কিছুটা স্বস্তি by ফসিহ বণিক

অতীতে পত্র-পত্রিকায় হায় হায় কোম্পানির সংবাদ পাঠক সমাজে চিত্তচাঞ্চল্য সৃষ্টি করত। কীভাবে প্যাডসর্বস্ব কোম্পানি খুলে গ্রামের সরলপ্রাণ মানুষ, এমনকি শহরের চালাক-চতুর কেতাদুরস্ত নাগরিককে পর্যন্ত ঠকিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ লোপাট করে কতিপয় সুযোগসন্ধানী চম্পট দিত, তার বিবরণ রুদ্ধশ্বাসে আদ্যোপান্ত পড়া শেষ করেও পাঠকের আশ মিটত না।


এখন এসব সংবাদ পাঠকমনে তেমন ঝড় তোলে না। পাঠক বরং যারা হায় হায় কোম্পানির খপ্পরে পড়ে অনেক কিছু খুইয়েছেন, তাদের আক্কেল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যুবকের পর হলমার্ক, ডেসটিনি ইত্যাকার ডাকুবুকুরা হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে দেওয়ার খবর চাউর হওয়ার পর হায় হায় কোম্পানির সংবাদ আর কে গুরুত্ব দিয়ে পড়ে বলুন! ডেসটিনি না হয় হাতের পাঞ্জার খেল, গাছ, ইত্যাদি দেখিয়ে মানুষকে অভিনব কায়দায় সম্মোহিত করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে মিডিয়াসহ বড় বড় কোম্পানি খুলে আরও বড় ফাঁদ পাতার পাঁয়তারা কষছিল। হলমার্ক তো এদেরও ফেল মেরে দিয়েছে। দশাসই চেহারা ও পেটানো শরীরের অধিকারী হলমার্কের মালিক তানভীর মাহমুদ হঠাৎ করে যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়ে গেলেন। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ফুঁড়ে বের হওয়া তার ধনসম্পদের কাহিনী আরব্য রজনীর গল্পের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। রাজনৈতিক দল, সরকার, কেউকেটাদের সমাজ_ সব জায়গায় তার জয়ঢাক ঢক্কানিনাদে বাজতে লাগল। এভাবে চলতে চলতে কীভাবে তিনি মিডিয়ার নজরে চলে এলেন...। আর অমনি কাগজ, টিভি তার পিছু নিল। তার সম্পদের হদিস করতে গিয়ে সংবাদ-মিডিয়াওয়ালাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। আঁতিপাঁতি খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে বেরিয়ে পড়ল থলের আসল বেড়াল। অতি কম সময়ের মধ্যে সোনালী ব্যাংক থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার মতো হাতিয়ে নিয়ে তিনি এ দেশে রাষ্ট্রের অর্থ তছরুফের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সেঁটে দিলেন। যারা হায় হায় কোম্পানি খুলে বা যুবক, ডেসটিনির মতো মানুষের পকেট কেটে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়েছে, তাদের তানভীর মাহমুদ টেক্কা দিয়ে খোদ সরকারের অর্থ কীভাবে নিজের করে নিতে হয় তা দেখিয়ে দিয়ে এ পর্যন্ত অর্থ কেলেঙ্কারির ইতিহাসে (শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা বাদ দিলে) সেরা ওস্তাদের খেতাবটি বাগিয়ে নিলেন। আর এটা সম্ভব হয়েছে ক্ষমতা ও ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের ব্যবহার করেই। তবে যেভাবে তিনি সোনালী ব্যাংকের অর্থ হাতিয়েছেন তাতে এর সঙ্গে সুদূরপ্রসারী কোনো চক্রান্ত যে জড়িত নেই তা কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যায় না। আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলোকে ফেল মারিয়ে স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্টের নামে পুরোপুরি বিরাষ্ট্রীয়করণের চক্রান্ত বাস্তবায়িত করার জন্য এই প্রতারণার জাল ফাঁদা হয়নি তো! অতএব সাধু সাবধান! তবে শেষ পর্যন্ত সরকার তানভীর ও তার ভায়রাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, এটা কিছুটা স্বস্তির খবর। এর মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থের একটা অংশ অন্তত ফেরত পাওয়া যাবে তো? যেহেতু প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাই তানভীর ও তার সহযোগীদের পরিচয়-নির্বিশেষে আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই এ ধরনের আর্থিক অপরাধে আর কেউ উৎসাহিত হওয়ার আগে দশবার চিন্তা করবে। ডেসটিনির ঘটনাটিতে একজন সাবেক সেনাপ্রধান সরাসরি জড়িত। অর্থের এতই মহিমা যে তিনি মুক্তিযোদ্ধা মহিমাকে পর্যন্ত অর্থ নামক অনর্থের হাতে সঁপে দিতে দ্বিধা করেননি। তবে তিনিও এখন আইনের হাতে বন্দি। ডেসটিনি, হলমার্ক, যুবক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা নয়ছয়ের ঘটনা আমাদের সমাজের এক ধরনের বিকার এবং অর্থব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুস্পষ্ট লক্ষণ। এই ব্যামো সহজে সারার নয়। গ্রেফতার অভিযান শুরু হিসেবে ভালো তবে শেষটাও যেন ভালো হয়। কথায় বলে, যার শেষ ভালো তার সব ভালো।
 

No comments

Powered by Blogger.