৭ জানুয়ারি জেলা ও ১১ জানুয়ারি উপজেলায় মিছিল-সমাবেশ-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই :রাজপথে থাকার শপথ

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সুদৃঢ় দাবির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকায় গণমিছিল করেছে। গণমিছিল শেষে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনের সমাবেশ থেকে এ বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার দৃপ্ত শপথ নিয়েছেন লাখো মানুষ। সমাবেশ থেকে একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে মহাজোটের পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। এ ইস্যুতে আগামী ৭ জানুয়ারি দেশের প্রতি জেলায় এবং ১১ জানুয়ারি


প্রতি উপজেলায় গণমিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এসব কর্মসূচি পালনকালে জেলা ও উপজেলাগুলোকেও মিছিলের নগরীতে পরিণত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচার দাবি এবং তাদের রক্ষায় বিএনপি-জামায়াত জোটের ষড়যন্ত্র
প্রতিহত করতে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে এ গণমিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছিল। দুপুর আড়াইটায় মিছিল শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এর আগে থেকেই ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ, সাম্যবাদী দল, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, গণআজাদী লীগসহ ১৪ দলভুক্ত সব দল এবং এসব দলের সব সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী-সমর্থকরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অভিমুখে মিছিল শুরু করেন। এদের সঙ্গে যোগ দেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও বঙ্গবন্ধু পরিষদসহ বিভিন্ন ছাত্র-যুব-শ্রমিক-শিক্ষক-কৃষক-সাংস্কৃৃতিক-পেশাজীবী সংগঠনসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শতাধিক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সর্বস্তরের মানুষ। তবে গণমিছিলে মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। অবশ্য বিকেলের সমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন দলটির একজন প্রতিনিধি।
বাস-ট্রাক-মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ব্যানার-ফেস্টুন সহকারে হেঁটেও সব বয়সের নারী-পুরুষ, যুবক ও ছাত্র-জনতা গণমিছিলে যোগ দেন। তারা 'যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই, দিতে হবে'সহ নানা স্লোগানে গোটা এলাকা মুখর রাখেন। অনেকেই জাতীয় ও দলীয় পতাকার পাশাপাশি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,
চার জাতীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি বহন করেন। কেউ কেউ ব্যান্ডপার্টি বাজিয়ে ও নেচেগেয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করেন। সবকিছু ছাপিয়ে গোলাম আযম-নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদীসহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী বিচার সংবলিত কুশপুত্তলিকা দৃষ্টি কেড়েছে সবার। গণমিছিলকালে এসব কুশপুত্তলিকার কয়েকটিতে অগি্নসংযোগ কিংবা থুথু ছিটিয়ে ঘৃণাও প্রকাশ করা হয়। এ সময় রাস্তার দু'পাশে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ স্লোগান দিয়ে মিছিলকে স্বাগত জানান। অনেকে মিছিলের সঙ্গে একাত্মও হন। বিকেল নাগাদ মানুষের ভিড় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন এলাকা ছাড়িয়ে একদিকে শাহবাগ অন্যদিকে মৎস্য ভবন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। বিকেল সাড়ে ৩টার কিছু আগে সমাবেশ শুরু হওয়ার পরও মিছিলের পর মিছিল এসেছে।
এদিকে আওয়ামী লীগসহ মহাজোট নেতাদের কড়া হুশিয়ারি সত্ত্বেও বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকে শোডাউনের চেষ্টা করেছেন। গণমিছিলে এসব সম্ভাব্য প্রার্থীর সমর্থকরা ব্যানার-ফেস্টুনের পাশাপাশি স্লোগানও দিয়েছেন। অন্যদিকে গণমিছিলকে ঘিরে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত নগরীর প্রায় সর্বত্র ব্যাপক যানজট দেখা গেছে। এর আগেই কর্তব্যরত পুলিশ পল্টন মোড় ও মৎস্য ভবনের সামনেসহ কয়েকটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দিলে এ নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভেরও সৃষ্টি হয়।
এর আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের 'শিখা চিরন্তন'-এর সামনে মূল সমাবেশের স্থান নির্ধারণ করা হলেও জনতার ভিড়ের কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত সমাবেশ মঞ্চ করা হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের সামনে। এ সময় শিখা চিরন্তন চত্বরসহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরেও মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা দিলে শপথ গ্রহণের কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ মঞ্চ থেকে। মঞ্চের বিশাল ব্যানারে শোভা পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর ছবি।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে মহাজোটের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে এ বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে অবস্থানসহ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার সংবলিত শপথবাক্য পাঠ করান তিনি।
দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে কাজ শুরু করেছিলেন, তার কন্যা শেখ হাসিনাই সেই অসমাপ্ত বিচার শেষ ও এর রায় কার্যকর করবেন।
উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই এদের বিচার ঠেকাতে পারে। এই বিচার শেষ করেই বাংলার মাটিকে কলুষমুক্ত করা হবে।
উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় খালেদা জিয়া গুপ্তহত্যা ও চোরাগোপ্তা হামলাসহ অনেক কিছুই করছেন। তবে একাত্তরে তার বন্ধুরা যেমন সফল হননি, এবার তিনিও সফল হবেন না।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে খালেদা জিয়া রাজপথে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ জনগণের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এর বিরুদ্ধে সব অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ এবং খালেদা জিয়ার ষড়যন্ত্র বানচাল করতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে অতন্দ্রপ্রহরীর মতো রাজপথে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বলেন. এরশাদ ও জাপার পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে সমর্থন জানাতে এসেছি।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নূরুর রহমান সেলিম, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ূয়া এবং ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হক। সমাবেশ পরিচালনা করেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম। শুরুতে বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যুতে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
এদিকে মহাজোটের গণমিছিল চলাকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। দীপায়ন খীসার নেতৃত্বে কার্জন হল থেকে মিছিল সহকারে সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রেস ক্লাবের সামনে আসেন।

No comments

Powered by Blogger.