মাতৃভাষা-আমাদের ভাষাপ্রেম! by সৌরভ সিকদার

অনেক ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের মাতৃভাষা, বাংলা ভাষা—আমাদের গৌরব, আমাদের অহংকার। এই ভাষা একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েছে, এই ভাষা পৃথিবীর বুকে আজ বাংলাদেশ নামের একটি স্বতন্ত্র মানচিত্র এবং লাল-সবুজ পতাকার জয়তিলক পরিয়েছে। এই ভাষা আজ আমাদের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় ভাষা।


প্রায় ২৭ কোটি মানুষ এই বাংলা ভাষায় কথা বলে; যার মধ্যে ১৬ কোটি মানুষ বাস করে বাংলাদেশে। ১৯১৩ সালে এই ভাষার লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বকে। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ (ইউনেসকো) একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে বাংলা ভাষাকে বিশ্ববাসীর কাছে এক অনন্য গৌরবের আসন দিয়েছে। বাঙালির সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার যে প্রাত্যহিক জীবন, সেখানে বাংলা ভাষার বিকল্প নেই এ যেমন সত্য, তেমনি এও সত্য যে আমরা আজ আন্দোলন এবং অনেক ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলা ভাষা ছেড়ে বিশ্বায়ন আর আকাশ-সংস্কৃতির খপ্পরে পড়ে ডিজুস বাংলা প্রয়োগের এক নতুন সাংস্কৃতিক দাসত্বের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। এর জন্য আমাদের মনোজগতের ঔপনিবেশিক দায়ও কম নয়। অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রযুক্তির প্রসারের ফলে দেশে তড়িৎ গণমাধ্যমের যে অস্বাভাবিক বিকাশ ঘটেছে, তা বাংলা ভাষার বিকৃতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বিশেষ করে এফএম রেডিও (বেতার হওয়া উচিত ছিল) এবং টিভি চ্যানেল। নতুন প্রজন্মের অনেকে যে শুদ্ধ বাংলা বলতে পারে না, তার জন্য আমাদের পাঠ্যক্রম এবং ভাষা শিক্ষাব্যবস্থাও কম দায়ী নয়। এর সঙ্গে রয়েছে অকারণ ইংরেজিপ্রীতি। ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ কোনো দোষের নয়, কিন্তু সেই সংস্কৃতিতে আসক্ত হওয়া দোষের। উচ্চ মধ্যবিত্তের অনেকেই ইংরেজিকে আভিজাত্যের সংস্কৃতি মনে করেন। এ থেকেই সম্প্রসারিত হচ্ছে ‘বেংলিশ’ সংস্কৃতি। কিন্তু একবারও ভেবে দেখি না, ইংরেজি আমাদের দরকারের ভাষা, প্রাণের ভাষা নয়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রতিধ্বনি তুলে বলতে হয়—মাতৃভাষা ছাড়া কখনোই যথাযথ জ্ঞানার্জন সম্ভব নয়।
মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম লিখেছিলেন, ‘বঙ্গে জন্মগ্রহণ করে যারা বাংলা ভাষাকে হিংসা করে তাদের জন্মপরিচয় নিয়ে সন্দেহ আছে।’ উনিশ শতকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইংরেজি, গ্রিক, ল্যাটিন, ফরাসি শিখে ইংরেজি ভাষার বায়রন-মিল্টন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। শেষে ফিরে এসেছিলেন মাতৃভাষার ক্রোড়ে, বলেছিলেন, ‘এ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন’। মধুসূদন যেমন বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি এ ভাষা তাঁকে অমর করে রেখেছে। আর আজ একুশ শতকে এসে বাংলা ভাষার অহংকার, বাঙালির পরিচয় এবং বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে যারা ইংরেজির ঢঙে বাংলা বলে, স্বপ্নে-জাগরণে আহারে-অনুষ্ঠানে যারা ইংরেজিকে ‘মম জন্ম সার্থক’ মনে করে, তাদের জন্য সম্ভবত নতুন কবিতা লেখার সময় এসেছে।
সবকিছু যেমন আইন করে ঠিক করা যায় না, তেমনি কখনো কখনো রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হয়। প্রয়োজনে নতুন আইন তৈরি করে জনগণকে বাধ্য করতে হয়। রাস্তাঘাট, গাড়ি, অফিস, দোকানের নামফলক থেকে শুরু করে জাতীয় জীবনের প্রায় সর্বস্তরে কেন অপ্রয়োজনে ইংরেজির প্রয়োগ হবে? কার পড়া বা জানার জন্য এ ভাষা? যদি প্রচার বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে হয়, তা হলে আমার প্রশ্ন, বাংলায় লিখলে বেশি মানুষ বুঝবে, না ইংরেজিতে লিখলে বেশি মানুষ বুঝবে? নিঃসন্দেহে বাংলায়। তাহলে কেন এই অকারণ ইংরেজিপ্রীতি? প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আজাদের ভাষায় বলতে হয়—‘কত টাকা জমলে বাংলাকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে করে’?
ফরাসি, জার্মানি, জাপানিদের ভাষার প্রতি ভালোবাসার এমনকি ভাষা নিয়ে বাড়াবাড়ির কথাও আমরা জানি। জনসংখ্যা, অর্থ, প্রযুক্তিক্ষমতা—এদের সব আছে, কিন্তু মাত্র অর্ধকোটি মানুষ নিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে ডানস্ক ভাষাভাষীরা (ডেনিশরা) কীভাবে নিজের ভাষাকে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রয়োগ করছে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। এদের দোকানে এমন কোনো পণ্য নেই, যার মোড়কে ডানস্ক ভাষা লেখা নেই। দোকান-অফিস-সড়কের নামফলকে কোথাও ইংরেজির নাম-গন্ধ নেই, অথচ ৯০ শতাংশ ডেনিশ ইংরেজি জানে মাতৃভাষার মতোই। ছাপার অক্ষরে যে দাপ্তরিক পত্র এরা পাঠায়, তার সবই ডানস্ক ভাষায়। এমনকি প্রাপক বিদেশি হলেও এরা ইংরেজিতে লেখে না। এখানে অবস্থানকারী বিদেশিদের তাই পত্রের পাঠোদ্ধার করতে স্থানীয়দের শরণাপন্ন হতে হয়। আর আমাদের দেশে রাস্তাঘাটে ইংরেজির ছড়াছড়ি।
প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, আবেগ-উচ্ছ্বাস জাগে, ফেব্রুয়ারি এলেই শহীদ মিনার ভরে যায় ফুলে ফুলে, নতুন নতুন বাংলা বইয়ের গন্ধে ভরে ওঠে একুশে বইমেলা। ছোট কাগজ আর দৈনিক পত্রিকাগুলো পাল্লা দিয়ে প্রকাশ করে ক্রোড়পত্র। তড়িৎমাধ্যমের পর্দায় শুধু শহীদ মিনারের ছবিই নয়, ভাষার প্রতি অনুরাগে নির্মিত হয় অসংখ্য অনুষ্ঠান, সেখানে আমরা পাঞ্জাবি পরে ভাষার অহংকারে বুক ফুলিয়ে উপস্থিত হই, শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে চেষ্টা করি। একুশ এলেই রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা, অধ্যাপক, সাংবাদিকসহ সব পেশার মানুষ ফুল হাতে খালি পায়ে শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে একসুরে গাই, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...।
অথচ ফেব্রুয়ারি যেতে না-যেতেই বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে সংবাদপত্র থেকে তড়িৎমাধ্যমে ভুল বানান, অশুদ্ধ উচ্চারণ আর ডিজুস বিনোদনের ভাষা। অকারণ ইংরেজিপ্রীতির শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে চেষ্টা করি বাংলাকে কীভাবে বিকৃত করলে ইংরেজির মতো শোনা যায়। মধ্যরাতে বেসরকারি বেতার তরঙ্গের কথাবন্ধুরা মেতে ওঠে বাংলার সঙ্গে কতটা ইংরেজি মেশালে ভালো ‘বেংলিশ’ খিচুড়ি হবে, তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। আমাদের তথাকথিত নাগরিক মানসিকতায় বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে দরিদ্র, অশিক্ষিত আর অসম্মানের ভাষা।
ফেব্রুয়ারি যেতে না-যেতেই আমাদের রাজনীতিবিদেরা ভুলে যান বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য দেওয়া তাঁদের প্রতিশ্রুতি, আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ভুলে যায় সংবিধানে বাংলা ভাষা নিয়ে কী লেখা আছে, আমাদের গবেষক-অধ্যাপক-সাংবাদিকেরা ভুলে যান তাঁদের দায়িত্ব। ফেব্রুয়ারি গেলেই আবার আমাদের ঘাড়ে ভর করে সেই ঔপনিবেশিক ভূত। বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে ‘গেঁয়ো’ মানুষের ভাষা।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
jeweel1965@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.