জীবিকার সন্ধানে

জীবিকার টানে মানুষ সাত সমুদ্র তেরো নদীও পাড়ি দেয়। তারপর ভিনদেশে মানিয়ে নেওয়ার লড়াই। বাংলাদেশে আসা বিদেশি ফুটবলারদের মাঠের বাইরের গল্প তুলে এনেছেন মাসুদ আলম ইসমাইলের মা এখন কেমন আছেন? ছেলে হারানোর শোকে হয়তো এখনো কাতর।


রুয়ান্ডার ফুটবলার ইসমাইল গত মৌসুমে মোহামেডানে এসেছিলেন। হঠাৎ একদিন গুরুতর অসুস্থ হলেন। সাদা-কালো কর্মকর্তাদের ফোন করে ইসমাইলের মায়ের অনুরোধ, তাঁর ছেলেকে যেভাবেই হোক যেন দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ইসমাইল ফিরে যাওয়ার পরদিনই ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।
ফুটবল খেলে জীবন চালাতে হবে—অসুস্থ শরীর নিয়েও তাই হয়তো এ দেশে আসতে বাধ্যই হয়েছিলেন। ইসমাইলরা যতটা ফুটবলার, তার চেয়ে বেশি শ্রমজীবী। জীবিকার দায় মেটানোই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সত্যিই তাই। বাংলাদেশ এখন জীবিকার বড় ভরসা একঝাঁক আফ্রিকান ফুটবলারের কাছে। অল্প টাকায়, কখনো কখনো পেটে-ভাতে তাঁদের অনেকে ফুটবল খেলতে বাংলাদেশে আসেন। কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলতে দ্বিধা করলেন না, ‘দু-চারজন ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ আফ্রিকানই আসছে জীবিকার টানে।’
খেলোয়াড়-সংকট চলছে দেশে। তাই ক্লাবগুলো ‘সস্তা’ দামের বড় শরীরের আফ্রিকানের ওপর নির্ভর করছে। এঁদের আসা এজেন্ট বা স্বদেশি কারও হাত ধরে। তারপর ভিনদেশের জল-হাওয়ায় মানিয়ে নেওয়ার লড়াই শুরু। একটা দল থাকে—অবৈধভাবে, চার-পাঁচ হাজার টাকায় সারা দেশে খেপ খেলাই তাদের পেশা। আরেক দল শীর্ষ ক্লাব ফুটবলে খেলছে। বড় দলের ‘ভাগ্যবানদে’র অবস্থা তুলনামূলক ভালো। বাকিরা দীনহীন।
ঠিকমতো পারিশ্রমিক না পাওয়াটাই এই খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ছোট ক্লাব তো বটেই, অনেক বড় দলও সময়মতো বেতন দেয় না। গত মৌসুমে মোহামেডানের নাইজেরিয়ান এমেকা-বুকোলারাই এর বড় ভুক্তভোগী। তাই কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ক্ষোভ-দুঃখে ম্যাচ বয়কটের পথে হাঁটতেও বাধ্য হন তাঁরা।
আবাহনীর ‘ঘরের ছেলে’ ঘানাইয়ান স্ট্রাইকার ইব্রাহিম বলছিলেন, ‘আমাদের অনেকেই সময়মতো টাকা পায় না। ছোট ক্লাবগুলো নানা ঝামেলায় ফেলে। ফুটবল আমাদের পেশা। ঠিকমতো পেমেন্ট না পাওয়া খুবই দুঃখজনক ঘটনা।’
তবু আসা থেমে নেই। মুক্তিযোদ্ধায় মরক্কান সামির ওমারি সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পাঁচ দিন আগে ঢাকায় হাজির। আর এখানে এসে ছটফট করেন পরিবারের জন্য। ভিন্ন পরিবেশে ‘জীবনসংগ্রামে’ অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকেই। দেখার কেউ থাকে না। তবু ঝাঁকের কইয়ের মতো ট্রায়াল দিতে আসা, না টিকলেও অনেকে থেকে যান। বাংলাদেশের মানুষ কাজের সন্ধানে যেভাবে বিদেশে থেকে যান, এঁরাও এক অর্থে তা-ই। অল্প দিনেই চিনে ফেলেন পথঘাট। রিকশাচালক ভাড়া বেশি নেবে! সম্ভবই নয়!
ক্লাবের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, অনেকে বিয়ে বা পারিবারিক প্রয়োজনে অগ্রিমও নেন। বড় ক্লাব বিষয়টা মানবিকভাবে দেখে। আসার সময় অনেকের সঙ্গে বুটও থাকে না। ৫০ ডলারের জন্যও গোঁ ধরেন। এমনও আছেন মাসে ক্লাব থেকে বিশ-পঁচিশ হাজার টাকা পান।অনেকে মাসে পাঁচ-সাতশ-এক হাজার ডলারে খেলেন। এখন অবশ্য অঙ্কটা খানিক বাড়ছে। তবে বড় দল তিন-চার হাজার ডলারও দিচ্ছে মাসে। বুকোলা-সামাদ-ড্যামিরা বড় দলে খেলার সুবাদে বাড়ি-গাড়ি করেছেন দেশে।
ব্যক্তিজীবনে আফ্রিকানরা অন্তর্মুখী। সুখ-দুঃখের সাতকাহন বলতে চান না। রক্ষণশীল বাংলাদেশে অনেকেরই মানিয়ে নিতে সমস্যা। ব্যক্তিভেদে অনেক নাইজেরিয়ান একটু বেপরোয়া। ক্যামেরুন, ঘানাইয়ানরা তুলনামূলক শান্ত-ভদ্র। অনেকে নামাজ পড়েন—রোজা রাখেন।
থিতু হলে রান্নাবান্না নিজেরাই করেন। গরুর মাংস, মাছ—সবই খান তাঁরা। টমেটো একটু বেশি, ঝালটা কম। মূল খাবার লবণ ছাড়া সুজি সেদ্ধ করে সঙ্গে একটা কলা। এটা নাকি আফ্রিকানদের প্রিয় খাবার।
বাংলা শিখে গেছেন অনেকেই। আবাহনীর মিডফিল্ডার প্রাণতোষ হাসতে হাসতে বললেন, ‘ইব্রাহিম প্রায় আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘টুমার পরিবারের লোকেরা কেমন আছে? বা-লো?’
ইব্রাহিমের দ্বিতীয় স্ত্রী থাকেন হল্যান্ডে, একবার এসেছিলেন ঢাকায়। এ বছর আবাহনীর অধিনায়ক আরেক ঘানাইয়ান ইউসুফ সামাদ সম্প্রতি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আগের ঘরের একমাত্র ছেলেকে প্রতি মাসে ১০০ ডলার করে দেন সামাদ।
অনেকে এখানে বিয়ে পর্যন্ত করছেন। দেশের এক শীর্ষ গোলরক্ষক জানালেন, ‘আফ্রিকানদের একটা অংশ বসুন্ধরায় থাকেন। রহমতগঞ্জের বাঙ্গুরা বিয়ে করে ফেলেছেন সেখানে। মেয়েটা ঝামেলায় পড়ে আমার কাছে এসেছে। এই আফ্রিকানদের অনেকে এখন সামাজিক সমস্যা।’
স্যালিসু নামের এক আফ্রিকানের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল হোটেলে। নানা কাণ্ড ঘটিয়ে কেউ থানা-হাজতও ঘুরে এসেছেন। মাঠের বাইরে এঁদের অনেকে সমস্যাও বটে।
সেটি বাইরের দিক। তবে এই খেলোয়াড়েরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ। ডিওএইচএস মাঠে প্রতিদিন সকালে ৩০-৪০ জন একসঙ্গে অনুশীলন করেন। নতুন কেউ এলে আর্থিক সাহায্য, খাওয়ানো—সবই করান তাঁরা।
এই খেলোয়াড়দের অনেকেই প্রথম বছরটা মাঠে থাকেন মোটামুটি উজ্জ্বল, এরপর বেশির ভাগই ম্রিয়মাণ। বুকোলা, ড্যামি, সানডেরাই যেমন, এঁরা মোহামেডানে প্রথম আসার পর আদর-যত্ন সেভাবে পেতেন না। আরামবাগের ৫০ টাকার বিরিয়ানি খাওয়ানো হতো। এখন অনেক টাকা পেয়ে মাথা ঘুরে গেছে, আগের ঝলক নেই—ঠাট্টা করে বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধার এক খেলোয়াড়। গতবার চোখকাড়া ব্রাজিলিয়ান এভারটন এবার শেখ জামালের বেঞ্চে। বাংলাদেশের এক টিভি অভিনেত্রীর সঙ্গে নাকি ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
তবে নাড়ির টান ভুলতে পারেন না এঁরা। মুক্তিযোদ্ধায় আসা দুই ব্রাজিলিয়ান রাফায়েল-লিমা আলাদা করে দুটি ইন্টারনেট সংযোগ নিয়েছেন (ক্লাব দিতে চেয়েছে একটি)। একজন যখন মায়ের সঙ্গে কথা বলবেন, আরেকজনের মা যদি ঘুমিয়ে পড়েন!
অভিজ্ঞতা বলছে, এ দেশে ‘দামি’ খেলোয়াড় থাকে না। তেমনই একজন ব্রাদার্সে আসা মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কার খেলোয়াড় বোসাইক। হরতালের দিন ঢাকায় এসে গাড়ি না দেখে ভাবলেন, বাংলাদেশ খুব গরিব দেশ। নীরবেই ওই রাতে বিদায় নেন তিনি!
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, খেপ খেলা খেলোয়াড়েরা নিজেদের পাসপোর্টে মদ-বিয়ার কিনে বিক্রি করেন ক্লাবে। এটাই তাঁদের ব্যবসা। ‘বুড়ো’ লোলেনচি, লাইবেরিয়ার ডলি, নাইজেরিয়ার ভিক্টররা এই দলের নেতা। রামপুরা বনশ্রী, নর্দা, মধ্য বাড্ডা, উত্তরায় পাঁচ-সাতজন মিলে ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন। পরিচিতজনদের দেখলেই নাকি বলেন, ‘বান্ধু, খেপ দিচ্ছ না কেন?’
এই আফ্রিকানরা বাজারে গিয়ে কম দামের পাঙাশ মাছ কেনেন। ‘১০০ তাকা দিব না’ বলে কম দেন মাছবিক্রেতাকে। বিক্রেতা চিৎকার করতে থাকেন—বনশ্রীতে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন একজন।
জীবিকার বাহন ফুটবলে চড়ে সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে আসা সবার জীবনেই তো লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো গল্প।

নাইজেরিয়ান মিছিল
২০০৭ সালে পেশাদার লিগ চালুর পর এ পর্যন্ত নিবন্ধিত বিদেশি ফুটবলারের সংখ্যা ২৬৫। মৌসুম অনুযায়ী সংখ্যা ৪৭, ৫২, ৫৫, ৪৬ ও ৬৫। পাঁচ মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ৮৭ জন নাইজেরিয়ান খেলেছেন এই লিগে। মৌসুমওয়ারি হিসাবটা এ রকম—১২, ১৩, ১৫, ১২ ও ৩৫। ঘানার ফুটবলার ৩৩ জন, লাইবেরিয়ার ৩০ জন, মরক্কোর ২৪ জন, গিনির ২৩ জন, ক্যামেরুন ও উগান্ডার ১৬ জন ও কেনিয়ার ৬ জন। টোগো, সুদান, কঙ্গো, সেনেগাল, মিসরের ফুটবলারও আছেন এই মিছিলে। অনিবন্ধিত আফ্রিকানের তো হিসাবই নেই। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কোরিয়া, ইরান, সার্বিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের ফুটবলারও এসেছেন। তবে আফ্রিকান ফুটবলারের মেলার কাছে অনুপাতটা একেবারেই নগণ্য।

No comments

Powered by Blogger.