চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষাঙ্গনে রক্তপাত বন্ধ হবে কবে? by আমিনুল ইসলাম

৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের সংঘর্ষে দুজন মারা গেছেন এবং অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। নিহত দুজন শিক্ষার্থীর প্রথম পরিচয়, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তার পর তাঁরা রাজনৈতিক কর্মী।
কিন্তু শুধু দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুই শেষ কথা নয়, ঘটনার ব্যাপকতা অনেক বেশি।


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে হল খালি করার নির্দেশ দেয়। হল খালি করে দেওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা আশ্রয়হীন হন। কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী আশ্রয় নেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)। কয়েকটি দৈনিকের প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, শিবির সন্দেহে চুয়েটের হলে আশ্রয় নেওয়া তিন শিক্ষার্থীকে পিটিয়েছে ছাত্রলীগ। বিভিন্ন হল থেকে শিবিরের বই, লিফলেট ও বিভিন্ন কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর ফলে চুয়েটেও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অটো’ বলে একটা শব্দ প্রচলিত আছে। এর অর্থ স্বঘোষিত ছুটি। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই এই ছুটি ঘোষণা করেন। ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা ‘অটো’ নিয়েছেন এবং কর্তৃপক্ষ ওই দিন অনুষ্ঠেয় সব পরীক্ষা স্থগিত করেছে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, দুটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই ক্ষতি হয়েছে, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)—দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান চট্টগ্রামের দুই প্রান্তে। কিন্তু দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে চবি থেকে চুয়েটের হলে আশ্রয় নিতে আসেন চবির তিন শিক্ষার্থী। যে কারণে শিক্ষার্থীদের চবি ছাড়তে হয়েছে, সেই নিয়ামক তো প্রায় সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে। চবির তিনজন শিক্ষার্থীকে চুয়েটেই কেন আশ্রয় নিতে হলো? কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। চবির তিন শিক্ষার্থী চুয়েটের হলে প্রবেশের পরপরই অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মূল্য দিতে হয়েছে চুয়েটের সব শিক্ষার্থীকে। চুয়েটে ছাত্রলীগ ও শিবিরের সংঘর্ষের কোনো নজির নেই। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে চবির ঘটনার দায় এসে পড়েছে চুয়েটেও।
যেখানে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ হচ্ছে, সেখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী চুয়েটের হল কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই হলে প্রবেশের কারণ প্রশ্নবিদ্ধ। সমপ্রতি যুদ্ধাপরাধের কারণে জামায়াতের নেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচার শুরুর পর জামায়াত ও শিবিরের কর্মকাণ্ড অনেক বেশি সমালোচিত হয়েছে। সংঘর্ষের আশঙ্কায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কদিন আগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এরপর চবির ঘটনার সূত্র ধরে চুয়েটের এই ঘটনা থেকে সারা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চক্রান্তের ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। এসব ঘটনার প্রভাব ব্যাপক ও বিস্তৃত।
প্রতিটি ঘটনার পরপরই দেখা যায় প্রতিপক্ষ গ্রুপটি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পাল্টা হামলা চালায়। খুনের বদলে খুন, এ সংস্কৃতিই চলে আসছে। গত ২৪ বছরে শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হয়েছে ১৭ শিক্ষার্থী। এভাবে শিক্ষার্থী খুন হওয়ার ঘটনা কিসের ইঙ্গিত দেয়? রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে এখন আধিপত্য আর দখলদারিই সম্ভবত বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলেতে আদৌ কি শিক্ষার পরিবেশ আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা আসেন জ্ঞান অর্জনের জন্যই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিহত শিক্ষার্থীরা যে রাজনৈতিক দলেরই হোক না কেন, তাঁরা তো বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী, এ দেশেরই নাগরিক। তাহলে তাঁদের অকালে প্রাণ দিতে হলো কেন? একজন বিবেকবান সচেতন মানুষের মনে এ প্রশ্ন জেগে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘাতের ঘটনার প্রভাব পড়ে চট্টগ্রাম শহরেও। শিবির হরতাল ডেকে গাড়ি ভাংচুর করেছে। সংঘর্ষ হয় চট্টগ্রাম শহরেও। এর ফলে শহরতলির জনজীবনের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় পর্যায়ে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন অনেক পরিণত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সামর্থ্য অনেক বেশি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এত বছরেও তার পরিচয় মেলেনি। বিভিন্ন কারণে (অধিকাংশই রাজনৈতিক) ছাত্রহত্যার ঘটনা অনেক ঘটেছে। কিন্তু এর সুষ্ঠু বিচার বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও সেটিও হয়েছে বিতর্কিত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে থাকে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন রাজনীতির কাঁটাতারেই বন্দী হয়েছে বারবার। কিন্তু এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়া কোনো বিবেকবান মানুষই মেনে নিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব আইনের মাধ্যমে স্বাধীনভাবেই পরিচালিত হয়ে আসছে। খুনের দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপরও বর্তায়। কিন্তু এভাবে আর চলতে পারে না। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই হবে, ক্যাম্পাসে রক্তপাত বন্ধ করতে হবে। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমান্তরাল অবস্থানে এসে দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে এটাই আমাদের কাম্য।

 আমিনুল ইসলাম: পরিবেশ ও সমাজকর্মী, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।
aminul.didar@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.