সময়ের প্রতিবিম্ব-ষড়যন্ত্রকারীরা আশপাশেই আছে by এবিএম মূসা

লিখতে বসলে মহা মুশকিলে পড়ি, এই সপ্তাহে কী নিয়ে লিখব। আবার কখনো ভাবি, কোনটি বাদ দিয়ে কোনটি আলোচনা করব। কখনো বা একটি বিষয় নিয়ে লিখতে বসলে হাজারো বিষয় মাথায় ঘুরপাক খায়, সব জট পাকিয়ে যায়। এই হপ্তার প্রতিবেদনটি শুরু করতেই শেষোক্ত সমস্যাটির উদ্ভব ঘটেছে।


লেখার বিষয় নিয়ে প্রাথমিক ভাবনাটি ছিল আড়িয়লে বিমানবন্দর নিয়ে যে নাটকটি হয়ে গেল, তা নিয়ে আদ্যোপান্ত আলোচনা করব। সেভাবেই শুরু করেছিলাম। এর মধ্যে এল বিএনপির উদ্দেশ্যহীন, এমন একটি ‘করার আছে করলাম’ হরতাল। তারপরে জাতীয় সংসদে যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবের বেসামাল অবস্থা। এ ছাড়া শেয়ারবাজারের বিধ্বস্ত অবস্থা, চলমান বিপর্যয় আর নিঃস্ব কিছু একটা করে খাওয়া যুবকের, হাজার-হাজার পরিবারের মর্মান্তিক ‘ব্যদনার’ কারণাসুন্ধান নিয়ে লেখাকে প্রাথমিক গুরুত্ব দেব ভাবছিলাম। অতঃপর সিদ্ধান্ত নিলাম, সপ্তাহান্তে যখন একটিই লেখা তারই সীমানার মধ্যে সারা সপ্তাহের সব ঘটনাই একটু-একটু করে কিছু না কিছু বলব। সর্বশেষ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সব দুর্ভোগ আর দুর্যোগের কারণ নির্ণয়ে বিএনপির ষড়যন্ত্রের সন্ধানলাভ আজকের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভণিতা ছেড়ে আড়িয়ল নিয়ে লেখার সূচনা করছি। প্রথম আলোর টিপু সুলতানের প্রশংসা করতে হয়—আড়িয়ল নামের একটি বিলে বিমানবন্দর স্থাপন দীর্ঘ প্রতিবেদনটির জন্য। টিপু নানা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে একটি তুঘলকি সিদ্ধান্তের বিভিন্ন দিক আলোচনা করেছেন। সেসব পড়ে আমি ভাবছিলাম, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আড়িয়লে বিমানবন্দর করার অবাস্তব পরিকল্পনাটি তাঁকে দিয়ে যাঁরাই অনুমোদন করিয়েছিলেন, তিনি তাঁদের মধ্যে ষড়যন্ত্রকারী খুঁজলেন না কেন? কারণ, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এটি ছিল প্রাথমিক ষড়যন্ত্র। সেটি নস্যাৎ করতেই তো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে সত্যিকারের জননেত্রী জনগণের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করেছেন। যে ষড়যন্ত্রটি তিনি ব্যর্থ করেছেন, সেটিতে বিরোধী দলের ভূমিকা কী ছিল? ভিটেমাটি রক্ষার আন্দোলনকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে একটিও স্লোগান দেননি। এমনকি সরকারি দলের প্রতিমন্ত্রী বা স্থানীয় সাংসদের পদত্যাগও দাবি করেননি। যা-ই হোক, আড়িয়ল বিল রক্ষা পেয়েছে, হাজারো পরিবারের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটেছে। সব ভালো যার শেষ ভালো, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কাছে ‘ষড়যন্ত্রকারীরা’, যারা দেশের একটি বিস্তৃত অঞ্চলকে বিস্ফোরক অবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল, তারা হার মেনেছে।
আমি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখার যে প্রাথমিক মুসাবিদা করেছিলাম তার শিরোনাম ছিল, ‘অনারেবল রিট্রিট, জনগণের আবেগের স্বীকৃতি দিয়ে সসম্মানে পশ্চাদপসরণ।’ কথাটি আমার কৈশোরকালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ের সমর-কৌশল বলে উল্লিখিত হতো। তবে আড়িয়ল বিল সমস্যার সমাধানে আমার সেই সময়কার আরেকটি সমর-কৌশলের উল্লেখ করার ইচ্ছা ছিল। চার বছরব্যাপী মহাযুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ে মিত্রপক্ষের কোনো বিশেষ রণক্ষেত্রে জয়-পরাজয়ের বর্ণনায় বলা হতো, ‘দে হ্যাভ লস্ট দি ওয়ার, বাট ওয়ান দি ব্যাটল, ছোটখাটো যুদ্ধে হারলেও চূড়ান্ত সমরে জয় হয়েছে।’ আড়িয়ল সম্পর্কেও বলতে চেয়েছিলাম, সরকারের কোনো এক অপরিণামদর্শী, ষড়যন্ত্রকারী বললাম না, উপদেষ্টা মহলের পরাজয় ঘটেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর জয় হয়েছে, তাঁর গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। জননেত্রী জনমতের প্রতি শ্রদ্ধার প্রশংসাটি আমার অতি উচ্ছ্বাসের প্রকাশ হতে পারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার সেই উচ্ছ্বাসে পানি ঢেলে দিলেন। তিনি বললেন, আড়িয়ল বিমানবন্দর নিয়ে সমস্যা সৃষ্টিতে নাকি বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র ছিল। প্রকারান্তরে বোঝালেন, তিনি যা করেছেন, তা আসলে বিরোধী দলের একটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছেন। যাঁরা স্থানীয় জনগণের মতামতের তোয়াক্কা করেননি, বিমানবন্দর স্থাপনের সম্ভাব্যতা ও প্রয়োজনীয়তা আগাম যাচাই না করে প্রধানমন্ত্রীকে একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ দিয়েছেন, সরকারকে একটি এলাকার বিপুল জনগণের সাংঘর্ষিক মুখোমুখি করলেন, তাঁদের মধ্যে কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোনো ‘ষড়যন্ত্রকারী’ খুঁজে দেখেছেন?
শেয়ারবাজারে ধস, হাজার হাজার বেকার যুবকের রাস্তায় বুক চাপড়ানো, লক্ষ-কোটি টাকা লুটপাট, নিঃস্ব শত শত পরিবার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর মধ্যেও বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক হলে ষড়যন্ত্রকারীদের শুধু বিরোধী দলে নয়, সর্বস্তরে খুঁজতে হবে। আমি টেলিভিশন টক শোতে, সংবাদপত্রের নিবন্ধে বারবার বলেছি, আমি শেয়ার মার্কেট বুঝি না। তবে যাঁরা মার্কেটের কারসাজি বোঝেন, ফাটকাবাজদের তথা বেকার যুবকদের হাজারো কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, যাঁরা তাঁদের চেনেন তাঁরা আমাকে পুরোনো জমানার রেলগাড়ির ডিব্বার গায়ে লেখা একটি সতর্কবাণী স্মরণ করিয়ে দিলেন। একসময়ে প্রতিটি কামরার ভেতরে লেখা থাকত, ‘চোর-জুয়াচোর নিকটেই আছে।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি বাদশাহ হারুনুর রশিদের মতো ছদ্মবেশে মতিঝিলে শেয়ারবাজারে ঘোরাফেরা করেন, তখনই তিনি ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ বিরুদ্ধে নাম ধরে দেওয়া ধিক্কারধ্বনি শুনতে পাবেন। সেসব নামধারীর গায়ে কি শুধু ধানের শীষের ছাপ আছে, নাকি নৌকা মার্কাটিও জ্বলজ্বল করছে, তা দেখতে পেতেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেই কেন শেয়ারবাজারে বিপর্যয় ঘটে? প্রশ্নটি আরও সহজভাবে করা যেত, ‘আওয়ামী সরকারের সাথেই তাদের আগমন আর প্রস্থান ঘটে কেন, কেনই বা ষড়যন্ত্রকারীরা আসা-যাওয়ার সুযোগ পায়?’
আমি বিশ্বাস করি, ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে যে সত্যানুসন্ধানী কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাঁরা অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর কাছে-দূরের ষড়যন্ত্রকারীদের শনাক্ত করতে পারবেন। বিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে ইব্রাহিম খালেদের কর্মক্ষমতা, আন্তরিকতা, অকুতোভয় চরিত্রের ওপর আমার সীমাহীন আস্থা। ১৫ আগস্ট এলেই আমার মনে পড়ে, এই সেই ইব্রাহিম খালেদ, বিএনপির প্রথম শাসনামলে যখন ১৫ আগস্টে আওয়ামী বীরপুঙ্গবেরা ঘরে বসে ছিলেন, তখন তিনি সরকারি পূবালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক হয়েও শোক দিবসে সারা দেশে একমাত্র মতিঝিলে কালো পতাকা উড়িয়েছিলেন। একই নির্ভীক চিত্ত নিয়ে তিনি শেয়ারবাজারের ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ মুখোশ খুলে দিতে পারবেন, নির্দ্বিধায় এ কথাটি বলতে পারি। তবে আশঙ্কা হচ্ছে, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এলে সেগুলো তাঁকে দংশন করবে না তো! কারণ, গ্রামদেশে শুনেছি, আসল গোখরো সাপ নাকি নিজের ভিটাতেই থাকে।
এবার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বিরোধী দলের অশুভ ভূমিকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগটি পর্যালোচনা করা যাক। অভিযোগ হচ্ছে, ‘খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে বিরোধী দল দ্রব্যমূল্য বাড়াচ্ছে।’ এত দিন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কয়েকটি অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা শুনেছি। সেগুলো ছিল বিশ্ববাজারে সব জিনিসের দাম বেড়েছে, সরবরাহ কমেছে, মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে ইত্যাদি। তদুপরি দুই বছর ধরে হরহামেশা সিন্ডিকেটের কথা শুনেছি। এসব সিন্ডিকেটের তথাকথিত সদস্যদের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী ঘন ঘন বৈঠক করে যাচ্ছেন। কখনো আবেদন-নিবেদন, কখনো মিনমিনে হুঁশিয়ারির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যবসায়ীদের সাধ্যসাধনা করছেন। অপরদিকে সর্বজনবিদিত ধারণা হচ্ছে, অসাধু ব্যবসায়ীরা দ্রব্য মজুদ করে দাম বাড়াচ্ছেন। খেতের মৌসুমি ধান মিলমালিকের গুদামে মজুদ হচ্ছে। একই সঙ্গে এই কথাটিও সবাই ভাবছিলেন, এসব মজুদদার আর মুনাফাখোর আসলে কারা? প্রধানমন্ত্রী সেই ভাবনার অবসান করে জানিয়ে দিলেন, ‘এরা সবাই বিএনপি তথা বিরোধীদলীয় ষড়যন্ত্রকারী।’ তাঁর এই বক্তব্য নতুন ভাবনার সূচনা করেছে। ঢাকার রাস্তায় যদি বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের পেটানো যায়, রাজনৈতিক সহিংস অথবা অহিংস কর্মকাণ্ডের জন্য ঢালাও গ্রেপ্তার করা যায়, মামলা-হামলা করা যায়; তবে বিএনপির সেই সব দুর্বিনীত মজুদদার-সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্রকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন?
বস্তুত জনগণের সব ভোগান্তি ও দুর্দশা লাঘবে সরকারের সব প্রচেষ্টা বিরোধী দলের ষড়যন্ত্রের কারণে ব্যর্থ হচ্ছে, এমন বক্তব্য জনগণকে একাধারে হতাশ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছে। বিগত নির্বাচনে পর্যুদস্ত, নখদন্ত খোয়ানো কোমরভাঙা বিএনপি মাত্র কয়েক মাসে কোন জাদুমন্ত্রে এত ক্ষমতাবান হয়ে গেল যে মাত্র দুই বছরে সরকারের অর্থনৈতিক সব কর্মকাণ্ডকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে? আসলে বিএনপি শক্তি সঞ্চয় করেছে, নাকি ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল বিশেষ কারণে বিব্রত বোধ করছে অথবা বেকায়দায় পড়েছে। ষড়যন্ত্রকারী চিহ্নিত করে কাকে শায়েস্তা করতে গিয়ে আবার কার গায়ে-না হাত দিয়ে ফেলেন। আপন-পর সব সিন্ডিকেট মজুদদার ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইতস্ততা বা অপারগতার এটিই কি কারণ?
সব প্রশ্নের আসল উত্তর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর দলেরই সংসদ সদস্য, অর্থনীতিবিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল। বুধবারের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারে নাজুক পরিস্থিতির জন্য বিএনপিকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যকে তিনি নিছক ‘রাজনৈতিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাই যদি হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আকাশছোঁয়া দামের কারণে বিপর্যস্ত জনজীবন, শেয়ারবাজারে ‘ষড়যন্ত্রের’ কারণে হাজারো পরিবারের আহাজারি, বিদ্যুৎ-পানির সংকটে দিশেহারা জনগণের ভোগান্তি, আড়িয়ল বিলে লাখো মানুষের ভিটেমাটি রক্ষার আর্তি—এ সবই সরকারের শুধু একটি হালকা রাজনৈতিক মন্তব্যের বিষয়? লোটাস কামাল নামে অধিকতর পরিচিত ও খেলার জগতের এককালের জনপ্রিয় সংসদ সদস্যের মতে, প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্রের কথা যদি বলেনও, ‘ডিড নট মিন ইট,’ জনগণ প্রধানমন্ত্রী কী বোঝাতে চেয়েছেন বা ‘মিন’ করেছেন, তা জানতে চায় না। তারা আপন-পর ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ কোথা থেকে খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন বা নেবেন, তা জানতে ও দেখতে পাবে, এমনটি প্রত্যাশা করে।
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

No comments

Powered by Blogger.