বিদ্যুৎ উৎপাদন সংকটে-কাপ্তাই হ্রদের পানি অস্বাভাবিক হারে কমছে by কাজী মোশাররফ হোসেন

কাপ্তাই হ্রদের পানি অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। পরিমাপ অনুযায়ী (রুলকার্ভ) হ্রদে এ সময়ে পানি থাকার কথা ৮৭ ফুট মিন সি লেভেল (এমএসএল)। কিন্তু গতকাল শনিবার পর্যন্ত ছিল মাত্র ৭৬ ফুট এমএসএল। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি জেনারেটরের মধ্যে চারটি সচল থাকলেও পানির অভাবে পিক আওয়ারে দুটি জেনারেটর বন্ধ থাকে। ফলে সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন।


অনাবৃষ্টির কারণে হ্রদে পানি না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। খুব শিগগিরই পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. ফেরদাউস আলী হ্রদে পানি কমে যাওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, ‘রুলকার্ভ অনুযায়ী হ্রদে পানি থাকলে কমপক্ষে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু পানি না থাকায় পিক আওয়ারে বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ৭০ মেগাওয়াট।’
১৯ এপ্রিল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের চারটি জেনারেটর সচল রয়েছে। পরিমাপমতো পানি থাকলে ওই চারটি জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতো। কিন্তু এখন পানির অভাবে সীমিত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। চলতি মাসের পুরোটাই বৃষ্টি না হলে হ্রদের পানি ৬৬ ফুট এমএসএলের নিচে অর্থাৎ বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে যেতে পারে। আর পানির স্তর ওই পর্যায়ে নেমে গেলে এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।’
২০ এপ্রিল সরেজমিনে দেখা গেছে, কাপ্তাই হ্রদের প্রধান বাঁধের পাশে ছয়টি মিটারগেজের সবই পানির নির্ধারিত স্তরের ওপরে উঠে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিমাপ অনুযায়ী পানি থাকলে তিনটি মিটারগেজ পানির নিচে থাকত। এ ছাড়া যেসব পাহাড়ি টিলা এখন পানির নিচে ডুবে থাকার কথা সেগুলোর বেশির ভাগও পানির ওপরে উঠে আছে। কাপ্তাই-রাঙামাটি নতুন সড়কের আসামবস্তী সেতুর নিচে এখন ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল করার কথা থাকলেও সেখানে বর্তমানে পানি নেই। ওই জায়গায় এখন ধান রোপণ করেছেন কৃষকেরা।
হ্রদে পানি কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকটের পাশাপাশি নৌচলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। কাপ্তাই জেটিঘাটের বোটচালক সমিতির সভাপতি মো. তোফাজ্জেল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহীন বুলবুল জানান, বিলাইছড়ি, ফারুয়া, জুরাছড়ি, দীঘলছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌচলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে স্থানীয় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে।
ইঞ্জিনচালিত নৌকাচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘পানির অভাবে আমরা সব জায়গায় নৌকা চালাতে পারছি না। এতে আয় কমে যাচ্ছে। সংসারে টানাটানি চলছে।’
জানা গেছে, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, কাপ্তাই, রাঙামাটিসহ বিভিন্ন নৌপথে সেনাসদস্যদের নিয়মিত টহল দিতে হয়। হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় নিয়মিত টহল এমনকি স্বাভাবিক যাতায়াতেও মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে।
কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানায়, সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে, বিশেষ করে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি হয়। আর এই বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ে কাপ্তাই হ্রদে। প্রসঙ্গত, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি এবং চলতি মাসের ৯ ও ১০ এপ্রিল কিছুটা বৃষ্টি হয়েছিল। এতে প্রায় এক ফুট পানি রেকর্ড করা হয়। সূত্রমতে, ওই বৃষ্টি না হলে সংকট আরও তীব্র হতো।
সূত্র জানায়, এ ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য কর্ণফুলী নদী থেকে পানি কাপ্তাই হ্রদে নিয়ে (রিসাইকেল পদ্ধতি) বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার একটি ব্যবস্থা রাখা আছে। তবে ১৯৬০ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পর এ পর্যন্ত্ত পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই পদ্ধতি এখনো ব্যবহার করা যায়। তবে এতে খরচের তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এ কারণে পদ্ধতিটি ব্যবহার না করে বৃষ্টির দিকে চেয়ে আছে সবাই।

No comments

Powered by Blogger.