আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো যৌক্তিক নয় by মুনাজ আহমেদ নূর

আজকে যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের দাবিগুলো যৌক্তিক নয়। আমরা তাঁদের প্রস্তাবনাগুলো সমর্থন করিনি। অনেক আগে থেকেই আমাদের এই প্রতিবাদ ছিল। সুতরাং এমন বলার কারণ নেই যে আজই আমরা এই উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতির বিপক্ষে গেছি।


আপনি যদি শিক্ষক সমিতির রেজ্যুলেশনগুলো দেখেন, সেখানে স্পষ্ট দেখতে পাবেন, অনেক নোট অব ডিসেন্ট আছে। প্রতিটি বিষয়কে তারা এমনভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলতে শুরু করেছে যে অনেকের পক্ষেই অবিশ্বাস করা সম্ভব নয়। স্পষ্টভাষায় বললে, তাদের মিথ্যাচার আজকে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। আমরা যে তাদের অযৌক্তিক ও ভুল সিদ্ধান্তগুলোর প্রতিবাদ অনেক আগে থেকেই করে আসছি সেটা প্রচারমাধ্যমগুলো জানতে পারছিল না। তাদের ওইভাবে জানাও নেই। দেখা গেল প্রচারমাধ্যমে একতরফা প্রচার হয়ে আসছে।
তাদের সামনে অন্য তথ্যও ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই এর একটা প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে পড়বে। একটা পর্যায়ে দেখা গেল তারা শিক্ষার্থীদেরও জিম্মি করে ফেলেছে। সে মুহূর্তে বিবেকের তাড়নায় আমাদের এগিয়ে আসতে হলো। আমরা তাদের উদ্দেশ্য ও ভুলগুলো মানুষের সামনে উপস্থাপনের প্রয়াস পেলাম। আজ প্রচারমাধ্যমে সত্যটা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
আমরা বলেছি, উপাচার্য মহোদয় যদি অন্যায় করে থাকেন, তাহলে তার পরিণতি তাঁকে ভোগ করতে হবে। সত্যের পক্ষে আমরা। বিচার হোক। বিচারে যদি তিনি দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। এখন প্রশ্ন হলো, কোনো বিচারই হয়নি, অথচ আপনি তাঁকে দোষারোপ করে বসে রইলেন। একটা মানুষকে যদি বিচার করার আগেই শাস্তি প্রদান করা হয়, তাহলে এ উদ্যোগকে কিভাবে মূল্যায়ন করা হবে? একজনকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করার আগে বিচার করতে হবে; তারপর রায় অনুযায়ী তাকে দোষী সাব্যস্ত করুন। আমরা বলেছি বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা। সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতি যদি তদন্ত কমিটিতে থাকেন, তাহলে আসল সত্য বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তারা এর ধারেকাছেও আসবে না। তাদের কথা হচ্ছে, ভিসি মহোদয় অন্যায় করেছেন। ঠিক আছে, তদন্ত কমিটির মাধ্যমেই তা প্রমাণ করতে হবে। অথচ তারা কোনো তদন্ত কমিটিকেই মানতে চাইছে না।
তারা আন্দোলনের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। উচিত ছিল সেই স্মারকলিপি প্রদানের পর কিছুটা সময় দেওয়া। তারা কোনো অপেক্ষাই করল না। আন্দোলন তীব্র করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেল। এমন পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, নির্দিষ্ট পথ বেয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
তাই তিনটি পয়েন্ট উপস্থাপন করতে চাই। প্রথম কথা হচ্ছে, সত্য অনুসন্ধান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে এবং তৃতীয়ত, ক্লাসে ফেরত যেতে হবে। আন্দোলন করলে তো ক্লাস চালিয়ে যাওয়ার পরও সম্ভব। অথচ ছাত্রদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করেছে তারা। এখানে উপাচার্য মহোদয়ের মাধ্যমে ৪৪ দিন ছুটি ঘোষণার প্রসঙ্গ আসে। তিনি এ কাজটি কেন করলেন জানি না। এখন এর পরিণাম ভোগ করছে শিক্ষার্থীরা। তাদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটল। তাই আমরা চাই অতিদ্রুত ক্লাস শুরু হোক। শিক্ষার্থীরা শিক্ষায় মনোনিবেশ করুক।
দলীয়করণের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখুন, চারজন পরিচালক আছেন কর্মরত। তাঁরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থক। যোগ্যতার প্রশ্নে ভিসি মহোদয় দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেননি। ছাত্রলীগের কথা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি নেই। বিচ্ছিন্নভাবে সমর্থক থাকতে পারে। একটা প্রমাণ দিই। বুয়েট কেন আর কোথায়ও এমন উদাহরণ আছে জানি না। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক ছাত্র সংগঠনের সদস্য হওয়ার পরও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। এই দৃষ্টান্ত কি দলীয়করণের? অথচ দেখুন অতীতের দিকে। আমাদের মেধাবী ছাত্রী সনি নিহত হলো। কই আজ পর্যন্ত তো বিচার হলো না? আরো বলতে চাই, ছাত্রলীগ করার কারণেই কেউ ছাড় পেয়ে যাবে- এটা কি ঠিক? সবাই জানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় একজন নেতা এখন কারাগারে। অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি এখন কারাবাস করছেন।
বলা হচ্ছে প্রোভিসির কথা। এমনো বলা হয়ে থাকে যে বুয়েটে কোনো প্রোভিসির পদ নেই। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এটা বড় ধরনের মিথ্যাচার। উপ-উপাচার্যের পদ সৃষ্টি হয়েছে ২০০১ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর সেই পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও সেই পদটি শূন্য থাকে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর একজনকে সেই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা আছে, যোগ্য বলে বিবেচিত যে কাউকে এই পদে নিয়োগ করা যাবে। সেই অনুযায়ী তাঁকে এই পদে বহাল করা হয়েছে।
অথচ বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হচ্ছে সবখানে। বলা হচ্ছে কোনো পদই নেই।
আসলে প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা করে কেউ কেউ আনন্দ পায়। সে জন্যই আজকে আন্দোলনের নামে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করা হচ্ছে। বুয়েটের সুনাম নষ্ট করা হচ্ছে। আমরা সত্য প্রকাশ করতে চাই। তাদের পক্ষে ১০০ জন শিক্ষক থাকলে আমাদের পক্ষে ৫০ জন হলেও আছে। আমরা মৌন মিছিল করার সময় পাঁচ শতাধিক মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে আমরা দুর্বল নই।
দেখুন আন্দোলনকারীরা ১৬টি দাবি উত্থাপন করেছে। সেগুলোর অধিকাংশই প্রশাসনিক। একাডেমিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ নেই বললেই চলে। তারা কিন্তু পদত্যাগের দাবি করেনি। এটা যোগ হয়েছে। আজকে তাদের কারণে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা পুষিয়ে আনার কথা বলছে তারা। তারা তো বিগত সময়ের ক্ষতিও পূরণ করেনি। আমি ক্লাস করতে চেয়েছি। আমি আশঙ্কা করছি, সত্য বলার কারণে আমাকে শিক্ষক সমিতি থেকেও বহিষ্কার করা হতে পারে। কিন্তু সত্য বলা থেকে আমি পিছু
হটব না।
গ্রন্থনা : মোস্তফা হোসেইন

No comments

Powered by Blogger.