গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি নিয়োগে সংশোধনী অধ্যাদেশ আসছে- ড. ইউনূস মর্মাহত

গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিধি পরিবর্তন করে অধ্যাদেশ আসছে। ‘সংশোধিত গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ জারির প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। বর্তমানে সংসদ অধিবেশন না থাকায় অধ্যাদেশ আকারে আইনটি জারি হচ্ছে।


এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্ধারিত বয়সের চেয়ে বেশি সময় থাকা বৈধ ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখবে সরকার। এ সময় তিনি কী পরিমাণ বেতন ভাতা উত্তোলন করেছেন এবং তা বৈধ কিনা তা অবিলম্বে জানানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে তিনি বিদেশ থেকে ওয়েজআর্নারের হিসেবে যে টাকা এনেছেন তাও বৈধ কিনা? এমনকি তিনি এর বিপরীতে সঠিক পরিমাণ ট্যাক্স পরিশোধ করেছেন কিনা সরকার তাও খতিয়ে দেখবে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিধি পরিবর্তন করে ‘সংশোধিত গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ জারির একটি প্রস্তাবেও মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই গ্রামীণ ব্যাংকে আমরা কত সহযোগিতা করেছি। এখন তারাই বড় শত্রু। বৈঠকে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিতে কঠোরভাবে আইন প্রণয়ন করতে হবে। তবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বাংলাদেশ ‘আইসোলেটেড’ কোন দ্বীপ নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ‘সেন্টিমেন্ট’ বুঝে কাজ করতে হবে।
বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইঞা এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভা এই আইনটি সংশোধনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদের অধিবেশন না থাকায় ‘গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ (সংশোধন) ২০১২’ আকারে আইনটি জারি করা হবে। সভার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে সচিব বলেন, ৬০ বছর বয়স অতিক্রমের পরও মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর ওই দায়িত্বে এভাবে বেশি সময় থাকা বৈধ ছিল কিনা, তিনি ওই সময়ে বেতন-ভাতা হিসেবে কত টাকা নিয়েছেন এবং তা বৈধ ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি থাকাকালে ইউনূস ‘ওয়েজআর্নার’ হিসেবে কত টাকা বিদেশ থেকে এনেছেন এবং তিনি তা আনতে পারেন কিনা, এনে থাকলে কর অব্যাহতি নিয়েছিলেন কিনা, কর অব্যাহতি নেয়া বৈধ ছিল কিনাÑ সেসব বিষয়েও একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা নিয়ে এনবিআর এই প্রতিবেদন তৈরি করবে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান। ১৯৮৩ সালে একটি সামরিক অধ্যাদেশের মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংকের সূচনা হওয়ার পর থেকেই ড. ইউনূস এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসলেও ২০১১ সালে অবসরের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তার এমডি পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই বছর মার্চে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ইউনূসকে অব্যাহতি দেয়, তখন তার বয়স প্রায় ৭১ বছর। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের চেষ্টাকে ‘শান্তি স্থাপন’ বিবেচনা করে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে। ২০১০ এর ডিসেম্বরে নরওয়ের টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংককে দেয়া বিদেশী অর্থ এক তহবিল থেকে অন্য তহবিলে স্থানান্তরের অভিযোগ ওঠে। এরপর দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকা- পর্যালোচনা করতে একটি কমিটি গঠন করে সরকার। গ্রামীণ ব্যাংক ও সহযোগী সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে নানা অসঙ্গতির তথ্য উঠে আসে ওই প্রতিবিদনে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ড. ইউনূসকে অব্যাহতি দেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার চাপের পরও সরকার তাকে গ্রামীণ ব্যাংকে না ফেরানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকে। ব্যাংকের জন্য একজন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের প্রস্তাব চলতি বছরের শুরুতে খারিজ করে দেয় সরকার।
বর্তমানে ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে মোহাম্মদ ইউনূসের অপসারণের ১৪ মাস পর বিগত ১৬ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যত নির্ধারণে একটি কমিশন গঠন করে।
গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে দুর্বলতা ও বাধাগুলো খুঁজে বের করা, এই প্রতিষ্ঠানে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, গ্রামীণ ব্যাংকের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আইনী কাঠামো এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকা- পর্যালোচনা করা, গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সদস্য নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচন এবং কিভাবে এই ব্যাংকে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অধীনে নেয়া যায়Ñ সে বিষয়ে সুপারিশ করার দায়িত্ব দেয়া হয় এই কমিশনকে। গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধন প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত ১৪ ধারার দু’টি উপধারার তিনটি বিষয়ে সংশোধনের প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
এতে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান বোর্ডের পরামর্শ নিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য তিন জনের একটি প্যানের নির্বাচন করবেন। এই প্যানেল থেকে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের সুপারিশ করবেন তিনি।
এর আগে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য বোর্ড একটি সিলেকশন কমিটি গঠন করার বিধান ছিল। সংশোধনীতে ওই বিধানটি বাতিল করা হয়েছে।
আগের আইনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের যোগ্যতা হিসেবে ‘রুরাল ইকোনমি’ এবং ‘গ্রামীণ ব্যাংক বিজনেস’ বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত দেয়া ছিল। সংশোধিত আইনে ‘মাইক্রো-ফাইন্যান্সিং’ বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত দেয়া হয়েছে।
উচ্চ আদালতের রায়ে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়োগ সংক্রান্ত নির্দেশনার আলোকে ব্যাংকটিতে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জটিলতা দূর করতে এই সংশোধনী আনা হয়েছে।

মুহাম্মদ ইউনূসের
প্রতিক্রিয়া
ড. মোহাম্মদ ইউনূস তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমি আগে থেকেই এ শঙ্কা প্রকাশ করে এসেছি। এখন আমার শঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে এই প্রক্রিয়াকে থামানোর ব্যাপারে আমরা সফল হতে পারিনি। গরিবের মালিকানায় পরিচালিত গরিবের ব্যাংকটি থেকে মালিকানা এবং মালিকানা প্রয়োগের ক্ষমতা থেকে গরিব মালিকদের বঞ্চিত হতে দেখে আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। এত মর্মাহত যে আমি আমার ভাবাবেগ প্রকাশে অক্ষম হয়ে পড়েছি। দেশের যারা আমার মতো মর্মাহত হবেন তাঁদের অনুরোধ করছি তাঁরা যেন সরকারকে বোঝান যে এটা অত্যন্ত ভুল কাজ হচ্ছে। এটা থেকে তাঁরা যেন বিরত থাকেন।
সরকারের এ সিদ্ধান্ত গরিবের ব্যাংকটি, এবং দেশের অত্যন্ত গর্বের ব্যাংকটিকে ধ্বংস করে দেবে। গরিবের সম্পদ এবং দেশের সম্পদ রক্ষার জন্য এগিয়ে আসার জন্য দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। গ্রামীণ ব্যাংকের গরিব মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি তাঁরা যেন তাঁদের মালিকানা প্রয়োগের অধিকারকে খর্ব না করার জন্য সরকারের প্রতি এবং দেশবাসীর প্রতি আবেদন জানান।

No comments

Powered by Blogger.