আইন না মানায় সেরা রাস্তার ‘লাটভাই’ মোটরসাইকেল- বেপরোয়া চলাচল ২ by রাজন ভট্টাচার্য

ঢাকার রাস্তার ‘লাটভাই’ হিসেবে পরিচিত মোটরসাইকেল চালকরা! আইন না মানার দিক থেকেও সেরা। লাল বাতি কিংবা ট্রাফিক পুলিশের হাত সামনে যাই থাক কেনÑ কিছুতেই পরোয়া করার সময় নেই। ফাঁক পেলেই বেপরোয়া টান। ফুটপাথে অহরহ চলছে বাইক। উচ্চ আদালতের নির্দেশ পর্যন্ত স্পর্শ করে না এই পরিবহনের চালকদের।


সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যেসব যানবাহন বেশি দায়ী এর মধ্যে মোটরসাইকেল অন্যতম। বাইকের সামনে পুলিশ, সাংবাদিক, এ্যাডভোকেট, ডাক্তারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশার লোগো সাঁটিয়ে আইনের তোয়াক্কা করছেন না চালকরা।
সরকারী হিসেবে রাজধানীতে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বিভিন্ন ধরনের পরিবহনের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মোটরবাইক। বেসরকারী বিভিন্ন হিসেবে রাজধানীতে বাইকের সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৩০ ভাগ চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই। দিনে ২০০ বিভিন্ন ধরনের পরিবহনের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেল।
এ প্রেক্ষাপটে করণীয় আসলে কী? কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বাইক চালকদের। পরিবহন বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কঠোর আইন প্রয়োগ করলেই বেপরোয়া চালকদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিআরটিএ’র মোটরযান অধ্যাদেশ আইন ও ট্রাফিক আইনে চালকদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারও কারও পরামর্শ, প্রয়োজনে ট্রাফিক আইন সংশোধন করে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাসের জেলের বিধান রাখার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে।
আপনি নিয়ম অনুযায়ী ফুটপাথ ধরে কিংবা রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। যে কোন সময় গায়ে উঠে যেতে পারে রাস্তার আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত বাইক। আপনি আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকলেও চালকের কিছু যায়-আসে না। তিনি নাকে তেল দিয়ে নিশ্চিন্তে চলে যাবেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই। রাস্তায় বের হলে এ চিত্র অহরহ চোখে পড়বে। উল্টো দিক থেকে আসা। ফুটপাথের ওপর দিয়ে চলা। হেলমেট ব্যবহার না করা। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলা। অতিরিক্ত লোক নিয়ে চলা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই এসব কিছু চালিয়ে যাচ্ছেন মোটরসাইকেল চালকরা।
বাংলামোটরে যখন ট্রাফিক সিগন্যাল, অর্থাৎ লাল বাতি জ্বলে ওঠার পাশাপাশি ট্রাফিক দু’হাত তুলে গাড়ির সামনে হাজির। ঠিক তখন সিগন্যাল অমান্য করেই কয়েকটি মোটরসাইকেল শোঁ শোঁ শব্দে চলে গেল! ঘটনা সোমবার দুপুরের। প্রায় এক ঘণ্টা সময়ে ২০টি সিগন্যালের প্রত্যেকটিতেই এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। আর সিগন্যাল যখন চলছিল তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা চালকের যেন তর সইছিল না। পাশেই ফুটপাথ, তাই সারি বেঁধে মোটরসাইকেল চলছে। যতদূর সামনে যাওয়া যায়! কিন্তু কে জানত এতে দুর্ঘটনা ঘটবে। সত্যিই ঘটলও তাই। ফুটপাথে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় মোটরসাইকেল গিয়ে উঠল পথচারী শরিফ ও কাদেরের গায়ের ওপর। আহত হলেন দু’জনেই। চালক নিশ্চিন্তে গাড়ি টেনে চলে গেলেন।
বাংলামোটর থেকে মগবাজার মোড় পর্যন্ত মোটরবাইক মেরামতের দোকান শতাধিক। এসব দোকানের মেকানিকরা বাইক মেরামত হলো কিনা তা পরীক্ষা করে দেখে মূল সড়কে। বাংলামোটর-মগবাজারের রাস্তাটি রাজধানীর ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার একটি। অথচ এই পরীক্ষাটি করার কথা খোলা মাঠে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই এই কাজটি দিনের পর দিন চলছে রাস্তায়। বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে প্রতি মাসে এই সড়কে অন্তত ৫০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। সব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী এলাকার বাইক মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট, কাওরানবাজার, মতিঝিল, মালিবাগ, মগবাজার, মৌচাক, শান্তিনগর, কাকরাইল সবখানেই চোখে পড়বে মোটরসাইকেল চালকদের আইন না মানার দৃশ্য। একটু ফাঁকা জায়গা পেলেই অন্য পরিবহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা, যানজট সৃষ্টি, দুর্ঘটনা, সিগন্যাল না মানা, বেপরোয়া গতিতে চলাচল, চালকের আসনে বসে মোবাইল ফোন ও এয়ারফোনে কথা বলা, লাইনেসন্স ছাড়াই গাড়ি চালানো, তিনজন চলাসহ মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন শেষ নেই। বলতে গেলে সাধারণ পথচারীসহ অন্যান্য পরিবহন চালক ও যাত্রীদের কাছে মোটরসাইকেল এখন আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূলত এ কারণেই দিন দিন বাড়ছে দুর্ঘটনার সংখ্যাও। পুলিশ বিআরটিএসহ সাধারণ পথচারীদের ভাষ্য, রাজধানীতে আইন অমান্যের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে মোটরসাইকেল চালকরা। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর দিক থেকেও অবস্থান শীর্ষে। এর পরপরই সরকারী পরিবহন চালকরা সবচেয়ে বেশি ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেন। প্রশ্ন হলো, মোটরসাইকেল চালকদের নিয়ন্ত্রণে কি কোন আইন নেই? কিংবা তারা কি সকল আইনের উর্ধে?
মোটরসাইকেল দুই লাখ
৬৮ হাজার
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত মোটরসাইকেলের সংখ্যা দুই লাখ ৬৮ হাজার ২৯৫টি। বেসরকারী পরিসংখ্যানে এর পরিমাণ পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে। এই পরিবহনের চালকদের বেশিরভাগই পরিবহন আইন, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অবগত নয়। অথচ ভঙ্গের দায়ে ট্রাফিকসহ মোটরযান আইনে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। বিআরটিএ বলছে, জনবল কম থাকার পরও তারা আইন মানাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের ভাষ্য, তারাও থেমে নেই। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের জুন মাস পর্যন্ত রাজধানীতে রেজিস্ট্রেশনকৃত পরিবহনের সংখ্যা ছয় লাখ ৪৩ হাজারের বেশি।
আইনে যা আছে
যানবাহন চালানোর সময় মুঠো ফোন বা এয়ারফোন কানে ব্যবহার মোটরযান আইনে নিষিদ্ধ। এই আইন অমান্য করলে কারাদ--অর্থদ-, এমনকি উভয দ-ে দ-িত করার বিধান আছে। কিন্তু চালকদের আইনের প্রতি কোন তোয়াক্কা নেই। আইন ভাঙ্গার প্রবণতা রোধে নেই কার্যকর তেমন কোন পদক্ষেপ।
মোটরযান বিধি ১৯৪০-এর ১৫৫ ধারায় যানবাহন চালানো অবস্থায় এয়ারফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এ বিধি ১৯৮৩ সালে মোটরযান অধ্যাদেশে পরিণত হয়। বিআরটিএ ২০০৭ সালে অধ্যাদেশের এ সংক্রান্ত ধারা সংযোজন করে এয়ারফোনের সঙ্গে মুঠোফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। আইন অনুযায়ী কোন চালক চলন্ত অবস্থায় এয়ারফোন বা মুঠোফোন ব্যবহার করলে এক মাসের কারাদ-, ৫শ’ টাকা জরিমানাসহ উভয় দ-ে দ-িত করা যাবে। কিন্তু বিআরটিএ জনবল কম থাকার কারণে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা সম্ভব হয় না।
পাশাপাশি আইন না মানায় কোন মোটরসাইকেল চালককে জেল দেয়ারও নজির নেই। এছাড়া মোটরযান আইনÑ ১৯৮৩-এ বলা আছে, লাইসেন্সবিহীন বা ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালালে চালক ও মালিক উভয়েরই শাস্তির বিধান আছে। আইনের ১৩৮ ধারায় বলা হয়েছে, ‘লাইসেন্স ছাড়া কেউ মোটরযান বা যাত্রীবাহী মোটরযান চালাইলে বা চালনা করতে দিলে সর্বোচ্চ চার মাসের কারাদ- অথবা ৫শ’ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।’
এ প্রসঙ্গে বিআরটিএ ম্যাজিস্ট্রেট তোফায়েল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, দুর্ঘটনা রোধে সবার আগে জরুরী জনসচেতনতা। তবে মোবাইল কোর্ট চালানোর সময় মোটরসাইকেল চালকরা আইন ভঙ্গ করতে দেখলে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। ফুটপাথ দিয়ে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। হেলমেট না থাকলেই মোটরসাইকেল চালকদের ধরা হচ্ছে। এছাড়া মোটরসাইকেলে তিনজন ওঠা, সবার হেলমেট ব্যবহার না করা, চলন্ত অবস্থায় এয়ারফোন, মুঠোফোনের ব্যবহার সবকিছুই আইনত অপরাধ।
তিনি বলেন, যেসব রাস্তায় বেশি যানজট হয় এসব রাস্তার ফুটপাথ দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচল করে। আমাদের সমস্যা হলো, জামের মধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া আরোহীদের অনেকেই হেলমেট মাথায় দেন না। মোটরসাইকেলে চলার সময় মহিলা ও শিশুদের হেলমেট ছাড়াই চলতে দেখা যায়। এটা যে আইনগত বৈধ নয় তা অনেকেই জানেন না। আমরা জনসচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সকলের সহযোগিতা পেলে আইন বাস্তবায়ন কোন বিষয় নয়।
তিনি বলেন, ১৯৮৩ সালের মোটরযান আইন অনুযায়ী ৫শ’ টাকা জরিমানা ও সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদ- দেয়ার বিধান আছে। কিন্তু মোটরসাইকেল চালকদের আইন অমান্য করার অপরাধে কারাদ- দেয়া হয় না। তাহলে এটি হবে লঘু পাবে গুরুদ-ের শামিল। আমরা চেষ্টা করছি সবাইকে আইন মানাতে বাধ্য করতে। তিনি বলেন, বিআরটিএ পাশাপাশি পুলিশও ট্রাফিক আইন অমান্যের অভিযোগে মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। ট্রাফিক পুলিশের জন্য এ সুযোগটি সবচেয়ে বেশি। কারণ আমাদের চেয়ে পুলিশের জনবল অনেক বেশি। পুলিশ অফিসারদের যে কেউ আইন ভঙ্গের কারণে মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে জরিমানা করতে পারে; করতে পারে মামলাও।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকাসহ দেশের ৬১ ভাগ চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন। এ কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনার মাত্রা। সরকারী গবেষণায় বলা হচ্ছে, জাল ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স, অদক্ষ গাড়ি চালক, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, সড়ক নিরাপত্তার অভাব, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, মোটরযানের ত্রুটিসহ নানা কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী গাড়ি, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের সর্বোচ্চ ৭০ মাইল, মধ্যম আকারের কোস্টার ৩৫ মাইল, মালবাহী যানের ১০-৩৫ মাইল গতিসীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ পরিবহন চালকদের এসব নিয়মনীতির কোন তোয়াক্কা নেই। অনেকেই আছেন এসব জানেন না।
সম্প্রতি রাজধানীর ফুটপাথ দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয় পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহকে। কিন্তু নির্দেশনার বাস্তবায়ন নেই। জনবল সঙ্কটের কারণে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে পারছে না পুলিশ। বিআরটিএ বলছে, জনবল সঙ্কটের কারণে তাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা সম্ভব নয়। সর্বোপরি চালকদের সবাই উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছেন। যাদের হাতে বাইক আছে তাদের ভাবখানা এমন যেÑ তাদের আইন, নিয়ম তোয়াক্কা করার প্রশ্নই ওঠে না। প্রশ্ন হলো, এবাবে আর কত দিন?

No comments

Powered by Blogger.