জ্বালানি তেলের দাম ফের বাড়ল

মাত্র ৫০ দিনের ব্যবধানে আবারও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল। এবারও বেড়েছে লিটারে ৫ টাকা করে। প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিন ৫৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬১ টাকা, পেট্রোল ৮৬ থেকে ৯১ টাকা, অকটেন ৮৯ থেকে ৯৪ টাকা এবং ফার্নেস অয়েল ৫৫ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৬০ টাকা। গত মধ্য রাত থেকে নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে। গতকাল রাতে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার এ সিদ্ধান্ত জানায়। সর্বশেষ গত ১০ নভেম্বর দিবাগত মধ্যরাতে সব ধরনের


জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। চলতি বছর চার দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয় ২১ ডিসেম্বর। ডিসেম্বর থেকে এ দাম কার্যকর করা হয়েছে। এদিকে, জ্বালানি তেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিএনজির দামও বাড়ানোর বিষয়ে সরকার চিন্তা-ভাবনা করছে। শিগগিরই যানবাহনের এ জ্বালানির দাম বাড়ানো হতে পারে বলে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
মূল্যস্ফীতি বর্তমানে প্রায় ১২ শতাংশ। দফায় দফায় জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে পণ্যমূল্য আরও বাড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। যানবাহনের ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির আশঙ্কাও করা হচ্ছে। জানা গেছে, সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে একশ' কোটি ডলার ঋণ নিতে যাচ্ছে। তাদের ঋণের শর্ত হিসেবে সরকার আরেক দফা তেলের দাম বাড়ালো। তাছাড়া সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান পড়ে গেছে ব্যাপকভাবে। ফলে সরকারকে দাম বাড়াতে হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে বলা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম না বাড়লেও দেশে আরেক দফা মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এর সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। গত রাতে তিনি সমকালকে বলেন, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার দরকার ছিল না। তাদের ঋণের সুদ জোগাড় করতে গিয়ে সরকারকে আগামী বাজেটে ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়াতে হবে। জনগণের কষ্ট আরও বাড়বে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম একই থাকলেও আগের চেয়ে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটেছে। নভেম্বরে যেখানে প্রতি ডলারের মান ছিল ৭৩-৭৫ টাকা, সেখানে এখন প্রতি ডলারে পাওয়া যাচ্ছে ৮১-৮২ টাকা। এছাড়া নভেম্বরে লিটারে ৫ টাকা দাম বাড়ানো হলেও তখনকার ভর্তুকির কমাতে যথেষ্ট ছিল না। একবারে বাড়ালে তা জনগণের ওপর বোঝা হিসেবে দেখা দেবে বলে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানো হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান লোকসান সামাল দিতে না পেরে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকির অর্থ চায়। সরকার ভর্তুকির টাকা দিতে না পেরে তেলের দাম আবারও বাড়িয়ে দেয়।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েছে বিপিসি। আর্থিক লোকসান অনেকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সংস্থাটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। গত অর্থবছর জ্বালানি তেল বিক্রি করতে গিয়ে বিপিসি ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। নতুন নতুন তেলনির্ভর কেন্দ্র গড়ে ওঠায় এক বছরের ব্যবধানে তেলের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২০ লাখ টন। নতুন করে আরেক দফা তেলের দাম না বাড়লে চলতি অর্থবছর বিপিসির লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় পেঁৗছতো। দাম বাড়ায় ভর্তুকি কমবে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা। মূল্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও বিপিসিকে চলতি অর্থবছরে ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে সূত্রটি জানায়।
রেন্টালের কারণে আবারও দাম বাড়ল : রেন্টাল (ভাড়াভিত্তিক) এবং কুইক রেন্টালসহ জ্বালানি তেলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভর্তুকি মূল্যে তেল সরবরাহ করতে গিয়ে গত অর্থবছরে আমদানি করা হয় সাড়ে ৪৮ লাখ টন তেল। চলতি অর্থবছরে এ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ৬৭ লাখ টনে। কারণ এর মধ্যে জ্বালানি তেলনির্ভর আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। দু'বছর আগে তেল আমদানিতে সরকারকে পৌনে ৩ বিলিয়ন ডলার বছরে খরচ করতে হতো। সেখানে চলতি অর্থবছরে ৬ বিলিয়ন ডলার লাগছে। এ অর্থের জোগান দেওয়া সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে : মাত্র ৫০ দিন পর আরেক দফা জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরেক দফা বাড়বে। যানবাহন ভাড়া থেকে দ্রব্যমূল্য সব কিছুতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে দেখছেন না দেশের অর্থনীতিবিদরা।

No comments

Powered by Blogger.