গণতন্ত্র ও শান্তির জয় হোক-মুক্ত অং সান সু চি

শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অকুতোভয় যোদ্ধা ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সান সু চিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে সে দেশের সামরিক সরকার। বিশ্বের শান্তিকামী কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও মুক্ত আলোয় মুক্ত মানুষ অং সান সু চিকে স্বাগত জানাই।


১৫ বছরের অধিক সময় ধরে গৃহান্তরীণ অং সান সু চির ত্যাগ ও সংগ্রামের সঙ্গে কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার কারাবাসেরই তুলনা চলে। ম্যান্ডেলা বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ২৭ বছর অন্তরীণ ছিলেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনসহ বিশ্বনেতারা অং সান সু চির মুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের লড়াইয়ে যাঁরা বিশ্বাসী, তাঁদের সবার অনুপ্রেরণার উৎস এই নেত্রী।
১৯৮৮ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি নিরঙ্কুশ জয় পেলেও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। অং সান সু চিকে গৃহান্তরীণ রেখে তারা গণতন্ত্রকামী মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। গত ৭ নভেম্বর সেখানে সামরিক জান্তার নীলনকশা অনুযায়ী যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতেও অংশ নিতে দেওয়া হয়নি সু চিকে। তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি এখনো নিষিদ্ধ। সামরিক জান্তা দমন-পীড়ন চালিয়েও মিয়ানমারের জনগণকে তাদের প্রিয় নেত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। শত অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করেও তারা অং সান সু চির পাশে থেকেছে।
অং সান সু চির মুক্তির মধ্য দিয়ে আশা করা যায়, মিয়ানমারে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটবে। নির্বাচন যত লোক দেখানোই হোক না কেন, নির্বাচিত সরকার জনগণের বাক ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেবে। অং সান সু চি মুক্তি পেলেও তাঁর হাজার হাজার অনুসারী এখনো জেলে। অবিলম্বে তাঁদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষ এও প্রত্যাশা করে, অং সান সু চির ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে এবং তিনি একজন মুক্ত মানুষ হিসেবে সব অধিকার ভোগ করবেন।
অস্বীকার করার উপায় নেই, মিয়ানমারের সামরিক শাসকের গণবিরোধী নীতি ও কর্মকাণ্ডের ফলে দেশটির কোটি কোটি মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মিয়ানমার পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র দেশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকলেও জান্তা সরকার সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে।
আমাদের উদ্বেগের আরও কারণ হলো, রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে মিয়ানমার থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে বছরের পর বছর ভরণপোষণ করা দরিদ্র বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। জাতিসংঘের অব্যাহত চাপ ও কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও শরণার্থীদের ফিরিয়ে না নেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। আশা করব, মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।
গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সু চির মুক্তির মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের নবযুগের সূচনা ঘটবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। জয় হোক গণতন্ত্রের, জয় হোক গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সু চির।

No comments

Powered by Blogger.