শ্রদ্ধাঞ্জলি-আমাদের মুক্তির নায়ক

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ২৫ মার্চ। কিন্তু অনেকের জানা নেই যে এই স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে তখনকার তুখোড় বাঙালি মেজর মইন চৌধুরী জয়দেবপুরের সেনা-বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান নায়ক। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জাঁদরেল ব্রিগেডিয়ার আরবাবের আদেশ অমান্য করে জয়দেবপুরে বাঙালি জনতার ওপর গুলি বর্ষণ করতে অস্বীকার করেন তিনি।


তাঁর এই দেশপ্রেম ও সাহসিকতার কথা একদিন ইতিহাসের অংশ হবে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ‘জয়দেবপুর বিদ্রোহের’ ওপর গবেষণা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বিদ্রোহী বাঙালি সেনা অফিসার মেজর মইনের অবদান সত্যিকার অর্থে স্বীকৃতি পাবে। মেজর মইন ও তাঁর অকুতোভয় সহযোদ্ধাদের অবদান বাঙালি জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।
আমি যত দূর জানি, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারি কাজ ছাড়া দু-এক দিনের জন্যও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মেজর মইন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে কোথাও যাননি। আরাম-আয়েশ ছিল তাঁর জন্য হারাম।
একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক, অত্যন্ত সৎ, বিবেকবান, অকুতোভয়, স্পষ্টভাষী ও জনস্বার্থে নিবেদিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী বীর বিক্রম গত বছরের ১০ অক্টোবর বুকে অনেক অভিমান নিয়ে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ‘প্রিয় বাংলাদেশ’ ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন।
সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী বীর বিক্রম প্রথম বাঙালি সেনানায়ক, যিনি সেনা-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বিদ্রোহ করেন এবং আমরা মনে করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের মহানায়কদের অন্যতম তৎকালীন মেজর মইন।
তিনি তাঁর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন—‘আত্মসম্মান, স্বাধীনতা ও দেশের জন্য ১৯৭১ সালে জীবনের নয়টি মাস মুক্তিযুদ্ধে কাটিয়েছি। ওই সময় শত কষ্টের মধ্যে একমুহূর্তও এর জন্য অনুশোচনা হয়নি। বরং আত্মত্যাগের মহান ভাবনা আর গর্ব নিয়ে এগিয়ে গেছি একধরনের মানসিক তৃপ্তির মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীতে ও ১৬ বছরের কূটনৈতিক জীবনে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু আর কখনো ফিরে পাইনি মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে অনুভূত সেই গর্ব, আত্মতৃপ্তি ও আনন্দ।’
উপরিউক্ত বই উৎসর্গ করেছেন ......‘আমার মা .....আমার মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ফলে অবর্ণনীয় কষ্ট সইতে হয়েছে....... এবং সেই সব মায়েদের, যাঁরা তাঁদের সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছেন।’
তাঁর দ্বিতীয় বইটির নাম দেশটা কেমন করে এমন হল। এ বইটি উৎসর্গ করেছেন ...‘প্রিয় বাংলাদেশকে’। তাঁর অনেক মূল্যবান লেখা প্রধান দৈনিক জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো বই আকারে প্রকাশ করে যেতে পারেননি। বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠকে, ব্যক্তিগত আলাপ বা টেলিভিশন আলোচনায় তিনি যত বক্তব্য দিয়েছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। দেশের কথা, সাধারণ নাগরিকের বঞ্চনার কথা, সামাজিক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, এক কথায় স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের মালিক নাগরিক অধিকারের কথা। বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে মর্যাদা নিয়ে চলার কথা। তিনি ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থকে ঘৃণা করতেন।
তাঁর দ্বিতীয় বইয়ে লিখেছেন ... ‘সাম্প্রতিক বাংলাদেশে দেশপ্রেমের অভাব, দেশ ও জনগণের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ, সামাজিক-চারিত্রিক মূল্যবোধের অধঃপতন এবং সুবিধাবাদীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। দেশের এই পরিস্থিতির কারণে আমাকেও কিছুটা মূল্য দিতে হয়েছে। কিন্তু এর জন্য আমার কোনো আফসোস নেই। কারণ, আমি আমার বিবেকের স্ফুলিঙ্গ নিভে দিতে দিইনি...নৈতিকতার মহাসংকটে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন কাজ। আমি সেই কঠিন কাজটিও করার চেষ্টা করেছি। আর সে জন্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। আমার তৃপ্তির জায়গাটা সেখানে, আমি আমার বিবেককে দূষিত ও হাতকে নোংরা করিনি।’
জেনারেল মইন চৌধুরী নিজেকে দলীয় রাজনীতি বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিতে কখনো জড়াননি। তিনি সারা জীবন নিজেকে দেশপ্রেমিক ‘ক্যারিয়ার সোলজার’ হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান। অনেকেই জানেন, মইন চৌধুরী সেনাপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা রাখতেন; কিন্তু তাঁর গভীর দেশপ্রেম, সততা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা এর জন্য অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তা বলতেন; যা বলতেন, তা করতেন। তিনি নানা চাপ-প্রলোভনের মুখেও সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিতে রাজি হননি। তাই তাঁকে মূলধারা সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে প্রায় ১৬ বছর প্রেষণে পাঁচটি দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যেখানেই গেছেন, সেখানেই তিনি বাংলাদেশের জন্য সুনাম অর্জন করেছেন।
২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাননীয় উপদেষ্টা হিসেবে অত্যন্ত সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
‘প্রিয় বাংলাদেশ’ নিয়ে তাঁর ভাবনার শেষ ছিল না। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি প্রতিনিয়তই তাঁকে ব্যথা দিত। তাঁর মেধা-মননে স্বাধীন বাংলাদেশের করুণ পরিণতি জীবনের শেষ দিনগুলোতে আরও বেশি পীড়া দিত।
আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দুর্ভাগা দেশে জেনারেল মইন চৌধুরীর মতো মেধাবী, সজ্জন, সাহসী ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের আরও বেশি বেশি অবদান রাখা যখন প্রয়োজন, তখনই তিনি অকালে চলে গেলেন। আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সবাই দারুণভাবে তাঁর অভাব ও শূন্যতা অনুভব করছি।
তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও অভিবাদন জানাচ্ছি।
এম মুহিবুর রহমান

No comments

Powered by Blogger.