‘আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি’- স্কুল মাদ্রাসায় বই বিতরণ উসব by মহিউদ্দিন আহমদ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী নুুরুল ইসলাম নাহিদ, শিক্ষা সচিব ডক্টর কামাল নাসের চৌধুরী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ডা. আফসারুল আমিন, ভারপ্রাপ্ত সচিব এমএম নিয়াজউদ্দিন, স্কুল টেক্সট বুক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোস্তফা কামাল উদ্দিন, বাংলাদেশের সকল জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিসার, হাজার হাজার স্কুল এবং মাদ্রাসার শিক্ষকবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক কোটি কোটি অভিনন্দন, ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ জানাই চাচাতো ভাই শাহ আলমকেও। শাহ আলম বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক। আমাদের জিএম হাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিল ২৫ বছর আগে। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে তার দুষ্ট বন্ধুরা তাকে ‘কমরেড’ শাহ আলম ডেকে ‘টিজ’ করে থাকে।
বাংলাদেশের স্কুল-মাদ্রাসাগুলোতে বছরের প্রথম দিন, গত ১ জানুয়ারি তারা ২৭ কোটি বই বিতরণ করেছেন বা বিতরণের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
আমাদের এই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ান যে গত ৩০ বছরে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে গেল এবং এখনও এগিয়ে যাচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে শিক্ষা খাতে তাদের বিনিয়োগ। চীন এবং ভারতও যে এমন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তার পেছনেও রয়েছে শিক্ষা খাতে তাদের বিনিয়োগ। মাও সে তুংয়ের আমলে সেই ৫০, ৬০ ও ৭০-এর দশকে ‘ক্যাপিটালিজম’ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চীন কেমন ঘৃণা করত, তা আমরা যারা ৭০-এর আশে-পাশের বয়সী তারা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন লাখ লাখ চীনা ছাত্রছাত্রী, লাখ লাখ ভারতীয় ছাত্রছাত্রী ভারতে এখন যেসব ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি আছে, তার অনেকগুলোয়ই বিশ্বমানের। ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে এই ইনস্টিটিউটগুলোর অবদান সারা দুনিয়াতেই স্বীকৃত।
গত কয়েক বছর ধরে বই বিতরণ কর্মসূচীর মাধ্যমে যে থ্রাস্ট, পুশ সরকার দিয়ে যাচ্ছে, তার প্রতিফলন অবশ্যই আছে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও। নতুন নতুন আবিষ্কার দিয়ে আমাদের স্কুল-কলেজে শিক্ষাপ্রাপ্তরা দেশজুড়ে সুনাম-সুখ্যাতি হয়ত তারা অর্জন করছে না; কিন্তু গ্রামগঞ্জে ছোটখাটো উদ্যোগ নিয়ে তারা কৃষিতে, মাছের খামারে, শিল্প খাতে অবশ্যই অবদান রাখছে, পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী ভারতীয় বাঙালী অমর্ত্য সেন তো সেদিন শুধু শুধু বলেননি, সবগুলো সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চাইতে এগিয়ে আছে।
শিক্ষা খাতে এমন গুরুত্ব অব্যাহত থাকলে, পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার মান উন্নয়নেও মনোযোগ দিলে, কয়েক বছর পর তার আরও বড় প্রতিফলন আমরা আমাদের সমাজ, অর্থনীতির সব সেক্টরেই দেখতে পাব বলে দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি। ভারতের কেরালা রাজ্যে শিক্ষার হার সবচাইতে বেশি, আর এই রাজ্যে জনসংখ্যা, জন্মহার নিয়ন্ত্রণও বেশি সফল; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও অনেক রাজ্যের চাইতে সেখানে বেশি। শ্রীলঙ্কায় শিক্ষার হার প্রায় শতভাগ। প্রায় ২৫ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের অবসানের পর এখন তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দ্রুতহারে বাড়বে বলে মনে হচ্ছে।

॥ দুই ॥
গত ২ জানুয়ারি দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম এবং প্রধান শিরোনামটি ছিল ‘চার কোটি শিক্ষার্থীর জন্য ২৭ কোটি বিনামূল্যের বই : পাঠ্যপুস্তক উৎসব’। ৬ কলামের এই শিরোনামে ‘পাঠ্যপুস্তব উৎসব’ শব্দ দুটি লাল হরফে। সাথে ৫ কলামের বড় এক রঙ্গীন ছবিÑ এক কিশোরী তার দুই হাতে দুটি বই তুলে ধরে দেখাচ্ছে, পেছনে আরও অনেক কিশোরী। তাদের হাতেও বই। বই হাতে সবাই হাসছে, লাফাচ্ছে, দৌড়ছে, ছুটছে; যেন, ‘আলোর স্নোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি।’ বাংলাদেশের প্রতিটি স্কুলে ৪ কোটি প্রজাপতি আনন্দে ভেসে বেড়িয়েছে বছরের এই প্রথম দিনটিতে। টিভি চ্যানেলগুলোর খবরে আমার মনে হয়েছে, এই প্রজাপতিগুলো ঈদের দিনের মতই আনন্দ-উৎসব করছে। এমন পবিত্র, স্বর্গীয় দৃশ্য দেখলে আবেগাপ্লুত হতেই হয়। বিশেষ করে আমাদের মতো প্রবীণদের; বই সম্পর্কিত স্মৃতি আমাদের অনেকেরই মধুর ছিল না। সেই পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে কয়জন মানুষ তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারত? স্কুলের বেতন, বই কেনার টাকা, খাতা-পেন্সিলের খরচ বহন করতে পারত? গ্রামেগঞ্জে কামকাজের মধ্যে প্রকৃতিনির্ভর কৃষি কাজই ছিল প্রধান; উচ্চ ফলনশীল ধান বা অন্যান্য ধরনের ফসলের প্রচলন হয়ত তখন শুরু হয়েছে, কিন্তু এসবের জন্য সেচের পানি, উন্নত বীজের দাম, কীটনাশক ইত্যাদি কেনার জন্য তখনও ব্যাংক থেকে ঋণ দেয়ার সুযোগ চালু হয়নি। তখন গ্রামগঞ্জের মানুষ বেশিরভাগই গরিব ছিলো।
এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও শিক্ষানুরাগী বাবা-মায়েরা হয়ত তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য পুরনো বই কিনে দিয়েছেন। কারণ নতুন বই কেনার সামর্থ্য নেই, বা বই বাজারেই আসেনি, বই হয়ত দু’তিন মাসে ছাপাই হয়নি। সুতরাং আনুষ্ঠানিকভাবে ১ জানুয়ারিতে শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও বই পেতে দেরি হতো আরও কয়েক মাস। আর তাতে লেখাপড়ারও ক্ষতি হতো তখন।
মনে আছে, সেই ৬০ বছর আগে, ক্লাস সিক্সেই বোধ হয় তখন পড়ি। শুনলাম, এত বছর ধরে বড় ভাই, চাচারা ভূগোলের যে বই এত বছর ধরে পড়ে আসছেন, তা বাতিল করা হয়েছে; নতুন কারিকুলামের বই পড়তে হবে এখন থেকে। কিন্তু নতুন বই যে আর আসে না! আরও বলা হলো আমাদের তখন, আমেরিকা থেকে ছাপা হয়ে সে বই আসবে। প্রকাশকের নাম এত বছর পরও মনে আছে, ‘সিলভার বার্ডেট কোম্পানি’। অনেক উন্নতমানের মলাট, সাদা ঝকঝকে কাগজে গাঢ় কালিতে পারিচ্ছন্ন ছাপা। বই শুঁকে, বইতে ঘ্রাণ নিয়ে উদ্দীপ্ত হলাম। কিন্তু বইটিকে বাদ দিতে হলো এক বছরের মধ্যেই। কারণ, বইয়ের শুরুতেই দেখানো হলো, ইউরোপ কেমন পুরনো একটি মহাদেশ, আর তার বিপরীতে আমেরিকা কেমন নতুন। বইটিকে আমাদের দেশের তুলনায় বেখাপ্পা বললেন শিক্ষকরা। আর এমন নতুন আঙ্গিকে লেখা বই পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের কোন প্রশিক্ষণও ছিল না। সুতরাং আমরা আবার ভূগোলের পুরনো বইতে, সিলেবাসে ফিরে গেলাম। তারপর, বই হয়ত দেরিতেই আসবে, কিন্তু আমেরিকা থেকে তো আনতে হবে না।
আব্বা একটি এমই (মিড্ল ইংলিশ) স্কুল ক্লাস সিক্স পর্যন্ত, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই ১৯২৬ সালে, স্থানীয় হিন্দু ‘মজুমদার’ পরিবারের দেয়া জমিতে, তাদের এক পূর্বপুরুষ গঙ্গাধর মজুমদারের নামে। (এই স্কুলের শিশু শ্রেণীতে পড়েছে আমাদের বর্তমান শিক্ষা সচিব ড. কামাল নাসের চৌধুরীও। তার নানারবাড়ি আমাদের নূরপুর গ্রামে। তার নানা কাজী ডা. আবদুল ওয়াদুদ একজন অভিজাত পরিবারের মানুষ ছিলেন, জলপাইগুড়িতে চা বাগান ছিল তাঁর। বছর খানেক আগে এক অনুষ্ঠানে কামাল আমাকে নিশ্চিত করেছে, আমাদের এই গঙ্গাধর মজুমদার হাট স্কুলের প্রাইমারি সেকশনের শিক্ষক কানু মাস্টারের কথা তার মনে আছে। কানু মাস্টার গত বছর মারা গেছেন, তাঁর এক ছাত্র এখন শিক্ষা সচিব, এখনও তার কথা মনে রেখেছেন, জানলে দারুণ খুশি হতেন তিনি।)
স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা-হেড মাস্টার আমার আব্বা, ৫০-এর দশকের প্রথম দিকে ২৬ টাকা মাসিক বেতন পেতেন নোয়াখালী ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড থেকে। পরে ৬৭-তে তিনি যখন অবসর নেন, তখন বোধ হয় ৭০ টাকায় উঠেছিল। পাঁচ ভাই, এক বোন, জমির পরিমাণ কম, ধানের উৎপাদনও তখন কম; সুতরাং কষ্টের সংসার। কিন্তু এত অভাবের মধ্যেও খাতা, কালি কলম, বই সব সময়েই চাহিদামতই পেয়েছি আমরা। আবদুর রশীদ মাস্টার নামের এই মানুষটিকে তাঁর মৃত্যুর ৪০ বছর পরও এলাকার মানুষজন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে, শিক্ষাক্ষেত্রে একজন পথ প্রদর্শক পাইওনিয়ার হিসেবে সম্মান করে, শ্রদ্ধা জানায়। কর্মজীবনে তাঁর কষ্ট ও কৃচ্ছ্রের সংসারে সঙ্গে ছিল তাঁর কঠোর ব্যক্তিত্ব এবং আমাদের মায়ের সার্বক্ষণিক সাহায্য, সমর্থন ও উৎসাহ। তাই টাকা-পয়সা, অর্থবিত্ত, ধন দৌলত আমাদের আকৃষ্ট করেনি, কোন দিন। তবে তাঁকে এখনও অনুসরণ করি, তার মতই প্রতিদিন অন্তত আট ঘণ্টা লেখাপড়া করি। তাঁর কৃতিত্ব, বৃত্তির টাকাতেই চলেছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমাদের লেখাপড়া।
ব্যক্তিগত এত কথা সঙ্কোচ এবং বিনয়ের সঙ্গে বলছি শুধু এই কথাটি বোঝাতে, একজন স্কুল শিক্ষকের জন্যও তখন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগানো কত বড় বোঝা ছিল। আমি যখন ক্লাস সিক্সের পরীক্ষা দিই গঙ্গাধর মজুমদার হাট স্কুল থেকে আমরা তখন সর্বসাকুল্যে চারজন ছাত্র। হ্যাঁ, মাত্র চারজন!
কিন্তু এখন ৬০ বছর পর, চোখ ধাঁধানো অবস্থা। আব্বার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি ৬০-এর দশকে উন্নীত হয়েছে একটি হাইস্কুলে; ৮০-এর দশকে এখানে এই জিএম হাটে হয়েছে একটি কলেজও। আর, একটু দূরে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাহাতের নেসা গার্লস হাইস্কুল এবং আবদুল হাকিম প্রাইমারি স্কুল। এই দুটো স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন আমার এক কাকা আবদুর রউফ, বিশ পঁচিশ বছর আগে। আমার এই কাকা ব্যাংকার হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেছিলেন চট্টগ্রামে, পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর আগে। বয়স এখন বোধহয় ৭৫, এখনও চট্টগ্রামেই আছেন, তবে এখন কোন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে।
এই জিএম হাটে প্রাইমারি শিক্ষার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে আরও তিনটি, ক্যাডেট স্কুল, বিশ্বাস হয়! তিনটিই চলছে প্রতিটিতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা একশ’র ওপর। প্রতি ছাত্রছাত্রীর মাসিক বেতন একশ’ টাকা বা তার একটু বেশি। এই এক জিএম হাটেই প্রাইমারি স্কুল পাঁচ-পাঁচটি।
এখন আবার তুলনা করুন, ৬০ বছর আগে ক্লাস সিক্সে আমরা মাত্র ৪ জন ছাত্র। পুরো স্কুলে কোন ছাত্রী ছিল না। আমাদের একমাত্র ছোটবোন টেমু এখন ফেনীতে বাসাবাড়ি করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার স্বামীসহ থাকে। ক্লাস সিক্সের পর বাড়িতে আব্বার কাছেই ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছে; তারপর তিন মাইল দূরের হাইস্কুলে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে আর পড়তে পারল না আমার এই ছোট বোনটি। আমরা ৪ ভাই এমএ পড়লাম, পাস করলাম; একজন তো ডক্টরেটও; ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মুনীর উদ্দিন আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন। স্বাস্থ্য বিষয়ে লেখালেখি করে এখন সে বেশ খ্যাতিমান। তো আবার দয়া করে তুলনা করুন এখন এই একই জায়গাতে একটি গার্লস হাইস্কুলও হয়েছে। শুধু মেয়েদের জন্য। আমার ছোটবোন টেমু এসএসসির পর আর পড়তে না পারলেও, তার তিন মেয়েকেই এমএ পাশ করিয়েছে।

॥ তিন ॥
আমার জীবনের মধুরতম স্মৃতিগুলোর একটি এখানে প্রাসঙ্গিক বলে এখন উল্লেখ করি। এই স্মৃতিটির উল্লেখ আগেও আমার কোন লেখায় করেছিলাম। মনে পড়ে, বছর পনেরো আগে ফেনী শহর থেকে মুহুরী প্রজেক্ট দেখার জন্য গাড়িতে সোনাগাজীর রাস্তা ধরে চলছি। পথে প্রবল বৃষ্টিতে পড়লাম। ভাবলাম বৃষ্টি থেমে যাবে, কিন্তু বৃষ্টি তো আর থামে না; আমরাও থামি না।
সোনাগাজী থানা শহরটি পার হয়ে একটু এগিয়ে দেখি এক অসাধারণ দৃশ্য। স্কুল ইউনিফরম পরা দুই কিশোরী, বুকে তারা তাদের বইগুলো চেপে ধরে রেখেছে; একটি গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছে তারা, মাথার উপরে একটি মাত্র ছাতা, কিন্তু ছাতাটিতে বড় ফুটো, তারপরও তারা হাসছে এবং তাদের বইগুলো বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষার আন্তরিক চেষ্টা তাদের। এই একটি দৃশ্য থেকে দেখলাম, লেখাপড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ; বই মূল্যবান জিনিস, তাই ক্ষতি থেকে বই রক্ষার চেষ্টা; এত প্রবল বর্ষণেও তারা উচ্ছল।
শিক্ষাবর্ষ শুরুর এই সময়টাতে, এই শীতকালে বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই আনন্দ-উৎসব, উল্লাস, পার্বণ চলছে। শীতকালীন সবজি, মাঠে হলুদ সর্ষে ফুলের সমারোহ; এখন বছরের এ সময়ে অনেক কিছুই উপভোগ করার আছে। আমার কাছে এসবের সঙ্গে আরও একটি দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য হচ্ছে, স্কুল ইউনিফর্ম পরা শিশু, কিশোর-কিশোরীরা বই হাতে গ্রামগঞ্জের রাস্তা ধরে স্কুলে যাচ্ছে, বা স্কুল থেকে ফিরছে। তারা কলকল করে, দৌড়ে ছুটে চলে; হয়ত একটু মারামারিও করে। কিন্তু আমি সবই উপভোগ করি। কখনও কখনও দাঁড়িয়ে চোখেমুখে দুষ্টুমি ভরা দুই একজনের সঙ্গে কথা বলি; এই প্রবীণ বয়সেও তাদের সঙ্গে একটু দুষ্টুমি করার চেষ্টা করি।
পত্রপত্রিকার পাতায় এবং টেলিভিশন চ্যানেগুলোতে এত নেতিবাচক খবর, দুর্নীতি, ধ্বংস, লুণ্ঠন, হতাশার যথার্থ-অযথার্থ খবরের মাঝে আমি যখন আমাদের মেয়েদের শিক্ষার প্রতি এমন প্রবল আগ্রহের বিপরীতে পাকিস্তানের অবস্থার তুলনা করি পাকিস্তানের এক কিশোরী মালালা ইউসুফজাইয়ের সংগ্রাম, তালেবান, শিক্ষাবিরোধী মৌলবাদীদের হুমকির কথা বিবেচনা করি, আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, আমরা পাকিস্তানসহ অনেক দেশের চাইতে এগিয়ে আছি। আমি গভীর আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করি, আমাদের বাসার কাজের ছুটা গৃহকর্মী জহুরাও তাঁর দুই শিশুকন্যা পপী এবং তানিয়াকে স্কুলে পড়াতে আগ্রহী। রিকশায় চলাফেরার সময় আমি তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় দেখতে পাই, তাদের প্রত্যেকেই তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়াতে চায়। তারাও এখন জানে, লেখাপড়া শেখাতে পারলে তাদের ছেলেমেয়েদের বাসাবাড়িতে কাজ করতে হবে না, রিকশা চালাতে হবে না। মেয়েদের শিক্ষাকে তালেবানরা, কট্টর মৌলবাদীরা মনে করে ‘বিলকুল হারাম’। আর বাংলাদেশে আমাদের জহুরাও মনে করে, মেয়েদের শিক্ষাটা ‘পিউর, পুরো হালাল’।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা অবশ্যই আরও এগিয়ে যাব।

॥ চার ॥
এখানে, আমার কাকা আবদুর রউফের ভূমিকা আবারও প্রাসঙ্গিক। তাঁর বাবার নামে তিনি প্রাইমারি স্কুল, মায়ের নামে গার্লস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, একটু আগেই উল্লেখ করেছি। এখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁর এই রাহাতের নেসা গার্লস হাই স্কুলের প্রতিটি ছাত্রীই যেন বৃত্তি পায় তার ব্যবস্থাও তিনি করবেন এই নতুন শিক্ষা বছর থেকে। তাঁর এই কাজে যুক্ত হয়েছে তার দুই ব্যাংকার ছেলে জামসেদ হায়দর কুমার এবং জিয়া হায়দর কমল। তাঁর সঙ্গে আরও আছে নতুন স্কুল কমিটির নির্বাচিত চেয়ারম্যান গ্রামের আবুল বাশার এবং আগের চেয়ারম্যান সালু সালেহ আহমেদ। সালু ঢাকার কমলাপুরেও একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে কয়েক বছর আগে। শুনেছি, এই স্কুলটিও ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে।
রাহাতের নেসা গার্লস হাই স্কুলকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে জিএম হাট হাই স্কুলের সঙ্গে। ওখানে কো-এডুকেশন, তাই মেয়েরা ওখানেও ভর্তি হতে চায় বেশি। তারপর জিএম হাট তো এখন একটি ‘আরবানাইজ্ড’ শহর!! ৬০ বছর আগে এখানে ছিল মাত্র চার পাঁচটি দোকান, এখন একই জায়গায় ১৫০টি। বিদ্যুত আছে, ডিশ চ্যানেলের ব্যবস্থাও আছে; ফেনীর সঙ্গে পাকা রাস্তা, প্রতি পাঁচ দশ মিনিটে সিএনজি, টেম্পো, ২০ মিনিট সময়, ভাড়া বারো চৌদ্দ টাকা। সুতরাং এই হাইস্কুলের প্রতি মেয়েদের এবং তাদের অভিভাবকদের স্বাভাবিক আকর্ষণ; বৃত্তি দিয়ে তাই আমার কাকুর প্রলুব্ধ করার চেষ্টাও। কাকুর এই উদ্যোগে আমিও যুক্ত হয়েছি। ৩০টি মেয়েকে প্রতিমাসে একশ’ টাকা করে গত ছয় মাস আমি বৃত্তি দিয়েছি। কাকু বাকি সকলকে বৃত্তি দেয়ার ব্যবস্থা চূড়ান্ত করে আমাকে জানালে, আমি আমার আব্বা-আম্মার নামে দেয়া বৃত্তিগুলো নবায়ন করব।
বস্তুত আমাদের সকলের রউফ কাকু, কমল, কুমার, বাশার, সালু এবং আমার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত আমাদের আশপাশের গ্রামগুলোতে টাকা পয়সা, সামর্থ্যরে অভাবে কোন মেয়ে স্কুলে যেতে পারছে না জানলে, আমরা তাকে স্কুলে আনার ব্যবস্থা করব। টাকা পয়সার অভাবে কোন মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ থাকবে, তা আমরা আমাদের এই গ্রামগুলোতে হতে দেব না। আমাদের এই সিদ্ধান্তে আমরা মেয়েদের লেখাপড়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আশপাশের এবং দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে মেয়েদের লেখাপড়া এবং দেশের অগ্রগতি, উন্নয়নে তাদের ভূমিকা আমাদেরও অনুপ্রাণিত করেছে।
এই ক্ষেত্রে আমরা অনুপ্রাণিত হচ্ছি আমাদের ডাচ্্-বাংলা ব্যাংকের উদাহরণেও। এই ব্যাংকটি প্রতিবছর একশ’ দুই কোটি টাকা বৃত্তি দিচ্ছে। বাংলাদেশের অন্য ৪৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংক যদি ডাচ্্-বাংলা ব্যাংকের উদাহরণে অনুপ্রাণিত হতো, তাহলে ১০ বছরে এই দেশের শিক্ষার হার ৯০-এর ওপরে নেয়া যেত বলে বিশ্বাস করি। ঢাকার মহাখালীর মেডোনা গ্রুপের চেয়ারম্যান জাতীয়ভাবে পরিচিত কোন ব্যক্তি তিনি নন জনাব আখতারুজ্জামানের উদাহরণও এখানে উল্লেখ করতে হয়। কয়েক বছর ধরে প্রতিবছর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ‘অদম্য মেধাবী ছাত্রছাত্রী’দের খবরগুলো দেখে একটি তালিকা করেন তিনি। প্রায় দেড়শ’ ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতিতে এই গরিব মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যেককে এককালীন হাজার দশেক ঢাকা তিনি বৃত্তি হিসেবে দিয়ে আসছেন, একটি অনুষ্ঠান করে। বাংলাদেশটি স্বাধীন হওয়ার পর যে কয়েক লাখ কোটিপতি এই দেশটিতে ইতোমধ্যে জন্মেছে, আর গার্মেন্টস শিল্পের অমানুষগুলো এবং দেশের আদম বেপারিগুলো যদি আখতারুজ্জামানের উদাহরণে একটুও অনুপ্রাণিত হতো, তাহলে তারাও ‘মানুষ’ হতে পারত, দেশটির প্রতি তাদের দরদ ও মমত্বের একটু প্রতিফলনও তাহলে দেখা যেত। তাদের আয় অর্জনগুলোও তাহলে একটু হালাল হতো।
পাঁচ.
শেষে ভিন্ন রকমের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। আমাদের ফেনী জেলার পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া এই উপজেলা তিনটির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংসদ সদস্য হচ্ছেন জাহানারা বেগম নামের এক ভদ্র মহিলা। রাহাতের নেসা গার্লস হাই স্কুলটির জন্য তার কাছে কিছু সাহায্য চাইতে এক বছর আগে দেখা করতে চাইল ম্যানেজিং কমিটির সদ্য নির্বাচিত সভাপতি বাশার। আওয়ামী লীগ থেকে এই মনোনীত সংসদ সদস্যের সময় নেই বাশারের সঙ্গে দেখা করার, বাশারকে জাহানারা বেগমের কাটাকাটা কথাবার্তা।
টেলিফোন টেকনিশিয়ান বাশার দীর্ঘ বিশ পঁচিশ বছর জেদ্দায় কাজ করেছে। সৌদি আরবে বঙ্গবন্ধু পরিষদ এবং আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা, শেখ হাসিনাকে তার এক জেদ্দা সফরকালে তারা সংবর্ধনাও দিয়েছে। দশ-বারো বছর আগে দেশে ফিরে এসে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখাও করেছে। শ্রদ্ধা সালাম জানিয়েছে। এত পরিচয় দেয়ার পরও বাশার সাক্ষাত পায় না জাহানারা বেগম এমপির!
বাশার জানাল আমাকে বিষয়টি। ভাবলাম, আমি একটু চেষ্টা করে দেখি না কেন?
চেষ্টা করলাম, মানে টেলিফোন করলাম মহিলাকে। জাহানারা বেগম আমার টেলিফোন ধরলেন, কিন্তু তিনি তখন খুব ব্যস্ত; বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে কোন এক সভায় তিনি ঢুকছেন; তার উপদেশ, আমি যেন বিকেলে তাঁকে আবার টেলিফোন করি। আবার তাকে তার উপদেশ মতই সেদিন বিকেলে টেলিফোন করলাম, তিনি এবার টেলিফোন ধরলেনই না!
এর কিছুদিন পর গত মার্চে রূপসী বাংলা হোটেলে এক অনুষ্ঠানে দেখা পেলাম চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদের। তিনি আমাকে ভালই চেনেন। দুঃখ এবং ব্যথার কথা জানালাম চিফ হুইপকে। তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া খুবই ইতিবাচক; হ্যাঁ, এই মহিলা টঙ্গীতে থাকেন। ফেনীর এই এলাকা থেকে খালেদা জিয়া নির্বাচিত এমপি; তাই জাহানারা বেগমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমি কালই তাকে বলব। দরকার হলে প্রধানমন্ত্রীকেও জানাবও।
আশ্বস্ত করলেন চিফ হুইপ। সেই রাতে আমার ঘুমটা ভালই হয়েছিল। সংসদ সদস্য হলে তো এমনই হতে হয়, সংবেদনশীল দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জনকল্যাণ। কিন্তু না, গত ১০ মাসে কোনই উন্নতি নেই। চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ বোধ হয় বিষয়টা ভুলেই গিয়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে সকল মহল থেকেই তারিফ করা হচ্ছে। তবে তারিফ করতে পারছেন না, বোধ হয় আওয়ামী লীগের এক এমপি গোলাম মাওলা রনি। মাস ছয় আগে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত এক কঠোর লেখায় নুরুল ইসলাম নাহিদকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করলেন তিনি। প্রতিবাদে আমি চিঠি লিখলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজামকে, আর কপি দিলাম শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং চিফ হুইপ আবদুস শহীদকে। চিফ হুইপ আবদুস শহীদকে প্রশ্ন করলাম, তারই দলের একজন এমপি-গোলাম মাওলা রনি, প্রকাশ্যে এমন ভাষায় তারই সরকারের একজন সফল মন্ত্রীকে আক্রমণ করতে কি পারেন? গোলাম মাওলা রনি, মন্ত্রী নাহিদের বিরুদ্ধে তার অভিযোগুলো কি কখনও পার্টি ফোরামে বা পার্লামেন্টারি কমিটিতে উঠিয়েছিলেন? এলাকায় নিন্দিত এই লোকটার এত আক্রোশ কেন মন্ত্রী নাহিদের প্রতি?
গোলাম মাওলা রনি তার কোন ব্যক্তিগত আক্রোশে শিক্ষামন্ত্রীর কোন সাফল্য দেখতে পাননি তার ওই লেখায়। মাইক্রোসকোপ দিয়েও বর্তমান মহাজোট সরকারের কোন সাফল্য দেখতে পান না বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম। দৃষ্টিভঙ্গিতে মিল আছে দু’জনের, যদিও দু’জনে দুই দল করেন।
আমার চিঠির প্রাপ্তি স্বীকারও করেননি বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নাঈম নিজাম, চিফ হুইপ আবদুস শহীদ। তবে টেলিফোন করে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
মানুষে মানুষে এখানেই ফারাকটা।

‘শিউলীতলা’, উত্তরা, ঢাকা, শুক্রবার ১১ জানুয়ারি ২০১৩,
mohiuddinahmed1944@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.