একুশের চাওয়া একুশের পাওয়া-জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ by ফারুক চৌধুরী

১৯৭৪ সালে আমি লন্ডন হাইকমিশনে ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ওই বছরের জুন মাসে ছুটি কাটাতে ঢাকা আসি। প্রথা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে যেতেই তিনি আমাকে তিনটি কাজের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ সম্পৃক্ত হওয়ার আদেশ দিলেন।


প্রথম হলো, বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) সমুদ্র সীমারেখা সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনার জন্য যে দলটি যাচ্ছে, আমি যাতে সেই দলের সদস্য হিসেবে রেঙ্গুন (ইয়াঙ্গুন) যাই, জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঢাকা সফর সম্বন্ধে আমি যেন বাংলাদেশ দলের সদস্য হিসেবে যোগ দিই এবং বঙ্গবন্ধুর আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে আমাকে তাঁর সহগামী হতে হবে। বললেন, ‘আমাদের লোকবল কম, অর্থের স্বল্পতা রয়েছে, অতএব তুমি যখন কাছে রয়েছ, এই কাজগুলো তোমাকে করতে হবে।’
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ প্রদানের জের টেনেই ওই কথাগুলো মনে পড়ল। যখন আমরা বঙ্গবন্ধুর নিউইয়র্ক জাতিসংঘ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, একদিন তদানীন্তন পররাষ্ট্রসচিব ফখরুদ্দিন আহমদ আমাকে বললেন, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রণয়নে নাকি সেই সময়কার তথ্য প্রতিমন্ত্রী অহেতুক আগ্রহ প্রদর্শন করছেন। বাংলা ভাষায় নাকি তাঁর ভালো জ্ঞান রয়েছে এবং যেহেতু বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে জাতিসংঘে বাংলা ভাষায়ই তিনি তাঁর বক্তব্য দেবেন, সেই মন্ত্রীপ্রবর নাকি বাংলায় খসড়া একটি ভাষণ ইতিমধ্যে পেশ করেছেন। পরে জানলাম, বঙ্গবন্ধু নাকি তাঁকে দিয়েছিলেন পত্রপাঠ (এই ক্ষেত্রে ভাষণ পাঠ!) বিদায়। তিনি তাঁর ভাষণে কী বলতে চান সেই সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রসচিব ফখরুদ্দিন ও আমাকে একটি ধারণা দিলেন। একদিন ভোরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষণটি নিয়ে ফখরুদ্দিন আহমদ আর আমি বঙ্গবন্ধুর দপ্তরে হাজির হলাম। কক্ষে বসে গভীর মনোযোগের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পড়ছেন আমাদের খসড়া ভাষণটি। এমন সময়ে তাঁর কামরায় প্রবেশ করলেন বাংলাদেশ বিমানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বঙ্গবন্ধু মুখ তুলে তাকালেন তাঁর দিকে।
কর্মকর্তার প্রশ্ন, ‘স্যার, আপনার নিউইয়র্ক যাত্রায় বিমানে কী ধরনের খাবার পরিবেশন করব?’ সাধারণত মুখর বঙ্গবন্ধু এবার বাক্যহারা! আমতা আমতা করে বললেন, ‘আমি কী জানি? ডাল, ভাত, মাছ দিয়ো আর কি। যেকোনো কিছু।’ প্রসন্ন কর্মকর্তা বুঝলেনই না যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি বঙ্গবন্ধুর মনোযোগ প্রদানে হানি ঘটিয়েছেন।
আবার প্রধানমন্ত্রী মনোনিবেশ করলেন খসড়া ভাষণ পাঠে। কিছুক্ষণ পরই আবার খুলল দরজা। এবার ইউনিফর্ম পরা, পুলিশের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা। অভিবাদন জানালেন প্রধানমন্ত্রীকে। ‘হ্যাঁ, বলো, কী ব্যাপার?’ ভাষণ পাঠে বাধাপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর প্রশ্ন। পুলিশ কর্মকর্তার জিজ্ঞাসা, ‘স্যার, আজ বিকেলে দুর্গতদের সাহায্যার্থে অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের যে প্রদর্শনী ফুটবল খেলা হতে যাচ্ছে, তার নিরাপত্তায় কারা রইবেন। রক্ষী বাহিনী না পুলিশ?
অবাক বঙ্গবন্ধু। তাঁর সামনে উপবিষ্ট ফখরুদ্দিন আহমদ আর আমিও অবাক। ‘এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার আমি ছাড়া সরকারে কি আর কেউ নেই?’ মর্মাহত প্রধানমন্ত্রীর যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন। অবস্থা বেসামাল বুঝেই আবার স্যালুট জানিয়ে বিদায় নিলেন কর্মকর্তা। সেদিন প্রশ্ন জেগেছিল মনে, এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? সান্নিধ্যকামী আমলার বহর, না বঙ্গবন্ধুর উদারতা? মেলেনি উত্তর!
ভাষণ পাঠ শেষে প্রধানমন্ত্রী তাকালেন আমাদের দিকে। বললেন, ‘ভালোই তোমাদের ফরেন অফিসের বক্তৃতা। কিন্তু আসল কথাই যে লেখোনি। দেশে যে দুর্ভিক্ষ হতে যাচ্ছে, সে কথাই তো আমি জাতিসংঘে “বলবার চাই”। আমাদের সমস্যার কথা বিশ্ববাসী আমার মুখ থেকেই শুনুক। তোমাদের সংশয় কেন?’ ডাক পড়ল সাঁটলিপিকার রোজারিওর। তাৎক্ষণিকভাবেই বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতায় সন্নিবেশিত হলো নিম্নোক্ত কথাগুলো। ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের অগ্রগতি শুধু প্রতিহত করেনি—দেশে প্রায় দুর্ভিক্ষ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’
বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আরও একটি অংশের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তাঁর নিজের উদ্যোগেই তিনি কথাগুলো বলেছিলেন ‘আমরা শান্তিকামী বলে এই উপমহাদেশে আমরা আপস-মীমাংসানীতির অনুসারী। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের অভ্যুদয় উপমহাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার সহায়ক হয়েছে এবং অতীতের সংঘাত ও বিরোধের বদলে আমাদের তিনটি দেশের জনগণের মধ্যে কল্যাণকর সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। আমরা আমাদের মহান নিকট প্রতিবেশী ভারত, বার্মা ও নেপালের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছি। অতীত থেকে মুখ ফিরিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টায়ও লিপ্ত রয়েছি।’ বঙ্গবন্ধু ছিলেন আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী। তাঁর জাতিসংঘের ভাষণের এই অংশটি ছিল ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে কলকাতায় তাঁর বক্তৃতারই প্রতিধ্বনি।
আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নিউইয়র্ক পৌঁছালাম ২৩ সেপ্টেম্বর। বঙ্গবন্ধু ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁর ভাষণ প্রদান করবেন। যেহেতু বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ইংরেজি তরজমাটি আমাকেই পড়তে হবে, ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরেই ছুটে গেলাম জাতিসংঘ ভবনে তাৎক্ষণিকভাবে ইংরেজি তরজমাটি বলার কারিগরি দিকটা রপ্ত করার জন্য। জাতিসংঘের কর্মীরা আমাকে দেখিয়ে দিলেন, দোভাষীর ‘বুথে’ বসে কীভাবে তরজমাটি তাৎক্ষণিকভাবে পড়ে যেতে হয়। বুকের সাহস কিছুটা বাড়ল। তারপর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর কামরায় দরজা বন্ধ করে রিহার্সেল। তিনি বাংলায় তাঁর ভাষণ পড়ছেন এবং তাঁর সঙ্গে গতি বজায় রেখে বিড়বিড় করে আমিও ইংরেজি তরজমাটি বার দুয়েক পড়লাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘যেহেতু তোমার ইংরেজি তরজমাটিই সিংহভাগ মানুষ শুনবে, তুমি মনে করবে তুমিই প্রধানমন্ত্রী।’ তারপর তাঁর চোখ টিপে সেই মিষ্টি হাসি। বললেন, ‘অবশ্য কেবলমাত্র বক্তৃতা চলাকালীন সময়ের জন্য!’ আমার মনে পড়ে ভাষণ শেষে তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখায় তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি নাকি ভালো বক্তৃতা দিয়েছ!’ তারপর পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘শাবাশ’।
আমার কূটনীতিক কর্মজীবনে তা ছিল একটি অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক মুহূর্ত। কখনোই তা ভোলার নয়।

No comments

Powered by Blogger.