ভূত আমার বন্ধু by সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্

বইমেলা থেকে অনেক বই এনেছিলাম। একটি ভূতের বইও এনেছি। বইয়ের ভেতরে আছে ভূতের অনেক ছবি। স্কুলের পড়া শেষ করে ভূতের বইটি নিয়ে বসলাম। গভীর রাত। বইটির পাতা ওল্টাতেই হি-হি হা-হা হাসির আওয়াজ পেলাম। মনে হলো, আমার পড়ার টেবিল থেকে আওয়াজ আসছে। আমি টেবিলের ওপরে-নিচে দেখলাম।


নাহ্, কিছু নেই। মনে হয় ভুল শুনেছি। আবার পাতা ওল্টাতে লাগলাম। আবারও হাসির আওয়াজ। এবার কিত কিত করে হাসির শব্দ পেলাম। বইটি পট করে বন্ধ করলাম ভয়ে। কে হাসে? কাউকে দেখছি না আশপাশে। তাহলে এমন করে কে হাসল?
বইটি হাতে নিয়ে ভয়ে ভয়ে খুললাম আবার। মন দিয়ে একটা গল্প পড়ছি। ওম্মা! বইয়ের পাতায় আঁকা ছবিটা কেমন জানি নড়েচড়ে উঠল! ভাবলাম, আমার চোখের কোনো সমস্যা। চোখ দুটো কচলে ফ্রেশ হয়ে বসলাম। নাহ্, আঁকা ছবিগুলো কেমন জানি নড়াচড়া করছে। হাসছে। পাতায় আঁকা একটা ভূতের ছবি। ভূতের ঠোঁটটা কেমন নড়ে উঠল! আমি আঙুল দিয়ে ঘষা দিলাম। দেখি হাতে টের পাওয়া যায় কি না। না, সব তো দেখি ঠিকঠাকই আছে। তো, ছবিটা এমন দেখাচ্ছে কেন?
মনের ভুল হবে হয়তো। এসব মনে করে আবার পড়তে লাগলাম বইটি। একি! পাতায় আঁকা ভূতের একটা হাত লিকলিক করে লম্বা হয়ে আমার মুখের কাছে চলে এল। তারপর আমাকে হালকাভাবে আদর করতে লাগল! আর ভূতের হাসিটাও ছিল খুব সুন্দর। মায়া মায়া হাসি। আমি খুব একটা ভয় পাইনি। ভূতের আঙুলগুলো খুব চমৎকার। তিনটা আঙুল। চিকন, লম্বা আর নরম তুলতুলে। মনে হচ্ছে, একটা শিশু আমাকে আদর দিচ্ছে। আমি স্বপ্ন দেখছি নাকি!
ভূতের বড় মুখটা আরও বড় করে হাসি দিয়ে বলে, ‘সুমা, তুমি খুব ভালো একটা মেয়ে। আর আমি ভালো একটা ভূত। আমি তোমাকে অনেক পছন্দ করি। তুমি যখন এই বই কিনেছ, তখনই মনে মনে বলেছি, সুমাকে আমি বন্ধু মানব। সে হবে আমার খুব ভালো বন্ধু।’ আমি বললাম, ‘তুমি কি সত্যি ভূত, না কার্টুন?’ ভূতটি বলল, ‘আমি মিথ্যা বলি না। এ বইয়ে যতগুলো ভূতের ছবি আছে, সবাই আমার বংশের ছেলেমেয়ে। এরা সবাই তোমাকে পছন্দ করবে। তুমি মোটেও ভয় পেয়ো না। সবাই তোমার বন্ধু হয়ে যাবে।’
ভূতের নাম শুনলে ভয়ে হাত-পা কাঁপাকাঁপি শুরু হয়। ভূত দেখলে মানুষ ভয়ে ছুটে পালায়। ভূতকে ভয় পায় না এমন লোক কি আছে? আর এখন আমি এগুলো কী শুনছি ভূতের মুখে! কী চমৎকার কথা! ভূত আমাকে পছন্দ করে। ভূত আমার বন্ধু। আমি মনে মনে হাসছি। আমার ভয় কমে গেছে। আমার খুব আনন্দ লাগছে। আমি বইয়ের আরেকটা পাতা ওল্টালাম। এ পাতায় একটা বড় ভূতের সঙ্গে আছে তিনটা বাচ্চা ভূত। পাতা ওল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে ভূতের বাচ্চাগুলো খিলখিল করে হাসতে লাগল। আমি হাসিমুখে দেখছি ওসব। বড় ভূতটা বলল, ‘বেক্কলের মতো ভেটকি পাইড়ো না। সুমাকে সালাম দেও।’ ওরা হাসতে হাসতে বলল, ‘এই ছেঁরি, তুমি কি আমগোর ছেলাম নিবা?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, নেব।’ ওরা আমার কথা শুনে আবার হাসতে লাগল। বলল, ‘ওম্মা, এই ছেঁরি জানি কেমনে কতা কয়। বেক্কল ছেঁরি।’ তখন বড় ভূতটা খুব বিরক্ত হয়ে ওদের একটা ধমক মেরে বলল, ‘এত দুষ্টুমি করছ কেন তোমরা? ও হলো সুমা। ভালো একটা মেয়ে। আমাদের সর্দার ওকে বন্ধু মেনেছে। বন্ধুকে সালাম দেও।’ বাচ্চাগুলো খুব দুষ্টু দুষ্টু। ওরা শরীর বাঁকিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে মুখ ভেংচিয়ে আমাকে বলল, ‘এই ছেঁরি, থেলাম, থেলাম।’ ওদের দুষ্টুমি দেখে আমি হেসে ফেললাম। বড় ভূতটি বলল, ‘ফাজলামি করছ কেন? সেলাম দেও, হাত মেলাও।’ বাচ্চাগুলো একসঙ্গে লতার মতো চিকন ছয়টি হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। আমি হাত মেলালাম। এ সময় ওরা আমার হাতে একটা করে চিমটি কাটল। ওরা আনন্দে নাচতে নাচতে বলল, ‘সুমাপু, আমরা তোমার কোলে উঠব।’ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘কোলে নাও।’ ওরা বইয়ের পাতায় দাঁড়িয়ে এসব বলছে। দেখতে দুই ফুট লম্বা পুতুলের মতো। আমি বললাম, ‘আরেক দিন কোলে নেব তোমাদের।’ ওরা মাথা কাত করে হাসি দিয়ে বলে, ‘চিংচিং মিং নাফাং কুলুকুলু সুমাপু।’
এভাবে সব কটি পাতার ভূতের সঙ্গে আমার অনেক কথা হলো। মজার মজার কথা। সবাই আমার বন্ধু।
আমি বললাম, ‘তোমরা কী খাও?’
ওরা বলে, ‘আমরা “পড়া” খাই।’
‘মানে?’
‘মানে বোঝো না তুমি? যখন কেউ বইটি পড়ে, তখন পড়া দেখেই আমাদের পেট ভরে যায়। বইটি পড়ে যখন বন্ধ করে রেখে দেয়, তখন আমরা চ্যাপটা হয়ে পড়ে থাকি। তখন আমাদের কষ্ট হয়।’
আমি বললাম, ‘এত কষ্ট করার দরকার কী? বই থেকে পালিয়ে চলে যেতে পারো না জঙ্গলে?’
ওরা বলল, ‘পারি, কিন্তু আমরা তা করব না।’
বললাম, ‘তোমরা এত কষ্ট করছ, তবে পালাতে পারবে না কেন? বোকা!’
ওরা বলে, ‘এ বইয়ের গল্পের সঙ্গে মিল রেখে শিল্পী আমাদের বানিয়েছেন। আমরা যদি পালিয়ে এখান থেকে চলে যাই, তবে বইটির গল্প কেউ পড়বে না। আর গল্প না পড়লে মানুষ ভূত সম্পর্কে জানতেও পারবে না। এ ছাড়া যিনি আমাদের বানালেন, তাঁর পারমিশন ছাড়া আমরা এক পা-ও নড়ব না, যত কষ্টই হোক। বুঝেছ এবার?’
আমি ওদের কথা শুনে থ হয়ে গেলাম। আমি বললাম, ‘সত্যিই তোমরা খুব ভালো ভূত। তোমরা আমার খুব ভালো বন্ধু। আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি।’
আমি স্কুলের পড়া পড়তে পড়তে মাঝেমধ্যে খুব কাহিল হয়ে পড়ি। হঠাৎ যখন কোনো কারণে আমার মন খারাপ হয়ে যায় তখন আমি আর বসে থাকি না। চলে যাই বন্ধুদের কাছে। ভূতের বইটা খুলি। ভূতের সঙ্গে গল্প করি। দুষ্টুমিও করি। ওরা অনেক সুন্দর করে গল্প করতে পারে। ওদের সঙ্গে কথা বলে আমার মন একদম ভালো হয়ে যায়। ওরা আমার কী চমৎকার বন্ধু!

No comments

Powered by Blogger.