'ফিয়ার ফ্যাক্টর' by সুভাষ সাহা

ইলিয়াস আলী কোথায়? গোটা দেশ এখন তার উত্তর খুঁজছে। কেন ইলিয়াস আলীর মতো একজন মাঝারি গোছের রাজনৈতিক নেতাকে গভীর রাতে নিজের গাড়ি থেকে ড্রাইভারসমেত লাপাত্তা হতে হয়েছে, তা নিয়ে চলছে নানা কিসিমের বৈঠকি আলোচনা।


টেলিভিশনের টক শো এবং খবরের কাগজের প্রধান খবরের মধ্যে এখনও এ নিয়ে তোলপাড় চলছে।
এদিকে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার প্রতিবাদে বিএনপির ডাকা হরতাল শুরুর একদিন আগেই জ্বালাও-পোড়াও শুরু হয়ে যায়। শনিবার রাজধানী ঢাকায় বেশ কয়েকটি বাস পোড়ানোর খবর পাওয়া গেছে। খিলগাঁও এলাকায় অগি্নদগ্ধ বাসটির হতভাগ্য ড্রাইভার হরতাল সমর্থকদের লাগানো আগুনে পুড়ে মারা যান। এ যেন হরর ছবির মঞ্চায়ন। বাসটির সঙ্গে ড্রাইভারকেও পুড়ে মরতে হলো কেন! আসলে ফিয়ার ফ্যাক্টরকে রোববারে ডাকা হরতালকে সফল করার জন্য প্রয়োগ করা হয়েছে। একজন বাস ড্রাইভারকে পুড়িয়ে মেরে হাজার হাজার গাড়ির ড্রাইভারের মনে মৃত্যু আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হলো, যাতে কেউ হরতালের সময় গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার কথা চিন্তাও করতে না পারে। কিন্তু তারপরও কি গাড়ি নিয়ে কেউ বের হবেন না? হয়তো বের হবেন, তবে তাদের সংখ্যাটা হবে একেবারেই হাতেগোনা। তদুপরি যারা গাড়ি নিয়ে সদর রাস্তায় নামবেন তাদের সবসময় দোয়া-কালাম পড়তে পড়তে জান পকেটে পুরে চলতে হবে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে হরতাল আহ্বানকারীরা জনগণকে বুঝিয়ে দিতে চায় যে, সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা আধা-সামরিক বাহিনী গাড়িচালক ও গাড়ি চড়ে কর্মস্থলে যেতে ইচ্ছা পোষণকারীদের রক্ষা করতে পারবে না।
যুদ্ধাস্ত্রের বেলায়ও দেখা যায়, দেশগুলো প্রতিপক্ষের চাইতে তাদের অস্ত্র কতটা প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক তা নানাভাবে প্রচার করতে সচেষ্ট থাকে। এখানেও ফিয়ার ফ্যাক্টরকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের মনে ভয় জাগানোর কৌশল প্রয়োগ করতে দেখা যায়। অন্যদিকে নিজের সৈন্যদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য নানারকম কসরত চলে। রিগ্যানের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের 'স্টার ওয়ার' কর্মসূচির প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যায়। তখন এর সঙ্গে 'বাইনারি গ্যাস', 'নিউট্রন বোমা', 'সামরিক লেসার' এবং অন্যান্য আতঙ্ক উদ্রেককারী অস্ত্রশস্ত্রের গপ্পোও গোগ্রাসে গেলার মতো অসংখ্য পাঠক-শ্রোতা আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। কিন্তু দেখা গেল, এই স্টার ওয়ার কর্মসূচি কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, ওটা বাস্তবায়ন করতে গেলে আমেরিকার ওপর বিদ্যমান বায়ুর ওজোন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। আর নিউট্রন বোমা তো হলো ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী একটা অস্ত্র। কিন্তু তখন এসব অস্ত্রশস্ত্রের বিবরণ এমনভাবে প্রচার করা হলো তাতে গোটা দুনিয়া এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন কি তাতে আতঙ্কবোধ করেনি! স্টার ওয়ার কর্মসূচি পরিত্যাজ্য হলেও প্রচারণার জোরে এটি তখন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রশক্তিতে সোভিয়েত রাশিয়াকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্মারক হয়ে উঠেছিল। এতে বিশ্ববাসী বিশেষ করে ছোট-বড় সব দেশ আমেরিকার তথাকথিত অপরাজেয় শক্তি সম্পর্কে ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার ভাব প্রদর্শন করতে বাধ্য হয়েছিল (ফিদেল কাস্ত্রোর মতো কতিপয় বেয়াড়া ছাড়া)। এভাবে ফিয়ার ফ্যাক্টরকে রাষ্ট্র থেকে সমাজ, এমনকি ব্যক্তির ক্ষেত্রেও বিষফলের মতো কাজে লাগানো হয় এবং আগামীতেও হবে।
কিন্তু ঢাকায় বাস পোড়ানোর সঙ্গে একজন ড্রাইভারকেও পুড়িয়ে মারার কৌশলটা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী বলে দাবিদার রাজনৈতিক দলের পক্ষে শোভন তো নয়ই বরং আত্মঘাতী। গণতন্ত্রে জনগণের ভোটটাই যেহেতু সরকার পরিবর্তনের একমাত্র মাধ্যম, তাই জ্বালাও-পোড়াও ও হত্যা বা গুম-খুন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হতে পারে না।
ইলিয়াস আলী নিখোঁজ ইপিসোডে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া গেছে। ড্রাইভারকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় সাধারণের মনেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর চেয়ে বড় কোনো দুঃসংবাদ কি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে!

No comments

Powered by Blogger.