শারদোৎসবের প্রতীক্ষা... by মিঠুন চৌধুরী

দিগন্ত বিস্তৃত কাশবনে হাওয়ার নাচন আর আকাশে তুলার মতো ভেসে বেড়ানো মেঘ। মাস খানেক আগেই প্রকৃতির এসব আয়োজন জানিয়ে দিয়েছে শরতের আগমনী বার্তা। এবার সময় এসেছে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে আবাহনের। কারিগরবাড়ি আর মণ্ডপে মণ্ডপে এখন চলছে শারদোৎসবের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।


পূজাকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছেন নগরের প্রতিমা কারিগরেরা। অধিকাংশ কারিগরই প্রতিমার মূল কাঠামো তৈরির কাজ শেষ করে ফেলেছেন। এখন চলছে রং করার কাজ। পাড়ায় পাড়ায় চলছে মণ্ডপ তৈরি, আলোকসজ্জাসহ আনুষঙ্গিক কাজ।
গতকাল বুধবার সকালে নগরের সদরঘাট, দেওয়ানজী পুকুরপাড় ও গোয়ালপাড়ায় কয়েকটি প্রতিমা তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা গেল কারিগরদের শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। সদরঘাটে কথা হয় দুই সহোদর কারিগর বাসুদেব পাল ও মহাদেব পালের সঙ্গে। বাবা হরি নারায়ণ পালের কাছেই প্রতিমা গড়ার হাতেখড়ি তাঁদের। ফরিদপুরের আদি বাসিন্দা এই পরিবার ৬৫ বছর ধরে গড়ে চলেছেন দুর্গা প্রতিমা।
মহাদেব পাল বলেন, ‘অজন্তা মূর্তির চাহিদা এখন বেশি। এ ধরনের মূর্তিতে শাড়ি, অলংকার ও অঙ্গসজ্জা সবই করা হয় মাটি ও রং দিয়ে। এর সব কাজই আমরা করি। বাঙলা প্রতিমায় আমরা শুধু মূর্তি নির্মাণ করি। শাড়ি, অলংকার ও সজ্জার অন্যান্য উপকরণ বাজার থেকে কিনে নিতে হয়। এ কারণে অজন্তা প্রতিমার চাহিদা একটু বেশি।’ এবার তৈরি ১৮টি প্রতিমার মধ্যে ১৭টি বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানান মহাদেব।
কারিগরেরা জানান, খড় দিয়ে প্রথমে বেনা বাঁধা হয়। এরপর কাঠামো নির্মাণ করে মাটি-পাট-সুতা ও খড় দিয়ে গড়া হয় পুরো প্রতিমা। প্রতিবছরের বৈশাখ মাসে শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ। শ্রাবণ মাসে মনসা পূজা শেষে পুরোদমে শুরু হয় দুর্গা প্রতিমা গড়ার কাজ। আকারভেদে প্রতিটি প্রতিমা বিক্রি হয় ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায়।
নগরের দেওয়ানজী পুকুরপাড়ের ‘রূপশ্রী’ কারখানার কারিগর রতন পাল। বাবা বিখ্যাত প্রতিমা কারিগর রাধাশ্যাম পালের হাত ধরে এই কাজে আসেন তিনি। রতন পাল বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য চট্টগ্রামের বড় মণ্ডপগুলোর প্রতিমা আমাদের হাতেই তৈরি হয়। চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মতো বড় পূজার প্রতিমা আমরাই গড়ি।’
এ বছর মোট ৩৩টি প্রতিমা তৈরি করছেন রতন পাল। এর মধ্যে ২০টি তৈরি হচ্ছে কারখানায়। অন্যগুলো বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে। তিনি বলেন, ‘এখন নতুনত্ব আনতে গিয়ে অনেকে প্রতিমার মূল আদল থেকে সরে যাচ্ছেন। মানুষের চাহিদার কারণেই এসব প্রতিমা বাধ্য হয়ে তৈরি করতে হয়।’
মহাকাশে মায়ের আবির্ভাব: মহাকাশে ঘুরছে নানা গ্রহ-উপগ্রহ, চারপাশে মহাজাগতিক আলো। মাঝেমধ্যে উড়ে যাচ্ছে মহাকাশযান। এমন আবহেই এবার মায়ের আবির্ভাব হবে বলে মনে করেন নগরের হাজারীগলির মণ্ডপের পূজারীরা।
হাজারীগলি পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি জহর লাল হাজারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর সাগরতলের আবহে মণ্ডপ তৈরি করা হয়। এবার মা আসবেন মহাকাশের মঞ্চে। গ্রহ-উপগ্রহ চারপাশে ঘুরতে থাকবে, রকেট উড়ে যাবে। এর মধ্যেই ভূমিকম্প হবে আর আবির্ভূত হবেন দেবী দুর্গা।’ এবার হাজারীগলির প্রতিমা তৈরি করেছেন জীবন পাল। আলোকসজ্জা করছেন কাজল দাশ। আলোক ও অঙ্গসজ্জার সরঞ্জাম আনা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। শিশুদের জন্য মূল ফটকের বাইরে থাকবে কার্টুন চরিত্র ডোরেমনের প্রতিমূর্তি।
নগরের ঘাটফরহাদবেগ এলাকায় পূজার ৫৬তম পূর্তি উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসব কমিটির আহ্বায়ক চন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, ‘পুরোনো আমলের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনই এবারের আয়োজন। শত ফুট দীর্ঘ দেয়ালচিত্রে থাকবে মায়ের বিভিন্ন রূপ। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে সপ্তাহব্যাপী শারদোৎসবের অনুষ্ঠানমালা।’ এখানকার প্রতিমা হবে শাশ্বত বাংলা প্রতিমা।
মহানগর পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি তিমির বরণ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার নগরে ২৪৬টি মণ্ডপে পূজা হবে। সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। সবার সহযোগিতায় সর্বাঙ্গীণ সুন্দর পূজা অনুষ্ঠিত হবে বলেই আশা করছি।’

No comments

Powered by Blogger.