অরণ্যে রোদন-বুয়েটের দুই স্যার যা করতে পারেন by আনিসুল হক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আবারও সেই পুরোনো গল্পটিই বলতে হয়। কাজির কাছে বিচার এসেছে। একটা শিশুকে দুজন নারী নিজের সন্তান বলে দাবি করছেন। কেউই দাবি ছাড়েন না। কাজি বললেন, আনো তরবারি, দু টুকরো করো বাচ্চাটাকে, তারপর দিয়ে দাও দুজনকে দুই টুকরো।


একজন নারী বললেন, দরকার নেই বাচ্চাকে কাটার, আপনি ওকেই বাচ্চা দিয়ে দিন। কাজি বললেন, ইনিই হলেন প্রকৃত মা। একেই বাচ্চা দিয়ে দাও। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোরতর অচলাবস্থা। শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থীরা একযোগে আন্দোলন করছেন। তাঁরা চান বর্তমান উপাচার্য নজরুল ইসলাম ও সহ-উপাচার্য হাবিবুর রহমানের অপসারণ। (প্রথমে অবশ্য দাবিটি ছিল পদত্যাগ, এখন এটা অপসারণে এসে দাঁড়িয়েছে।) বুয়েটের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের অনেকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যা বুঝতে পারলাম, প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থী এখন এই দুজনের পদত্যাগ চান এবং এই লক্ষ্যে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। এই দাবিতে শহীদ মিনারে যে সমাবেশ হয়েছে, তাতে যে বিপুল উপস্থিতি, তাঁদের শপথ নেওয়ার যে দীপ্ত ভঙ্গি গণমাধ্যমে দেখলাম, তাতে মনে হয়, এই দুজনের পদত্যাগই এখন সমস্যার সবচেয়ে সহজ এবং হয়তো বা একমাত্র সমাধান। আর সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষকেরা এই দুজনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে প্রশাসনিক পদ থেকে, ডিন বা পরিচালকেরা নিজ নিজ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। যদি কোনো উপাচার্য বা সহ-উপাচার্যের ওপর তাঁর সহকর্মীদের আস্থা না থাকে, তাহলে তাঁর নিজেরই সেই পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত। এটা নিয়ম বা অনিয়মের প্রশ্ন নয়, এটা হলো স্বাভাবিক সম্মানবোধের প্রশ্ন, নৈতিকতার প্রশ্ন, কাণ্ডজ্ঞানের প্রশ্ন।
মাননীয় উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের উদ্দেশে বলা যায়, আপনারা কোনো অন্যায় বা অনিয়ম করেছেন কি করেননি, সেটা না হয় ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকুক, আপাতত পদ দুটো থেকে সরে যান। বলুন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো চাই, এর শিক্ষার্থীদের মঙ্গল চাই, তাঁদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত না হোক, সেটাই আমাদের কাম্য, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভালো চাই, তাঁরা যেহেতু অনাস্থা দেখিয়েছেন, তাই প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা পদত্যাগ করছি। এটাই হতে পারে বুয়েটের বর্তমান সংকটের সহজতম ও কার্যকর সমাধান।
বুয়েটে এই পরিস্থিতির উদ্ভব কীভাবে হলো, এটা কিন্তু বুয়েটের বাইরের মানুষকে বোঝানো একটু কষ্টকরই হবে। কারণ, যে ঘটনাগুলো শিক্ষকদের কিংবা অন্যদেরও ক্ষুব্ধ করেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেসব কর্মকাণ্ড হরহামেশাই ঘটছে। কিন্তু বুয়েটে এসব ঘটে না। সে কারণেই বুয়েট দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
ঘটনার শুরু সহ-উপাচার্যের পদ সৃষ্টি এবং সেই পদে নিয়োগ নিয়ে। সেটা প্রায় বছর তিনেক আগের কথা। তখন অধ্যাপক সফিউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি কোনো দলের লোক নন। হয়তো সে কারণেই একজন সহ-উপাচার্যের পদ সৃষ্টি করা হলো, আর সেই পদে ৫৮ জনকে ডিঙিয়ে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হলো। বুয়েটে সব সময়ই উপাচার্য পদে জ্যেষ্ঠতা ও একাডেমিক গুণাবলি বিচার করেই নিয়োগ দেওয়া হয়ে আসছে। কিন্তু এবার যাঁকে করা হলো, তিনি জ্যেষ্ঠতার বিচারে বলা যায় কনিষ্ঠ এবং তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা। এখানেই বাইরের লোকজন বলবেন, বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতাকেই যে সহ-উপাচার্য নিয়োগ করা হবে, সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? অন্য প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাভাবিক হলেও বুয়েটের ঐতিহ্য অন্য রকম। বুয়েটের বেলায় রীতি হলো, এ ধরনের পদায়নে জ্যেষ্ঠতা বিচার করা হয়ে থাকে সবার আগে। কাজেই বুয়েটের শিক্ষকেরা এই নিয়োগের প্রতিবাদ করেছিলেন নানাভাবে।
স্মরণ করতে চাই এবং করিয়ে দিতে চাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের কথা। সেখানে দলীয়করণের জন্য পূর্ববর্তী বিএনপি জোট সরকারের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল। স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল, ‘যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে’ (৫.৬)। বিগত নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (এখন বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্র) এক সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানে তিনি হাসিমুখে এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। বলেছিলেন, দলীয় পরিচয় বিবেচনা করে নয়, যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতেই নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে।
সরকার এই অঙ্গীকার কতটুকু রক্ষা করছে, সেটা সবার জানা। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা করার ফল কী হয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অচলাবস্থা হলো তার একটা স্পষ্ট উদাহরণ। প্রথমে সহ-উপাচার্য নিয়োজিত হলেন দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। এক বছর পর অধ্যাপক নজরুল ইসলাম উপাচার্য নিয়োজিত হলেন, যাঁর দলীয় আনুগত্যের কোনো তুলনা হয় না। বুয়েটের একজন খ্যাতিমান অধ্যাপকের সঙ্গে দুই দিন আগে আমার দেখা। আমি বললাম, ‘বুয়েটের এই সমস্যার সমাধান আমি জানি। নজরুল ইসলাম স্যারের চেয়ে কঠিন একজন আওয়ামী লীগারকে ভিসি বানিয়ে দিলেই তো হয়।’ সেই অধ্যাপক হেসে বললেন, ‘সে রকম কাউকে পাওয়া কঠিন হবে, নজরুল ইসলাম স্যারের চেয়েও কঠিন আওয়ামী লীগার পাওয়া সত্যি কঠিন।’ কিন্তু অধ্যাপক নজরুল ইসলাম যেহেতু জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের একজন, কাজেই তাঁর নিয়োগের সময় তেমন কোনো আপত্তি ওঠেনি।
তখন ওঠেনি, এখন উঠল কেন? নানা ধরনের অনিয়ম ঘটেছে, যা অন্য প্রতিষ্ঠানে হয়তো স্বাভাবিক, বুয়েটের জন্য অগ্রহণযোগ্য। ছাত্রলীগের একজন ছাত্র একটা বিষয়ে পরীক্ষা দেয়নি বলে অকৃতকার্য হবে, এটাকে পরিবর্তন করার একটা বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, তাতে অনিয়ম হয়েছে বলে স্পষ্টই প্রতিভাত হয়। http://www.scribd.com/doc/99422269/Report এই সাইটে সেই তদন্ত প্রতিবেদন আছে, আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন। বা বঙ্গবন্ধু পরিষদের একজন নেতাকে রেজিস্ট্রার বানানোর জন্য ভূতাপেক্ষ নামের একটা অদ্ভুত পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যার মানে, অনেক আগেই তাঁর পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্যতা ছিল, তাই একধাপ পদোন্নতি হলো। তারপর তাঁর আবার পদোন্নতি পাওয়া উচিত ছিল, কাজেই তাঁকে আবার পদোন্নতি দেওয়া হলো। এখন তিনি রেজিস্ট্রার বা ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদের যোগ্য হলেন, তাঁকে আবার পদোন্নতি দেওয়া হলো। ব্যাপারটা বেশ হাস্যকর আর খুব চোখে লাগার মতো। এ ধরনের ঘটনা ছোটখাটো নিয়োগের ক্ষেত্রেও হচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। বুয়েট তিনটি ক্ষেত্রে সততা ও সুনীতি বজায় রেখে আসছে—এক. শিক্ষক নিয়োগ, দুই. পরীক্ষার ফল, তিন. ভর্তি পরীক্ষা। বিভিন্ন কমিটিতে যাঁদের নেওয়া হয়, তাঁদের প্রধান যোগ্যতা বলে গণ্য করা হয় জ্যেষ্ঠতা। এই ঐতিহ্য এবার ভীষণভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছিল বলে শিক্ষকেরা অভিযোগ করছেন। এভাবে একটা-দুটো ঘটনা থেকে ১৬টা অভিযোগ, তা থেকে ক্ষোভ, শেষে ক্ষোভ পরিণত হয়েছে বিক্ষোভে। এখন বুয়েটে তীব্র আন্দোলন চলছে উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে।
উপাচার্য যা বলছেন, তাতে যে যুক্তি নেই, তা-ও বলব না। আরেকটা তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল, যদিও সেই তদন্ত কমিটিকেই শিক্ষক সমিতি গ্রহণযোগ্য মনে করেনি। কাজেই তাদের প্রতিবেদনও তারা মানছে না। উপাচার্য বলছেন, আচ্ছা, তাহলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করা হোক, দোষ পাওয়া গেলে তারপর পদত্যাগ। বিনা দোষে কেন আমি পদত্যাগ করব! কিন্তু শিক্ষক সমিতি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি চায় না। তারা চায় উপাচার্য আর সহ-উপাচার্যের পদত্যাগ।
এখন আমরা স্মরণ করব হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট লরেন্স সামারসের পদত্যাগের ঘটনাটা। ওই ভদ্রলোক খুবই ক্ষমতাবান ছিলেন। ছিলেন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ট্রেজারি সেক্রেটারি। ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর মতো পত্রিকা তাঁর সমর্থক ছিল। কিন্তু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন বা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ঘটনা ২০০৬ সালের। এর আগে ২০০৫ সালে একটা একাডেমিক বক্তৃতায় নারীরা কেন বিজ্ঞানে উচ্চপদে নেই, তার কারণ হিসেবে নারীদের বিপক্ষে একটা উক্তি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণায় ও উচ্চপদ গ্রহণে মেয়েদের ‘অ্যাপটিচুড’ নেই। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এই কথাকে নারীবিদ্বেষী হিসেবে বর্ণনা করে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। শিক্ষকদের সভায় তাঁর পদত্যাগের দাবি ভোটে তোলা হলে সেটাই গৃহীত হয়। লরেন্স সামারস তাঁর বক্তৃতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। হার্ভার্ডের আন্ডার গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরাও তাঁকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তাঁর সহকর্মীরা বলছেন তাঁর পদত্যাগ করা উচিত, কাজেই রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অন্যান্য যোগ্যতার শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও এই অর্থনীতিবিদ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ও সহ-উপাচার্য সেই দৃষ্টান্ত মাথায় রেখে সরে যেতে পারেন। আর এ ঘটনার শিক্ষা হলো—দলীয়করণ, দলীয় আনুগত্য শেষ পর্যন্ত বিপর্যয় ডেকে আনে। দলীয় বিবেচনা থেকে কম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে কোনো দায়িত্বশীল পদ দেওয়া হলে তিনি তাঁর অযোগ্যতা ঢাকতে খুব বেশি দলীয় সংকীর্ণ রাজনীতি দিয়ে পরিচালিত হন, সেটা বিপর্যয় ডেকে আনে। সেই বিপর্যয় ঢাকতে তিনি অধিকতর দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করতে থাকেন, সেটা আরও বড় বিপদই ডেকে আনে প্রতিষ্ঠানের জন্য, তাঁর নিজের জন্য, এমনকি দল ও সরকারের জন্য।
বুয়েটে যাঁরা এখন ভিসি-বিরোধী আন্দোলন করছেন, তাঁদের অনেকেই ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করেছেন। এঁদের অনেকেই আওয়ামী লীগের সমর্থক, এটা আমি ব্যক্তিগতভাবেই জানি। কিন্তু এঁরা সবাই বুয়েটের উজ্জ্বল ভাবমূর্তির পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে চান। আর ভিসি হওয়ার যোগ্য জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষই বেশি।
এটাকে দলীয় শক্তির মহড়ার ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে প্রতিষ্ঠানের ভালোমন্দ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি প্রধান বিবেচনা হিসেবে নেওয়া উচিত। জেদাজেদি নয়, সংকটের সমাধান চাই। সে জন্যই সেই কাজির বিচারের গল্প, নিজ সন্তানকে তরবারি দিয়ে দু টুকরো না করে প্রতিষ্ঠানটির স্বার্থেই ত্যাগের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এবার হয়তো ত্যাগটা উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যকেই করতে হবে। আর সেটা হলো, পদত্যাগ।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.