ইতি-নেতি-বাঙালির রাজনীতির হালখাতা by মাসুদা ভাট্টি

কেওড়াকান্দি ঘাট থেকে ফেরিতে উঠেই এক ভদ্রলোককে দেখা গেল, অনর্গল কথা বলছেন। পরনে ভদ্রোচিত পোশাক, মুখটা ঘামে চকচক করছে। হাসি হাসি মুখ করে ভদ্রলোক বলে চলেছেন, 'বাংলাদেশ খারাপ দেশ না, বাংলাদেশটা ভালো, আমরাই এই দেশটাকে খারাপ করছি। আমরাই রাজনীতি খারাপ করছি। আমরাই ঘুষ খাই।


আমরাই দুর্নীতি করি। আমরাই ধর্মের নামে ব্যবসা করি...।' গাড়ির ভেতর বসে লোকটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ভদ্রলোকের বলার ভঙ্গি অসাধারণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই লোক জমে গেল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ভদ্রলোককে কেউ চেনে না। তবে পাগল ধরে নিয়ে লোকজন তাঁর কথা শুনে হাসতে শুরু করল। প্রায় ঘণ্টা আড়াই, যতক্ষণ না ফেরি মাওয়া ঘাটে ভিড়ল, ততক্ষণ ধরে ভদ্রলোক কথা বলে গেলেন। আমি সত্যিই অবাক বিস্ময়ে ভদ্রলোকের কথা শুনলাম। ভদ্রলোকের কথার সারমর্ম একটাই, কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, নিজেদেরকেই অর্থাৎ 'আমাদেরকেই' আমাদের দোষ দিতে হবে। ফেরি ঘাটে ভিড়তেই শুরু হলো তোড়জোড়_কে আগে ফেরি থেকে নামবে, তার প্রতিযোগিতা। একটি প্রাইভেটকার ঘেঁষে একটি বড় বাস বেরিয়ে গেল। প্রাইভেটকারের আরোহী এবং চালক চিৎকার করেও বাসটি থামাতে পারলেন না। আবার জটলা। আমাদের নামতে নামতে দেরি হলো অনেকক্ষণ। ওপারেও যখন একটি ফেরি মাত্র ভিড়তে শুরু করেছিল, তখন ঘাটে কার আগে কে ফেরিতে উঠবে, তার প্রতিযোগিতা শুরু করতেই বিশাল এক জটলা তৈরি হলো। ফেরি থেকে গাড়ি নামতে দেরি হলো এবং সে কারণে উঠতেও। সেখানেও গেল ঘণ্টা আড়াই, কেবল ফেরিতে ওঠার জন্য, আবার এপারে এসে একই জটলা, নামতে আরো ঘণ্টাখানেক, সব মিলিয়ে শুধু ফেরি পার হতেই সময় লেগে গেল পাক্কা ছয়টি ঘণ্টা। এই যে বিশাল শ্রমঘণ্টা বিফলে গেল, এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে? কেউ না।
এর আগের আমলে, এমনকি এই আমলেও দেখা যায় যে ফেরিঘাটে অত বড় জাহাজকেও দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, একজন ভিআইপি ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছেন বলে, যাতে তিনি এসে সোজা ফেরিতে অপেক্ষা করতে পারেন। একদিকে তাঁর জন্য জায়গা রাখতে গিয়ে অপেক্ষমাণ অন্য যানবাহন ও তাঁদের যাত্রীদের দীর্ঘ জট তৈরি হয় অন্যদিকে যারা ফেরিতে জায়গা পেয়েছে, তাদের অবস্থা হয় আরো করুণ, তারা না পারে কিছু বলতে, না পারে সাঁতরে নদী পার হতে। যার কাছেই জিজ্ঞেস করুন না কেন, একই উত্তর, 'ভিআইপি আসছেন'। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল কোনো গণ-প্রতিনিধি কিংবা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রাজনৈতিক নেতাদের কেউ এসে উঠলেন তাঁর দীর্ঘ বহর নিয়ে। সাধারণ মানুষকে এই যে ভোগান্তির শিকার করে নিজেদের আয়েশ নিশ্চিত করার রাজনীতি_এটা কিন্তু বাইরের কেউ নয়, আমরা নিজেরাই করি। সাদা শার্ট পরা বক্তৃতারত লোকটির কথা বলতে গিয়েই ফেরিঘাটের এই অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গটি এল। আমার বিশ্বাস, বহু পাঠকেরই এ অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, সে অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।
পাঠক হয়তো ভাবছেন, রাজনীতির হালখাতা শিরোনামে কেন এ প্রসঙ্গ তোলা হলো? সংগত প্রশ্ন, আসলে ওই ভদ্রলোক, যাঁকে লোকে পাগল বলে হাসাহাসি করছিল, তাঁর কয়েকটি কথা, কয়েকটি বাক্য আমাকে এতটাই ধাক্কা দিয়েছে যে সেগুলো তুলে ধরার লোভ সামলানো গেল না। যেমন ভদ্রলোক বলছেন, 'আমাদের রাজনীতি খারাপ না, যদি খারাপ হতো তাহলে রাজনীতির মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা পেতাম না।' ভেবে দেখুন, কথাটা কতটা সত্যি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রথম থেকেই রাজনৈতিকভাবে বাঙালির মুক্তি অর্জনের কথা বলেছেন। একেবারে শেষ দিকে এসে তিনি বলেছেন, 'তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।' এ ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধিও কিন্তু রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে গণ্য। নয়? এর মানে হচ্ছে, রাজনীতির মাধ্যমেও মুক্তি সম্ভব। ভদ্রলোকের পরবর্তী বাক্যটি দারুণ। বলছেন, 'কিন্তু এই রাজনীতিকেও আমরা দূষিত করে ফেলেছি।' এই প্রমিত বাংলা উচ্চারণে ভদ্রলোক এমন একটি শব্দ চয়ন করেছেন, যা আসলে সুপারলেটিভ বা একেবারে কদর্য অর্থে আমরা ব্যবহার করে থাকি। ফেরার পথে বুড়িগঙ্গা পার হওয়ার সময় গাড়ির কাচ ওঠানো থাকা সত্ত্বেও যে ভয়ংকর দুর্গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উগরে আসতে চায় এবং ব্রিজের নিচে কৃষ্ণকালো জল দেখে রাজনীতির সঙ্গে ভদ্রলোকের 'দূষিত' শব্দের মিল খুঁজে পেলে, কাউকে দোষ দেওয়া যাবে কি?
যেকোনো দূষিত বস্তুই হয় ত্যাজ্য, নয় তাকে ব্যবহার উপযোগী করার কৌশল বের করাটাই সভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রাথমিক শর্ত। সেটা পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে হোক কিংবা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেই হোক। এখানে একটি কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি, ভদ্রলোকের 'দূষিত' শব্দের সঙ্গে সর্বাংশে একমত নই, বলা বাহুল্য। কারণ উন্নত বিশ্বের রাজনীতিও যে কলুষমুক্ত নয়, সে কথাও অভিজ্ঞতা থেকেই জানি। বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে মূলত দ্বিদলীয় যে গণতন্ত্র বিরাজমান, তা-ও অনেকটা 'কেনা-বেচার' বা পুঁজির বেসাতির নিগড়বন্দি। এ অবস্থা থেকে সেসব দেশকে যাঁরা মুক্ত করতে চান, তাঁরা সেসব দেশেও ফেরির এই ভদ্রলোকটির মতোই 'অপ্রকৃতিস্থ' বলে মানুষের হাসির পাত্র হন। কারণ সেসব দেশে মেইনস্ট্রিম পলিটিঙ্ বা মূলধারার রাজনীতি মানেই ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং তার বাইরে সবাই প্যারালাল বা সমান্তরাল। বাংলাদেশ সেদিক দিয়ে খানিকটা হলেও এগিয়ে আছে, এখানে এখনো মানুষ ভোটের রাজনীতিতে সম্পূর্ণই আস্থাশীল এবং উপযুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ পেলে তার প্রয়োগ ঘটাতেও দ্বিধা করে না। এর প্রমাণ পাকিস্তান আমলে যেমন পাওয়া গেছে, একালেও আমরা পাচ্ছি। তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির কথিত এই 'দূষিত' জিনিসটি কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের খুলতে হবে 'বাঙালির রাজনীতির হালখাতা'। এই খাতা হতে পারে ব্যক্তিগত, হতে পারে সামষ্টিক। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোও খুলতে পারে এই খাতা। প্রতিবছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অচলায়তনের তথ্যাদি থেকে বছর শেষে নতুন বছরে পা রাখার আগে সেসব বিচার-বিশ্লেষণ করে নতুন বছরের হালখাতায় পুরনো ভুলগুলোর যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ হবে সভ্যতার পথে আরো একধাপ এগোনোর পদক্ষেপ।
শেষ করি সেই সাদা শার্ট পরা এলোমেলো চুলের মধ্যবয়স্ক বক্তার কথা দিয়েই। 'আমরা চাইলেই পারি। আমরা চাই না'। আসলেই তো, আমরা চাই না। নইলে এই ফেরিঘাটেই যদি মানুষ একত্রিত হয়ে বলে, নিয়মানুযায়ী ফেরি যথাসময়ে ছাড়বে, কারো জন্য অপেক্ষা চলবে না, কোনো বাস একটি প্রাইভেটকারকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ সেই বাসের নম্বর দেখে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, ক্ষতিপূরণ আদায় করবে এবং সর্বোপরি আমরা, নিজেরাই যদি নিজেদের জন্য নিয়ম বেঁধে দিই, তাহলেই সর্বত্র এক নিয়মের শেকল তৈরি হবে, যে শেকল ধরেই আমরা বেরিয়ে আসতে পারব 'দূষিতে'র কারাগার থেকেই_এ শেকল পরেই শেকল মোরা করব রে বিকল। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।

লেখক : সম্পাদক, একপক্ষ

No comments

Powered by Blogger.