ভারতের বাজেটে বাংলাদেশ ইস্যু by গৌতম লাহিড়ী

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি রূপায়ণের জন্য সামগ্রিকভাবে সীমান্ত এলাকার জনসাধারণের 'উন্নয়নের' জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ৯৯০ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছেন অর্থমন্ত্রী অর্থ মন্ত্রণালয়ের খাতে। এমনকি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা ভেবে আগে থেকেই বাজেটে ৩০ কোটি রুপি বরাদ্দ করে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী


ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান যা, তাতে কোনোভাবেই প্রতিবেশীদের উপেক্ষা করে কোনো পরিকল্পনাই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয়। এটা আরও একবার প্রমাণিত হলো চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের সাধারণ বাজেট পেশের সময়। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় যে বাজেট পেশ করেছেন তার প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুমোদিত হবে মে মাসের ৩ তারিখে। ঠিক তারপরই তিনি বাংলাদেশ সফর করছেন। ফলে তার সফরের আগে বাজেট অনুমোদিত হওয়া অন্য প্রতিবেশীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের পক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ।
এ বাজেটে এমন কিছু উল্লেখ রয়েছে, যা তার ২৯ ফেব্রুয়ারি ভাষণে অনুলি্লখিত রয়ে গেছে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিশেষ করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দগুলোর উল্লেখ রয়েছে পৃথকভাবে বাজেটের সঙ্গে বিতরণ করা 'একসপেনডিচার বাজেট ২০১২-১৩'র দ্বিতীয় খণ্ডে। যেখানে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব পড়বে এ বাজেট রূপায়িত হলে। প্রথমেই ধরা যাক পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দে। গত ২০১১-১২ অর্থবছরের ১১২২.৭৩ কোটি রুপির তুলনায় ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রায় দ্বিগুণ ২০৪১ কোটি রুপি বরাদ্দ করার মূল কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ নদী উপত্যকা পরিচালন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব উলি্লখিত রয়েছে 'বাজেট ব্যয় দলিলের ব্যাখ্যা নেটে' (একসপেনডিচার বাজেট)। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১০৪ নম্বর খাতের ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'নদী উপত্যকা পরিচালনা ব্যবস্থা' নামে নতুন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে সীমান্ত এলাকার নদী পরিচালন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ পরিকল্পনা রূপায়িত হবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে। যার মধ্যে নেপাল-ভুটান-চীন ছাড়াও রয়েছে বাংলাদেশ। শুধু এ দুটি প্রকল্পের জন্য চলতি অর্থবছরে অর্থ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ রেখেছে ১২০ কোটি রুপি। তবে একটা কথা পরিষ্কার যে, এসব প্রকল্পের কথা উল্লেখ করলেও বাজেট দলিলে তিস্তা নদীর প্রসঙ্গ উল্লেখ নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ার দরুন এ প্রসঙ্গ রাখা হয়নি। তবে বাজেটে এবার এত বেশি অর্থ আগে থেকেই বরাদ্দ করা হয়েছে যে, তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে অর্থের কোনো সমস্যা হবে না। যেখানে পানি কমিশনের জন্য এবার অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ করা আছে। কেননা এ দলিলের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, 'অন্যান্য সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক চুক্তির জন্য অর্থ রাখা হয়েছে।'
দ্বিপক্ষীয় নদী সংক্রান্ত সহযোগিতার বিষয়ে এ দলিলে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি অনুসারে ফের পানিপ্রবাহের তথ্য সংগ্রহের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থাৎ গঙ্গার পানিপ্রবাহ নিয়ে ভারত তথ্যানুসন্ধানে সম্মত এ বাজেট দলিল প্রমাণ করছে। এমনকি শতদ্রু এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর জন্য চীন যে তথ্য সরবরাহ করবে তার জন্য মূল্য ধরে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সীমান্তের নদী পরিচালন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রায় দুইশ' কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে নেপালে নদী সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং গঙ্গা বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা রয়েছে এ দলিলে। গঙ্গা নদীর পাড়ের ভাঙন রোধের জন্য কয়েকটি নতুন এলাকায় যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে ভারত সরকারের। এর জন্য 'পৃথকভাবে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি করা হবে। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে কাজ হাতে নেওয়া হবে।' (পাতা ৩৬৪ ব্যয় বাজেট) এ ছাড়া ফারাক্কা ব্যারেজের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, গঙ্গা এবং পদ্মার ভাঙন রোধে কাজ হাতে নেওয়া হবে। এ জন্য বরাদ্দ ৩০০ কোটি রুপি এবং ফারাক্কার ভাঙা গেট মেরামতের জন্য রাখা হয়েছে ১৫০ কোটি রুপি।
কয়েকদিন আগে ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী পবন কুমার বনশাল সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশীদের আশ্বস্ত করেছিলেন, হিমালয়ের নদীগুলোর আন্তঃসংযোগ পরিকল্পনা রূপায়ণ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু তার মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রস্তাব অনুসারে অর্থমন্ত্রী বাজেট দলিলে ২০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছেন তাতে পানিসম্পদ বাড়ানোর গবেষণার জন্য 'রিভার বেসিন ট্রান্সফার অফ ওয়াটার' বাক্যটিও রয়েছে। এর জন্য 'ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্ট' তৈরির কথাও বলা আছে। এতে ফের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে প্রতিবেশীদের সঙ্গে। এমনিতেই আশঙ্কা রয়েছে সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের। ফলে অর্থমন্ত্রী যখন ঢাকা সফরে যাবেন তখন তাকে এ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি যখন দিলি্ল আসবেন তখন তাকেও এ বিষয়ে ভারত সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করে যেতেই হবে। একসপেনডিচার বাজেটের ৩৬৩ পাতার ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে এ নদীর পানিপ্রবাহ বদলানোর প্রসঙ্গ রয়েছে। নদী প্রটোকল স্বাক্ষর এখনও বাকি রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। এর জন্য বাংলাদেশ বাড়তি অর্থের দাবি জানিয়েছে। গত বছরের ৩ কোটি ২৭ লাখ রুপি এবার বাড়িয়ে ৪ কোটি ৪০ লাখ করার প্রস্তাব রয়েছে বাজেট বরাদ্দে। এ ছাড়া ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকার উন্নয়ন বাবদ এবার বাজেটে ৪৩১ কোটি রুপি রাখা হয়েছে। এতে কাঁটাতারের বেড়া ছাড়াও সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি রূপায়ণের জন্য সামগ্রিকভাবে সীমান্ত এলাকার জনসাধারণের 'উন্নয়নের' জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ৯৯০ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছেন অর্থমন্ত্রী অর্থ মন্ত্রণালয়ের খাতে। এমনকি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা ভেবে আগে থেকেই বাজেটে ৩০ কোটি রুপি বরাদ্দ করে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। এসব বরাদ্দ নিয়ে ভারতের সংসদে আগামী ৩ মে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তাতে এ বিষয়ে বরাদ্দ বাড়া বা কমে যাওয়ারও সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে চোখ রাখুন ওই দিনের জন্য।

গৌতম লাহিড়ী :সমকাল প্রতিনিধি

No comments

Powered by Blogger.