সুন্দর, কর্মময় জীবনের প্রেরণা হয়ে থাকবেন-বিদায় স্থপতি মাজহারুল ইসলাম

আমাদের আধুনিক স্থাপত্যকলার পথিকৃৎ মাজহারুল ইসলাম এক পরিপূর্ণ ও সার্থক জীবনের প্রতীক। ৮৯ বছর পরমায়ু নয়, আরও কিছু সময় পৃথিবীর রূপরসগন্ধ, শিল্প ও মানুষের সাহচর্য উপভোগ বাড়তি হতো না। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই তাঁকে বিদায় নিতে হলো।


অমরলোকে চলে গেলেন তিনি, আমাদের জন্য রেখে গেলেন অনেক নান্দনিক সৃষ্টিকর্ম আর সুন্দর, কর্মময় জীবনবোধ। তাঁর আত্মা শান্তি লাভ করুক।
মানুষের কারিগরি কর্মকে নিরেট কৃত্রিম সৃষ্টির একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার স্বপ্নে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যভাবনায় যুক্ত হয়েছিল প্রকৃতি। যে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে, যা থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে মানুষ গড়ে তুলেছে তার সভ্যতা, শিল্পী মাজহারুল ইসলাম সেই প্রকৃতিকে দেখেছেন মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। নিরেট বাস্তুকর্মকে তিনি স্থাপন করেছেন প্রকৃতির মাঝে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের মনোরম নৈসর্গিক স্থাপত্যকর্ম তারই নিদর্শন। প্রবীণ স্থপতি শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ যেমনটি বলেছেন, মাজহারুল ইসলাম আধুনিক চারুকলার বিভিন্ন দিক ও আঙ্গিকের সমন্বয় ও সংমিশ্রণে সৃষ্টি করেছেন স্থাপত্যশিল্পের এক নতুন ধারা, যা তাঁর আগে আর কেউ এভাবে করেননি। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রকৃতই পথিকৃৎ।
প্রকৌশলবিদ্যার স্নাতক থেকে মাজহারুল ইসলাম নিজেকে উন্নীত করেছিলেন স্থাপত্যবিদ্যার স্নাতকোত্তর বিদ্যার্থীতে। তাঁর নান্দনিক চোখ ও মনের কাজ এখানেই শেষ হয়নি। তিনি সংগঠকও ছিলেন: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) স্থাপত্য অনুষদ প্রতিষ্ঠায় তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল, সেখানে তিনি কিছু সময় পড়িয়েছেনও, যদিও তিনি বুয়েটের শিক্ষক ছিলেন না। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন স্থপতি ইনস্টিটিউট।
বৃত্তি বা পেশার সীমা ছাড়িয়ে গেছে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের পরিচয়। তিনি শুধু স্থপতি বা শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন দেশ ও সমাজের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধসম্পন্ন একজন দেশপ্রেমিক। মাতৃভূমির প্রতি তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিষয় এবং ঘটনাবলির সঙ্গে সক্রিয় সংশ্লিষ্টতার মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবেও তাঁর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আমরা স্মরণ করি।
মাজহারুল ইসলামের শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে যে সুন্দর ও কর্মময় জীবনের দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য তা অমূল্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।

No comments

Powered by Blogger.