জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের আগের রাত by সঞ্জয় দে

এবার বন্ধ হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। দুর্ভাগ্য ঘিরে থাকা জাহাঙ্গীরনগর কেন আরো এক দফা গভীর সংকটের মধ্যে পড়ল সেটি ঢাকায় থেকে সম্ভবত বোঝা কঠিন। তবে রাতভর ঘটনাস্থলে থেকে এবং সবার সঙ্গে কথা বলে আমার যেটা মনে হচ্ছে, জাবি ছাত্রলীগের সফল পরিকল্পনা,


নতুন উপাচার্যের এই ক্যাম্পাসের শিক্ষক রাজনীতি সম্পর্কে উপলব্ধির ঘাটতি এবং সর্বোপরি পুলিশের বেহিসেবি পদক্ষেপের মিলিত ফল হলো এবারের অস্থিরতা। রাত আড়াইটার দিকে মীর মশাররফ হোসেন হল গেটের সামনে পেঁৗছে ছাত্রদের যে বক্তব্য আমাকে বিস্মিত করেছে তা হলো, তারা সবাই সাধারণ ছাত্র, নাহিদ নামে তাদের এক বন্ধুকে পুলিশ রাত পৌনে ১টার দিকে হল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় তারা বাধা দিয়েছিল এবং একপর্যায়ে পুলিশ গুলি ছুড়ে পাঁচজনকে আহত করে নাহিদকে নিয়ে চলে যায়। এর পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে ভাঙচুর ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে মীর মশাররফ হোসেন হলের ছাত্ররা।
মুশকিলটা হলো, যে নাহিদের কথা বলা হচ্ছিল সে সাবেক উপাচার্য শরীফ এনামুল কবীর সমর্থক ছাত্রলীগ গ্রুপের এক কর্মী। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বুধবার রাত ১০টার দিকেই সে ডেইরি ফার্ম গেট এলাকায় শরীফ এনামুল কবীরের জমানায় ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পারা ছাত্রলীগের আরেক গ্রুপের এক কর্মী লিখনকে ছুরিকাঘাত করে মারাত্মক আহত করেছে। এমন ষণ্ডা ছাত্রলীগ কর্মী নাহিদের গ্রেপ্তার ঠেকানোর জন্য সাধারণ ছাত্ররা পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে সেটা আমার বিশ্বাস হয়নি... এখনো হচ্ছে না। তাহলে কেন এই প্রতিরোধ... আমার মনে হচ্ছে এর জবাবটি রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের নির্বুদ্ধিতা এবং ফাঁদে পা দেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষার মধ্যে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণটি হলো, সাদা পোশাকের কয়েকজন পুলিশ রাতে হলে ঢুকে নাহিদকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, গেটের সামনে তার এক বন্ধু শামীম নাহিদকে জিজ্ঞাসা করল, এত রাতে সে কোথায় যাচ্ছে... নাহিদ জবাব না দিয়ে লোকগুলোর সঙ্গে হাঁটতে থাকে। কিছুটা সামনে গিয়ে হঠাৎ সে চিৎকার করে বলে আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে... তোরা আমাকে বাঁচা। বিমূঢ় শামীম ছুটে যায় লোকগুলোর দিকে... ধস্তাধস্তি চলে। চিৎকার শুনে হল থেকে অন্য ছেলেরাও নেমে এলে শর্টগানের গুলি ছোড়ে পুলিশ। আর এতেই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক জায়গায় ভাঙচুর হয়েছে রাতের বেলাতেই। এর মধ্যে কয়েকটি জায়গায় হামলা-ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নাকি পরিকল্পিত ভাঙচুর তার সুরাহা করতে পারিনি। যেমন জহির রায়হান মিলনায়তন, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র এমন কিছু স্থাপনা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়া ছাত্ররা নিজেদের 'সাধারণ' পরিচয় তুলে ধরতে মরিয়া ছিল, দুয়েকটি টেলিভিশনে ছাত্রলীগের নাম প্রচার হওয়ায় তারা প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল, আমরা যাওয়ার আগে তারা আরেকটি টেলিভিশনের গাড়িকে ধাওয়া করে তাড়িয়েও দিয়েছিল। সংবাদকর্মীদের ওপর ছিল তাদের চরম ক্ষোভ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেওয়া এবং বিক্ষোভকারীদের 'সাধারণ' পরিচয় তুলে ধরার শপথ নেওয়ার পরই কেবল তারা আমাদের গাড়িটিকে ক্যাম্পাসে ঢোকার পথ করে দেয়। আরেকটি অবাক করা বিষয়, রাত ৪টার দিকে বটতলায় খেতে গিয়ে দেখি অন্যান্য হলের ছেলেরা দেদার খাওয়া-দাওয়ায় মশগুল। এমনকি অনেকে আমাদের কাছে জানতে চাইছিল মহাসড়কে কী ঘটছে এখন!
আমার বারবারই মনে হয়েছে, শিক্ষকদের একটি পক্ষ বেশ ভালোভাবেই ক্যাম্পাস সম্পর্কে নতুন উপাচার্যের অনভিজ্ঞতার সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছে। ছাত্রলীগের একটি পক্ষও সফল হয়েছে সাধারণ ছাত্রদের একটি অংশকে ব্যবহার করায়। নাহিদকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়ার কথা উপাচার্য সৈয়দ আনোয়ার হোসেন নিজেই আমাকে বলেছেন। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে রাতের বেলাতেই কেন সাদা পোশাকের পুলিশের হলে অভিযান চালানো জরুরি হয়ে পড়ল প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে উঠবে। সৈয়দ আনোয়ার হোসেন হয়তো উপাচার্য মেয়াদের শুরু থেকেই কঠোরতার প্রমাণ রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। ভোর ৫টার দিকে সাভারের এনাম ক্লিনিকে তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলাম। ক্লিনিকের বাইরে কাচ ভাঙা অবস্থায় পড়েছিল তাঁর গাড়িটি। আহত ছেলেদের রক্তের কিছুটা তাঁর শার্টে দেখতে পাচ্ছিলাম। আনোয়ার হোসেন বলছিলেন, পুলিশকে গুলি চালানোর কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি, কেন এটা ঘটল তদন্তের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়কে তিনি বলছেন। এ ঘটনার পেছনে কারো উস্কানি আছে কি না, তাও তদন্ত করা হবে বলে জানালেন তিনি।
পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দেওয়া হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, পুলিশ দিয়ে যে সমস্যার সমাধান হবে না, তা তিনি সরকারকে জানিয়ে দিয়েছেন। ক্যাম্পাসের আশপাশ থেকে তাই পুলিশ সরে গেছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দীর্ঘসময় বন্ধ থাকলেও পুলিশকে তিনি দূরে রাখতেই চান। তবে অবস্থা শান্ত না হলে শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও জানালেন তিনি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে উপাচার্যের সেই ঘোষণাই আনুষ্ঠানিকভাবে শুনতে পেলাম...

No comments

Powered by Blogger.