রাবিতে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে কর্মী খুন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক কর্মী নিহত হয়েছেন। তাঁর নাম আবদুল্লাহ আল হাসান সোহেল। রবিবার রাত ১২টায় ক্যাম্পাসে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান সোহেল।


এ ঘটনায় ছাত্রলীগের আট নেতা-কর্মীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
সংঘর্ষের পর রাতেই পুলিশ মাদার বখ্শ হলে তল্লাশি চালালেও কোনো অস্ত্র উদ্ধার বা কাউকে আটক করতে পারেনি। ঘটনার পর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা জানান, রবিবার রাতে মাদার বখ্শ হলের সামনে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হুসাইন বিপুর অনুসারীরা সভাপতি আহমেদ আলীকে উদ্দেশ করে কটূক্তি করে। এ নিয়ে দুই পক্ষের কর্মীদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। পরে উভয় পক্ষের কর্মীরা রামদা, হাঁসুয়া, রড ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। সভাপতি গ্রুপের কর্মীরা অবস্থান নেয় মাদার বখ্শ হলের দোতলার ছাদে এবং সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের কর্মীরা জড়ো হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ছাড়াও ২০-২৫টি গোলাগুলি হয়। এ সময় সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের কর্মী সোহেল কপালে গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে ও পরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সোহেল মারা যান।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মমিনুল ইসলাম জানান, সোহেলের কপালে গুলি লাগার কারণে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাঁর শরীরের অন্য কোথাও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
হামলায় জড়িত থাকার দায়ে ছাত্রলীগের আট নেতা-কর্মীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি হীরক ও আখেরুজ্জামান তাকিম, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিন, প্রচার সম্পাদক লিটন, উপদপ্তর সম্পাদক আতিক, উপপাঠাগার সম্পাদক সেতু এবং কর্মী তানিম ও কৌশিক। তবে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ দুই নেতাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে। তাঁরা হলেন সহসভাপতি আখেরুজ্জামান তাকিম ও সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিন। সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক শেখ রাসেল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন সোহেল। থাকতেন শেরে বাংলা হলের ৩০৭ নম্বর কক্ষে। বাড়ি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সাবদি গ্রামে। বাবার নাম আবদুস সালাম সরকার।
সোহেলের চাচা আবদুর রাজ্জাক বলেন, 'সোহেল ছিল বাবা-মায়ের বড় ছেলে। তাকে হারিয়ে এই মুহূর্তে আমরা শোকাহত। কিছুটা বিলম্ব হলেও এ ঘটনায় আমরা মামলা করব।'
রাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আহম্মদ আলী ও সাধারণ সম্পাদক আবু হুসাইন বিপু জানান, এটি দলীয় কোনো কোন্দল নয়। কিছু কর্মীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। তাঁরা জানান, ইতিমধ্যে সংগঠন থেকে আটজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। নিহত সোহেলের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
মতিহার থানার ওসি আনিসুর রহমান বলেন, 'দুই পক্ষের সংঘর্ষের খবর পেয়ে রাতেই আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছি। এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।'
সংঘর্ষ ও একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় গতকাল রাত সাড়ে ৮টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তবে ছাত্রলীগ ও সোহেলের পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করা হবে বলে জানা গেছে।
প্রক্টর চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়া জানান, ক্যাম্পাসে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন : উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সন্ধ্যায় সিন্ডিকেটের জরুরি বৈঠকে বসে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক আমজাদ হোসেন জানান, সংঘর্ষ ও একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় সিন্ডিকেটে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অধ্যাপক গোলাম কবীরকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ্র, মুন্সী মনজুরুল হক, জাফর সাদিক ও ডা. রুস্তম। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষ ও এক শিক্ষার্থী খুন হওয়ার প্রতিবাদ এবং ভিসির পদত্যাগ দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। একই দাবিতে তারা আজ শোকযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে প্রশাসন!
ছাত্রলীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষের পর রবিবার রাতেই রাবির আবাসিক হলগুলোতে তল্লাশি চালায় পুলিশ। গতকাল ভোর ৫টা পর্যন্ত তল্লাশিকালে হল প্রাধ্যক্ষ, প্রক্টর, রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারসহ শতাধিক পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তবে রাতভর এই তল্লাশির ফল শূন্য। মাদার বখ্শ হল থেকে কয়েকটি লাঠিসোঁটা ছাড়া ক্যাম্পাস থেকে আর কিছুই উদ্ধার হয়নি। সংঘর্ষে জড়িত কাউকে আটক করাও সম্ভব হয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, তল্লাশির আগ মুহূর্তে সংঘর্ষকারীদের হল থেকে পুলিশের সামনেই বের করে দেওয়া হয়।
মাদার বখ্শ হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, তল্লাশি শুরু হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে বিভিন্ন হল থেকে সংঘর্ষে আসা ছাত্রলীগকর্মীরা বেরিয়ে যায়। এ সময় হল গেটে কর্তব্যরত পুলিশ নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
শুধু এ ঘটনার ক্ষেত্রেই নয়, রাবিতে যেকোনো তল্লাশিতেই কোনো অপরাধী আটক বা অস্ত্র উদ্ধার হয় না। কারণ সংঘর্ষকারীরা তল্লাশির আগেই খবর পেয়ে যায় এবং তারা অস্ত্রশস্ত্র নিরাপদে সরিয়ে ফেলে। অভিযোগ রয়েছে, আগাম খবর সরবরাহ করে খোদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই।
রাবি শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি শিপন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এটা খুবই স্পষ্ট যে হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তল্লাশির আগেই এসব সস্ত্রাসীকে সাবধান করে দেয় এবং তাদের সহযোগিতা করে। এ ছাড়া চিহ্নিত কক্ষগুলোতে কর্তৃপক্ষ তল্লাশি চালাতে দেয় না। প্রশাসন এভাবে প্রশ্রয় দিলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তো বাড়বেই।
তবে মাদার বখ্শ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শেরেজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা তো রাত ১টার পর হল থেকে কাউকে বের হতে দিইনি। হয়তো সংঘর্ষকারীরা সংঘর্ষের পরপরই পালিয়ে গেছে। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় বা হল প্রশাসনের সম্পৃক্ততা নেই।'

No comments

Powered by Blogger.