সাঈদীর মামলার রায় যেকোনো দিন

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গতকাল মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় সমস্ত বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হলে সবাই অপেক্ষা করেন রায়ের তারিখের ঘোষণা শোনার জন্য।
তবে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার তারিখ নির্দিষ্ট করে না দিয়ে বলেছেন সিএভি (কুরিয়া অ্যাডভিজরি ভল্ট)Ñ অর্থাৎ রায় ঘোষণা পর্যন্ত মুলতবি। রায় প্রস্তুত হলে যেকোনো দিন তা ঘোষণা করা হবে।

এর আগে গত ৬ ডিসেম্বর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার সব কার্যক্রম শেষ হলে রায়ের তারিখ বিষয়ে সিএভি ঘোষণা করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তখন ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম। ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে ওই বিচারপতির স্কাইপ কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার ফলে ১১ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন। ট্রাইব্যুনালে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবিরকে। স্কাইপ কেলেঙ্কারির কারণে মাওলানা সাঈদীসহ তিনজনের বিচারকার্যক্রম নতুন করে শুরুর আবেদন করা হয়। তিনটি আবেদনই খারিজ করে দেয়া হয়। তবে শুধু মাওলানা সাঈদীর মামলায় যুক্তিতর্ক পুনরায় সংক্ষিপ্ত আকারে শুনানির জন্য ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল উভয় পক্ষের পুনরায় যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে আবার নতুন করে রায় ঘোষণার তারিখ বিষয়ে আদেশ দেয়া হলো।

চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল-১ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রায়ের তারিখ বিষয়ে আদেশ দেন।

গতকাল বিচারের শেষ মুহূর্তে রায়ের তারিখ বিষয়ে আদেশের আগে ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর কথা বলা নিয়ে বেশ উত্তেজনা দেখা দেয় উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে। মাওলানা সাঈদী দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বাধা দিয়ে বলেন, তার এভাবে কথা বলার অধিকার নেই।



বিচার প্রশ্নবিদ্ধ-আসামিপক্ষ : গতকাল মামলার কার্যক্রম শেষে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, এ বিচার প্রশ্নবিদ্ধ। বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের স্কাইপ ষড়যন্ত্র এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন তাতে এ বিচার সম্পূর্ণ প্রশ্নবিদ্ধ। বিচারপতি নিজামুল হকের রেখে যাওয়া বিচারকাজের ওপর ভিত্তি করেই এ মামলার বিচারকার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হয়েছে। পুরো বিচার নতুন করে করা হয়নি। শুধু যুক্তি পুনরায় উপস্থাপন করা হয়েছে। বিচারপতি নিজামুল হকের রেখে যাওয়া বিচারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দেশবাসীর মনে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থতার ইতিহাসে এটি এক নম্বরে স্থান পাবে।

অপর দিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী যুক্তি উপস্থাপন শেষে বলেন, আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি এবং আসামি সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত।

ট্রাইব্যুনালের প্রথম মামলা : ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলাটিই ছিল প্রথম মামলা। প্রথম মামলা হিসেবে এ মামলার কার্যক্রমই সর্বপ্রথম শেষ হয়েছিল এবং রায়ের তারিখ বিষয়েও আদেশ দেয়া হয়েছিল প্রথমে। গত ডিসেম্বর মাসে এ মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে বলে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল। কিন্তু সে সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের স্কাইপ কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার মধ্য দিয়ে। ফলে প্রায় দুই মাস পরে নতুন করে রায়ের তারিখ বিষয়ে আদেশ দিতে হলো। তবে এর মধ্যে মামলার রায় ঘোষণার দিক দিয়ে এগিয়ে গেছে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল। গত বছর মার্চ মাসে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। পলাতক থাকা অবস্থায় মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে বিচারকার্যক্রম শেষে তার ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনাল-২-এ। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শেষে গত ১৭ জানুয়ারি রায়ের তারিখ বিষয়ে সিএভি ঘোষণা করা হয়। গতকাল মাওলানা সাঈদীর মামলায় রায়ের তারিখ বিষয়ে সিএভি ঘোষণার মধ্য দিয়ে এখন দু’টি ট্রাইব্যুনালে দু’টি মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে।

২০১১ সালের ৭ ডিসেম্বর মাওলানা সাঈদীর মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। প্রায় এক বছর চলে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা। জেরা শেষে গত ৫ নভেম্বর শুরু হয় যুক্তি উপস্থাপন। ৬ ডিসেম্বর যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায়ের তারিখ বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। এরপর গত ১৩ জানুয়ারি পুনরায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয় এবং গতকাল তা শেষ হয়।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়। পরে অবশ্য রাষ্ট্রপক্ষ একটি অভিযোগ প্রত্যাহার করে।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে বিচার হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর জেলার পাড়েরহাট বন্দর এলাকায় রাজাকার ও শান্তি কমিটি গঠনে নেতৃত্ব প্রদান, পাড়েরহাট ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনকে হত্যা, নির্যাতনে নেতৃত্ব প্রদান এবং এসবে অংশগ্রহণ; পাকিস্তান আর্মি, রাজাকার এবং শান্তিকমিটির লোকজন নিয়ে পাড়েরহাট বাজারে হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনের দোকানপাট লুটপাট, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ; এসব বাড়িঘর দোকানপাট লুটপাটে নেতৃত্বদান এবং সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগ। ভানুসাহাসহ বিভিন্ন মেয়েকে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের উদ্দেশে গ্রামের অনেক নারীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে তুলে দেয়ার অভিযোগ; হত্যা, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে নিজে জড়িত থাকাসহ এসবে নেতৃত্ব প্রদান, পরিচালনা এবং পাকিস্তান আর্মিকে এসব অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করার অভিযোগ।

মামলার শুরু যেভাবে : জনৈক মানিক পসারী পিরোজপুরের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ঘটনায় একটি মামলা করেন। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর মাহবুবুল আলম নামে আরেক ব্যক্তি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের করেন একই আদালতে।

আসামিপক্ষ থেকে এ মামলা দু’টিকে রাজনৈতিক আখ্যায়িত করে ট্রাইব্যুনালে জানানো হয়, ২০০৯ সালে মাওলানা সাঈদীকে বিদেশ যেতে বাধা দান করা হলে হাইকোর্টে রিট করা হয়। কোর্ট তখন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে রায় দেন। তবে রায়ের আধঘণ্টা পর হাইকোর্টের আদেশ চেম্বার জজ আদালতে স্টে করা হয়। হাইকোর্ট মাওলানা সাঈদীর পক্ষে রায় দেয়ার সময় বলেছিলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এ প্রসেঙ্গ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেছিলেনÑ মামলা নেই কিন্তু মামলা হতে কতক্ষণ। তিনি এ কথা বলার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পিরোজপুরে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরে মামলার বাদি মাহবুবুল আলম হাওলাদার সে বছর ২০ জুলাই ঢাকায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে বিচার দাবি করেন। এভাবে মাওলানা সাঈদীর বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের অধীনে আসে এবং বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

তদন্তসংস্থা ১৪ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় এবং ৩/১০/২০১১ তারিখে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে আদেশ দেয়া হয় ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়াসংক্রান্ত একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয় মাওলানা সাঈদীকে।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে মামলায় যেসব আইনজীবী অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম, মনজুর আহমেদ আনসারী, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন প্রমুখ।

অন্য দিকে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের নির্ধারিত আইনজীবী ছিলেন সৈয়দ হায়দার আলী
       


No comments

Powered by Blogger.