রীতদাস ব্যবসায়। তবে তা তাদের মুখ্য ব্যবসা ছিল না। রানি প্রথম এলিজাবেথের সময় থেকে ইংরেজরা মরিয়া হয়ে ওঠে সমুদ্র ব্যবসায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার জন্য। রানির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে জন হকিন্স ৩০০ ক্রীতদাসের চালান নিয়ে উত্তর আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে সেগুলো চালান করেন চিনি, জিঞ্জার ইত্যাদির বিনিময়ে। এসব পণ্য নিয়ে তিনি ১৫৬৩ সালে ফিরে আসেন ইংল্যান্ডে। মুনাফার স্বাদে অস্থির হকিন্স পরের বছর আবারও বের হন সমুদ্র অভিযানে। এবার রানি এলিজাবেথ অনুমতির পাশাপাশি তাঁকে একটি জাহাজও দেন ক্রীতদাস চালানের জন্য। তবে ইংল্যান্ডে এ সময় আফ্রিকানদের সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে দাস ব্যবসায় জড়িত থাকলেও রানি ১৫৯০ সালের জুলাইয়ে আফ্রিকানদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার ডিক্রি জারি করেন। কিন্তু বিফলে যায় তাঁর ডিক্রি। নিজেদের স্বার্থেই আফ্রিকানদের বহাল রাখে ইংল্যান্ডের অভিজাতরা; যেমন আমাদের ঢাকার অভিজাত ও মধ্যশ্রেণী মানবাধিকারের কারণে নয়, বরং নিজেদের প্রয়োজনেই সংরক্ষণ করে বস্তি ও বস্তিবাসীদের। ১৬২০-এর দশকের দিকে ব্রিটেন তাদের ইন্ডিয়ান দ্বীপগুলোতে চিনি উৎপাদনের জন্য, সেই সূত্রে ক্রীতদাস ব্যবসার ব্যাপারে মনোযোগী হয়। এ দুই ব্যবসা ছিল তখন একে অন্যের পরিপূরক। তা ছাড়া উত্তর আমেরিকার কলোনিগুলোতে টোব্যাকো চাষের বিকাশ দাসশ্রম ব্যবহারের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে। ১৭৩০-এর দশকের দিকে ব্রিটেন পরিণত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাসবাণিজ্যিক রাষ্ট্রে। ১৬৯০ থেকে ১৮০৭ সালের মধ্যে ব্রিটিশ জাহাজে করে পরিবহন করা হয় প্রায় ৩ দশমিক ২৫ মিলিয়ন আফ্রিকান ক্রীতদাসকে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপজুড়ে যে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তাকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটেন সক্ষম হয় আফ্রিকা ও আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসায় একাধিপত্য অর্জন করতে। ব্রিটেনের লাভজনক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল অসম দাস ব্যবসা; এবং এই অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক পরিচিতি পায় 'ট্রায়াঙ্গুলার ট্রেড' হিসেবে। ইংল্যান্ড থেকে আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া হতো অস্ত্র, কাচ, ধাতু, বস্ত্র এবং বিভিন্ন ব্রিটিশ পণ্য। সেখানে এগুলো আফ্রিকানদের ধরে ক্রীতদাস বানানোর জন্য বিনিময় করা হতো। তারপর ব্রিটিশ জাহাজে করে অধিকাংশ আফ্রিকান ক্রীতদাসকে চালান করা হতো ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আমেরিকায়। এসব জায়গায় তাদের লাগানো হতো চিনি, কফি, সুতা ও কোকো উৎপাদনের কাজে। দাসদের নামিয়ে চিনি, কফি, সুতা, কোকো ইত্যাদি জিনিসপত্রে ভর্তি কার্গো নিয়ে দাস ব্যবসায়ীরা ফিরে আসত ইংল্যান্ডে। মুনাফা লোটার জন্য এই ত্রিভুজাকৃতির নেটওয়ার্কের চেয়ে সহজ ও নিশ্চিততম আর কোনো অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ছিল না তাদের।
২০০ বছর পর ব্রিটিশ জাতি ক্রীতদাস প্রথা অবসানের আনন্দে যত পূর্তি উৎসবই করুক না কেন, ক্রীতদাসরাই প্রথম কণ্ঠস্বর, যারা বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে লেখাপড়া শিখে লেখালেখি করে এই জঘন্য ব্যবসার বিরুদ্ধে মানুষের সুচেতনা জাগিয়ে তোলে। ইউরোপ-আমেরিকার সাদা মানুষরা এ ব্যাপারে মুখ খুলতে শুরু করে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। ব্রিটেনে এ ব্যাপারে প্রথম আপত্তি তোলেন জর্জ ফঙ্ প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টধর্ম সম্প্রদায় উদ্ভূত গোষ্ঠী কোয়েকার এবং অন্যান্য নন-কনফর্মিস্ট চার্চ গ্রুপের সদস্যরা। কিন্তু দাস ব্যবসা অবসানের আন্দোলন ব্যাপকতা পায় ব্রিটেনে বসবাসকারী পুরনো ক্রীতদাস জনগণের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে, যা ব্রিটিশ ইতিহাসে গুরুত্বের সঙ্গে কখনো লেখা হয়নি। বিশেষ করে ক্রীতদাস সমারসেট ও জং জাহাজের ঘটনাসংক্রান্ত মামলার মধ্য দিয়ে দাসমুক্তি এবং অধিকারের প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে। কালোরা নিজেরা এ ব্যাপারে কতটা উচ্চকিত হয়ে উঠেছিলেন, তার খানিকটা আঁচ করা যায় এ সময় প্রকাশিত ইগনাটাস সানচোর পত্রাবলি এবং ওলাউদা একুয়ানো ওউওবনা অটোবাহ কুগোয়ানোদের বিভিন্ন বইপত্র থেকে। এসব বইয়ে তুলে ধরা হয় জাহাজে করে দাসদের নিয়ে আসার সময় আফ্রিকানদের ওপর ভায়োলেন্স, অত্যাচার আর অবমাননার বিবরণ। আফ্রিকান ক্রীতদাসরা বারবার প্রতিবাদ, বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়েও এই ব্যবসার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকেন।
১৭৭৬ থেকে ১৭৮৩ সালে উত্তর আমেরিকার যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাদের পরাজয়ের পর দাস ব্যবসা নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হলো। যুদ্ধে পরাজিত ব্রিটিশ সেনারা ঘরে ফিরতে লাগল তাদের পুরনো দাস নিয়ে। সরকার উদ্যোগ নিল আবারও তাদের আফ্রিকায় ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু সিয়েরা লিওন স্কিম বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতায় সরকার বুঝতে পারল, এ রকম উদ্যোগ ব্যর্থ হতে বাধ্য। ১৭৮০-এর দশকজুড়েই তাই নানা দিক থেকে ক্রমাগত আলোচনা চলল কালো, গরিব আর দাসদের সমস্যা নিয়ে। (সংক্ষিপ্ত)
[শিলালিপি ২৯ জুলাই ২০১১]

No comments

Powered by Blogger.