ফ্যাশনে বাংলার মুখ

০১১ সালে দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোর ভাবনায় স্বদেশের ঐতিহ্য তুলে ধরার প্রবণতা বছরজুড়ে দেখা গেছে। চলতি বছরের দেশীয় ফ্যাশনের নানা দিক নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন রঞ্জু চৌধুরী বছরের শুরুর দিক বরাবরই শীতের আমেজে ঘেরা থাকে। ফ্যাশন ভুবনে এর প্রভাবও পড়ে। এ সময়ে পোশাকে দেশীয় খাদি কাপড় প্রাধান্য পায়। এ ছাড়াও সিল্ক, এন্ডি সিল্ক, পশমি সুতা এবং মোটা সুতার চাদরও তৈরি হয়। চাদরের মোটিফে উঠে আসে বাংলাদেশের


পতাকার রঙ এবং নকশা। শীতের এ সময়ে ফ্যাশন অনেক বেশি রঙিন। তাই রঙের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল রঙকে বেছে নেন ডিজাইনাররা। সেই সঙ্গে ওয়েস্টার্ন পোশাকের ফিউশনও বেশ লক্ষণীয়। ফ্যাশন হাউস কুমুদিনিসহ আরও অনেকে খাদি বা সিল্কের কাপড়ে তৈরি করেছে ব্লেজারের মতো পোশাকও। যার বাজার বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে।
অমর একুশে বইমেলা দিয়ে শুরু হয় ফেব্রুয়ারি। একুশ নানাভাবে প্রভাবিত করে চলেছে জাতীয় জীবনের

প্রতিটি অধ্যায়কে। এ সময়ে ফুলেল আর জ্যামিতিক মোটিফের সঙ্গে বর্ণমালার স্থান পেয়েছে পোশাকের কালেকশনে। টি-শার্টে স্ক্রিন প্রিন্ট করা হয় সেই সময়ের ছবি, শহীদ মিনার, ভাষা সংগ্রামীদের কথা, কবিতা এবং গান। রঙের ক্ষেত্রে সাদা-কালো বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ মাসেই ঋতুরাজ বসন্তের আবির্ভাব। বসন্তবরণের মতো ঐতিহ্যবাহী উৎসবে ফ্যাশন হাউসগুলোর অংশগ্রহণ বরাবরের মতোই প্রশংসনীয়। এ পোশাকে রঙের ক্ষেত্রে বাসন্তি রঙকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তার সঙ্গে সবুজ, লাল, সাদা রঙের মিশেলে তৈরি হয়েছে বসন্তের ফিউশন পোশাক। দেশি সুতি, টাঙ্গাইল এবং তাঁতে বোনা কাপড়ের ব্যবহার বেশি হয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আয়োজক দেশের একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ দলের জার্সির ডিজাইন করেছে ফ্যাশন হাউস ওটু'র ডিজাইনার সেজান লিংকন। সেই সঙ্গে ডিজাইনার চন্দ্র শেখর শাহর নেতৃত্বে ফ্যাশন হাউসগুলোর আয়োজনে স্মৃতি উপহার প্রদর্শনীটি ছিল প্রশংসার দাবিদার।
বিশ্বকাপের মাতামাতিতে তারুণ্যের প্রিয় পোশাক টি-শার্টের লাল-সবুজে ছেয়ে যায় স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ। আবার তার কিছুদিন পরেই স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতা দিবসের আয়োজনে ফ্যাশন হাউসগুলো শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি এবং ফতুয়ার আয়োজন বেশি করে থাকে। রঙের ক্ষেত্রে লাল-সবুজের আধিক্য দেখা যায়। এ সময়ে ফ্যাশন হাউস কে-কদ্ধ্যাফটের 'জাগো বাংলাদেশ' শিরোনামের কালেকশনটি সাড়া ফেলেছিল। পোশাকে সাদা, সবুজ ও লাল ব্যবহার করে তারা। বাংলাদেশের ফ্যাশন এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক। ২০১১ সালে নগরের সব ফ্যাশন হাউসেই স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন ছিল।
বাঙালির চিরায়ত উৎসব পহেলা বৈশাখ। এ উৎসবের আয়োজনে অংশ নেয় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই। ঢাকাসহ দেশের সবখানের মানুষ আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। চলে ঐতিহ্যবাহী মেলা এবং নানা ধরনের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ সময়ে ফ্যাশন হাউস রঙের খেলায় মেতে ওঠে। উৎসবের রঙ লাল। আর সাদার শুভ্রতার মিশেলে তৈরি হয় পোশাক। পোশাকে বৃদ্ধ, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সবার পোশাকের আয়োজন থাকে পহেলা বৈশাখের ফ্যাশন। অংশগ্রহণ করে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সব ফ্যাশন হাউস। তবে আমাদের সংস্কৃতির ধারক এ উৎসবে মেয়েদের জন্য শাড়িকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। অন্যদিকে ছেলেদের প্রিয় পোশাক পাঞ্জাবির আয়োজন থাকে ব্যাপক আকারে। বৈশাখী আয়োজনে থিমভিত্তিক কাজের প্রাধান্য দেখা যায়। ফ্যাশন হাউস সাদাকালোর হাতপাখা থিমে তৈরি শাড়ির ডিজাইন সবার দৃষ্টি কাড়ে। এ ছাড়া নগরদোলার বৈশাখের আয়োজনে মোগল নকশা বেশ প্রশংসার দাবি রাখে। দেশীদশের আয়োজনের দিকে এ সময় সবার নজরে থাকে। ক্রেতাকে নারাজ করেনি তারা। সুতি কাপড়কে প্রাধান্য দিয়ে ফ্যাশন হাউসগুলো তৈরি করেছে তাদের পোশাকের আয়োজন। ফ্যাশন হাউস বিবিআনা তাদের শাড়ির আয়োজনে রিকশা পেইন্টিংকে বেছে নিয়েছিল। উজ্জ্বল রঙ এবং মোটিফের এক অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায় তাদের কালেকশনে। নতুন রঙিন পোশাকে বাঙালির পান্তা-ইলিশ এবং ভর্তা দিয়ে শুরু হয় বাংলা নববর্ষের এ আয়োজন।
এবার বাংলাদেশে গরমের প্রার্দুভাব ছিল বেশ। গরমে নাভিশ্বাস উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল এ বাংলায়। ফ্যাশন হাউসগুলো এ সময় আরামদায়ক সাদা রঙকে প্রাধান্য দিয়ে পোশাকের ডিজাইন করেছে। সেই সঙ্গে হাতাকাটা পোশাকের ট্রেন্ডও বেশ লক্ষণীয়। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো তাদের পোশাকের কালেকশনে হাতাকাটা পোশাকের আয়োজন রেখেছিল। স্টাইলিস্ট এ ফ্যাশন সাদরে গ্রহণ করেছে নগরবাসী।
আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এখন নিয়মিত দিবসভিত্তিক পোশাকের আয়োজন করে থাকে। পরিবার দিবস, মা দিবস, বাবা দিবস, নারী দিবস এমনকি বন্ধু দিবসেও ফ্যাশন হাউসগুলোর অংশগ্রহণ দেখা যায়। পোশাকের ডিজাইনে দিবসের থিমকে কাজে লাগায় তারা। বেশিরভাগ সময়ই বাংলা কবিতা বা গান মোটিফ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঈদ আনন্দ আরেকটি উল্লেখযোগ্য উৎসব। এ উৎসবে ফ্যাশন হাউসগুলো মূল বাজার। মুসলিম প্রধান এই দেশের ঈদ আনন্দকে আরও রঙিন করতে ফ্যাশন হাউসের চেষ্টার কমতি থাকে না। মাসজুড়ে চলে পোশাক বিকিকিনির এই বাজার। আলোকিত হয়ে ওঠে মার্কেটগুলো। ফ্যাশন হাউস সেজে ওঠে রঙিন পোশাকে। শপিং মলে দেশীয় কাপড়ের পাশাপাশি বিদেশি পণ্যের সমারোহ দেখা যায়। আমাদের দেশীয় পণ্যের বাজার বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে আছে তাদের সৃজনশীল কাজ এবং মনকাড়া ডিজাইন দিয়ে। সেই সঙ্গে পূজার আয়োজনও ছিল লক্ষণীয়।
বছরজুড়ে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে সুতার দাম বৃদ্ধি। সরকারি এই সিদ্ধান্তে ডিজাইনার, ফ্যাশন হাউস, ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই বেশ ক্ষুব্ধ হন। বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি যখন আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রস্তুত, তখন এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নেতিবাচক বলেই অভিহিত করেন ফ্যাশনবোদ্ধারা।
এ বছর একটি বড় পরিবর্তন চোখে পড়ে কামিজের লেন্থে। গত কয়েক বছরে ছিল শর্ট কামিজের ট্রেন্ড। এ বছর ফ্যাশন চক্র ঘুরে আবার এসেছে লং ও সেমি লং লেন্থের কামিজের ট্রেন্ড।
বাংলাদেশের ফ্যাশন শিল্পে শুরু হয়েছে নতুন যুগের। সাম্প্রতিক বছরে এ শিল্পের কর্মক্ষমতা এবং সম্ভাব্য বাজার থেকে আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের অংশগ্রহণে সৃজনশীলতা দিয়ে আন্তর্জাতিক অনেক ফ্যাশন শোতে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল এবং হস্তশিল্প শিল্পের একটি উপকেন্দ্র। বাংলাদেশের অনেক ছোট শহরে হস্তশিল্পের কাজ এখনও নিয়মিত হচ্ছে। এখানকার ফ্যাশন ডিজাইনাররা সহজ এবং মার্জিত পোশাকের ডিজাইন করে থাকে। পোশাকের নকশায় তাদের স্বতন্ত্রতা এবং কমনীয়তা প্রশংসা অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণে। বাংলাদেশের ফ্যাশন এখন আর একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর জন্য নয়। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোর কল্যাণে তা এখন ছড়িয়ে পড়ছে সবার মাঝে। আর তাদের কাজে স্বদেশের ভাবনা অনুপ্রাণিত করছে দেশ এবং ভিন্ন দেশের মানুষকে।

No comments

Powered by Blogger.