বিশেষ সাক্ষাৎকার-ট্রানজিট আর্থিকভাবে লাভজনক by মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ রহমতউল্লাহর জন্ম ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ১৯৬২ সালে বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে প্রভাষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিক ডিজাইনে মাস্টার্স ডিগ্রি ও একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেন পরিবহন পরিকল্পনার ওপর।


এরপর পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে ১৯৭৮ সালে যোগ দেন ইউএন-এসকাপের পরিবহন ও অবকাঠামো বিভাগে। সেখানে ২২ বছর দায়িত্ব পালন শেষে বিভাগের পরিচালক হিসেবে তিনি অবসর নেন ২০০০ সালে। এর পর থেকে তিনি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। ড. রহমতউল্লাহ দেশের পরিবহনসংক্রান্ত নানা নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং করে চলেছেন।
 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া

প্রথম আলো  ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট বলতে আগে শুধু ভারতকে এ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বোঝাত। এখন বিষয়টি আর শুধু ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আটকে নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নেপাল ও ভুটান। এই গুণগত পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  এই পরিবর্তনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক। আপনি ঠিকই বলেছেন, একসময় ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্টের বিষয়টিকে শুধু ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখন এটি একটি উপ-আঞ্চলিক বিষয়। ভারত শুরুতে শুধু নিজেদের ট্রানজিটের ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। এটা বলতেই হবে যে বাংলাদেশের উদ্যোগের কারণেই এটি উপ-আঞ্চলিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নেপাল ও ভুটান বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করতে চাইছিল, ভারত তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিতে না চাইলে এটা সম্ভব হতো না। ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী হওয়ায় ও কার্যত বাংলাদেশের চাওয়ার কারণেই ট্রানজিটের বিষয়টি উপ-আঞ্চলিক রূপ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ভারত সফরে গিয়েছিলেন, তখন তিনি নেপাল ও ভুটানের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছিলেন।
প্রথম আলো  এই যে উপ-আঞ্চলিক ট্রানজিট হতে যাচ্ছে তার জন্য বেশ কিছু রুট ও করিডোর ঠিক করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই ট্রানজিটের অর্থনৈতিক দিকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রুটগুলো লাভজনক হবে কি না সেটা বড় বিবেচ্য বিষয়। সে ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত এই রুটগুলোকে কোন বিবেচনা থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়েই রুটগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক দিকটি অবশ্যই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে আমাদের বন্দর ও কলকাতায় আসা-যাওয়ার বিষয়টি রুটগুলো নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আবার আমাদের বন্দর থেকে নেপাল ও ভুটানে মালামাল আনা-নেওয়ার বিষয়টিও একই সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বর্তমান সড়ক, রেল ও নৌরুট মিলিয়েই এগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রথম আলো  যে রুটগুলো চিহ্নিত হয়েছে, অবকাঠামোগতভাবে বর্তমানে তা ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্টের বাড়তি চাপ নিতে কতটুকু সক্ষম?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  সড়ক, রেল ও নৌপথ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই বর্তমান যে অবকাঠামোগত সুবিধা আমাদের রয়েছে, তাতে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। নৌপথে ভারতের সঙ্গে আমাদের ট্রানজিট দেওয়া আছে সেই ’৭২ সাল থেকে। এর ব্যবহার কম, কারণ নৌপথে পণ্য পরিবহনের গতি অনেক ধীর, রাতে চলাচল করা যায় না। এ ছাড়া নাব্যতার সমস্যা প্রায়ই দেখা দেয়। অন্যদিকে সড়কপথের ক্ষেত্রেও বেশ দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের সড়কপথ বর্তমানে যে পরিমাণ লোড নিতে সক্ষম, তা যথেষ্ট নয়। আমাদের রাস্তাগুলো তৈরি হয়েছে সর্বোচ্চ আট টন পণ্যবাহী ট্রাকের জন্য। কিন্তু ভারতের রাস্তাগুলো ১২ টন পণ্যবাহী ট্রাকের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। ১২ টন পণ্য নিয়ে ভারতীয় ট্রাকগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করলে আমাদের রাস্তাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে জন্য সরাসরি ভারতীয় ট্রাক আপাতত বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া ঠিক হবে না। সড়কপথে শুরু করতে হলে ট্রানশিপমেন্ট দিয়ে শুরু করতে হবে। অর্থাৎ ভারতীয় ট্রাক থেকে পণ্য নামিয়ে আমাদের ট্রাক দিয়ে তা পরিবহন করতে হবে।
প্রথম আলো  ট্রাক পরিবর্তন করতে গেলে একদিকে বেশি সময় লাগবে, অন্যদিকে খরচও বেড়ে যাবে।
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  শুরুতে এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এ ধরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হচ্ছে যৌথ ট্রাক বা পরিবহন কোম্পানি। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান মিলিয়ে একটি যৌথ ট্রাক কোম্পানি হতে পারে। যার অধিকাংশ শেয়ার থাকবে বাংলাদেশের। এই ট্রাকগুলোর যৌথ রেজিস্ট্রেশন থাকবে। চারটি দেশেই ট্রাকগুলো প্রবেশ করতে পারবে। ট্রাকগুলো হবে মাঝারি ধরনের মাল্টি এক্সেল ভেহিকেল। ট্রাকগুলোর একটি বিশেষ রং থাকবে, যাতে সহজেই এগুলোকে চেনা যাবে। আগেই বলেছি, এই যৌথ পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব থাকবে বাংলাদেশের হাতে। উপ-আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন শুরু করতে গেলে প্রাথমিক পর্যায়ে ট্রানজিটের পরিবর্তে ট্রানশিপমেন্ট দিয়ে শুরু করতে হবে।
প্রথম আলো  ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট যা-ই হোক, এতে নির্ধারিত রুটে আমাদের সড়কগুলোতে ট্রাকের সংখ্যা তো বেড়ে যাবে, সে ক্ষেত্রে এসব সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কী উদ্যোগ নেওয়া উচিত?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের জাতীয় মহাসড়কগুলোকে এক্সপ্রেসওয়ে করতে হবে। আমাদের জাতীয় মহাসড়কগুলোর জন্য বর্তমানে ৪০ মিটার জায়গা অধিগ্রহণ করা আছে। এই জায়গাকেই কাজে লাগাতে হবে। কারণ নতুন কোনো জমি অধিগ্রহণের সুযোগ নেই। জাতীয় মহাসড়কগুলো মাঝখান দিয়ে প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ-সুবিধাসহ উন্নত মানের এক্সপ্রেসওয়ে করতে হবে। এই সড়ক বেড়া দিয়ে সংরক্ষিত থাকবে ও টোল দিয়ে এই পথে চলাচল করতে হবে। দুই পাশে সাধারণ সড়ক থাকে, যেখান দিয়ে সাধারণ যানবাহন টোল ছাড়া চলাচল করবে। তবে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়কপথের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেশি।
প্রথম আলো  সে ক্ষেত্রে কি আপনি রেলপথের ওপর গুরুত্ব দিতে চাইছেন?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহনের রেল হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর পথ। বর্তমানে আমাদের যে রেলওয়ের অবকাঠামো আছে তাতে ট্রানজিটের কাজে রেলওয়েকে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের বর্তমান রুটে একটি নতুন ট্রেন সংযোজন করার ক্ষমতাও নেই। এটা করতে হলে বেশ কয়েকটি স্থানে আমাদের রেললাইন ডাবল ট্র্যাক করতে হবে। ইতিমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে তিনটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। চিংকি আস্তানা-লাকসাম, লাকসাম-আখাউড়া ও ভৈরব বাজার থেকে টঙ্গী—এই তিনটি স্থানে ডাবল ট্র্যাক করতে হবে। দাতারা এ জন্য অর্থ জোগান দিতে আগ্রহী, তবে তাদের কিছু শর্ত রয়েছে। রেলওয়ের সংস্কার এর মধ্যে অন্যতম। তারা চায় রেলওয়েকে একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে চলতে হবে। আয়-ব্যয়ের আলাদা হিসাব থাকতে হবে। একটি কোম্পানি হিসেবে এর ব্যবস্থাপনা চলতে হবে অনেকটা বেসরকারি খাতের মতো। নিয়োগ ও বরখাস্তের ক্ষমতা কোম্পানির হাতে থাকতে হবে। তবে মালিকানা সরকারের হাতেই থাকবে। ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি আগে রেললাইন ছিল এখন নেই এমন কিছু মিসিং লিংক নতুন করে সংযুক্ত করতে হবে। একসময় কুলাউড়া থেকে মহীশাসন পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটারের যে রেললাইন ছিল, তা এখন আর নেই। আখাউড়া থেকে আগরতলা পর্যন্ত রেল সড়কেরও একই অবস্থা, যা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। এ ছাড়া যমুনার পশ্চিম পারে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ডাবল লাইন করতে হবে।
প্রথম আলো  সড়কের ক্ষেত্রে বর্তমান জাতীয় সড়কগুলোর উন্নয়ন ছাড়া কি আর কিছু করার নেই?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  সড়ক খাতেও কিছু সমস্যা রয়েছে। কিছু রাস্তা নতুন করে করতে হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কুমিল্লা, আগরতলা সীমান্ত থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত, সুতারকান্দি থেকে সিলেট আর পদ্মা সেতু হয়ে গেলে ভাঙ্গা-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের প্রয়োজন পড়বে।
প্রথম আলো  এসব অবকাঠামো নির্মাণের জন্য তো অনেক অর্থের প্রয়োজন পড়বে। ভারত, নেপাল বা ভুটানকে ট্রানজিট দিয়ে কি সে খরচ ওঠানো সম্ভব?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  রেল ও সড়ক অবকাঠামো ক্ষেত্রে যেসব করণীয় উল্লেখ করেছি, তা ট্রানজিটের বিষয়টি বাদ দিলেও আমাদের নিজেদের জন্যই প্রয়োজনীয়। আমাদের মহাসড়কগুলোর উন্নয়ন ও রেললাইনের ডাবল ট্র্যাক আমাদের নিজস্ব চলাচল ও পণ্য পরিবহনের জন্যই করতে হবে। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে আমরা ট্রানজিটের জন্য যে বাড়তি ট্রাফিক গ্রহণ করব, সেটা আমাদের লাভ হিসেবে বিবেচিত হবে। আমাদের ধারণা, ট্রানজিটের জন্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অতিরিক্ত ট্রাফিকের চাপ আমাদের নিতে হবে। এই বাড়তি ট্রাফিক থেকেই আমাদের লাভ করতে হবে, হিসাবটিও সে বিবেচনা থেকেই করতে হবে।
প্রথম আলো  ট্রানজিটের রাজস্ব আদায় হবে কোন প্রক্রিয়ায়?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  বন্দর, রেল বা সড়কসহ আমাদের যে অবকাঠামো ব্যবহার করা হবে তার জন্য ভাড়া দিতে হবে। পরিবহনের ভাড়া দিতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পণ্য পরিবহনের ফলে যে আর্থিক সাশ্রয় হবে সেটারও ভাগাভাগি করতে হবে। ধরুন বর্তমানে যে পণ্য পরিবহন করতে ১০০ টাকা লাগে, ট্রানজিটের কারণে তা হয়তো ৪০ টাকায় নেমে আসবে। সে ক্ষেত্রে এই যে ৬০ টাকা খরচ কম হলো সেটা ভাগাভাগি করতে হবে। এই ৬০ টাকার ৭০ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ ও বাকি ৩০ শতাংশ দেশ তিনটির লাভ।
প্রথম আলো  অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য তো অনেক বিনিয়োগের প্রয়োজন। এত বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  বিনিয়োগ নির্ভর করে কী প্রকল্প তার ওপর। এগুলো সবই জাতীয় প্রকল্প। কিছু ক্ষেত্রে দাতাদের প্রতিশ্রুতি আছে। ভারতের এক বিলিয়ন ডলার ঋণ-সহায়তার একটি অংশ এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের কিছু খাতে ব্যবহূত হবে। ভারতের সরাসরি কাজে লাগবে এমন সড়ক, রেল ও নৌপথ উন্নয়নের জন্যই এই ঋণ-সহায়তা কাজে লাগানো হবে। তবে এই অবকাঠামোগত উন্নয়নে সার্বিকভাবে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। কিন্তু এর বাইরেও আরও অনেক বিনিয়োগ লাগবে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাজে লাগাতে হবে। জাতীয় মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, বন্দরের অবকাঠামো বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ পাওয়া যাবে। আগরতলায় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করলে লাভ বেশি। বেসরকারি বিনিয়োগে আশুগঞ্জ বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। আমি মনে করি না যে বিনিয়োগ এ ক্ষেত্রে বড় কোনো সমস্যা হবে।
প্রথম আলো  বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে অন্য দেশের পণ্য পরিবহনের সঙ্গে নিরাপত্তার একটি সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কোনো বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন হবে কি না বা ট্রানজিটের সুযোগে এ ধরনের কোনো পণ্য বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার আশঙ্কাকে আমরা কীভাবে দূর করব?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  দেখুন, এ ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক নিয়ম রয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কী পণ্য যাচ্ছে তা দেখার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। এ জন্য যে পয়েন্টগুলো দিয়ে পণ্যবাহী পরিবহন ঢুকবে সেখানে বড় স্ক্যানার বসাতে হবে। কনটেইনার বা কাভার্ড ভ্যান ছাড়া কোনো পণ্য পরিবহন করা যাবে না। বাংলাদেশ কাস্টমস স্ক্যান করে কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনারগুলো সিল করে দেবে। ফলে অবৈধ বা নিষিদ্ধ কোনো পণ্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পরিবহন করা যেমন ঠেকানো যাবে, তেমনি বাংলাদেশেও তা ঢুকে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া এই কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনারগুলোর চলাচলের নির্দিষ্ট রুট থাকবে, এর বাইরে কোনো রুট দিয়ে তা চলতে পারবে না। আগেই বলেছি, এই বাহনগুলো বিশেষ রং বা আকারের হতে পারে যাতে সহজেই এগুলোকে চিহ্নিত করা যায়।
প্রথম আলো  ভারত, নেপাল বা ভুটানকে ট্রানজিট দেওয়ার অন্যতম দিক হচ্ছে এই দেশগুলোকে আমাদের বন্দর ব্যবহার করতে দেওয়া ও এর মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া। কিন্তু আমাদের বন্দর দুটির বর্তমান যে অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে, তাতে বাড়তি জাহাজ গ্রহণ করা কতটুকু সম্ভব?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে আপাতত কোনো সমস্যা নেই। এই বন্দরটিতে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এবং বন্দরটি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের যে ক্ষমতা তার ৪০ শতাংশ অব্যবহূত রয়েছে। সুতরাং ভারত, নেপাল ও ভুটান এই বন্দরটি ব্যবহার শুরু করলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে মংলা বন্দরের যে ক্ষমতা তার ৮০ ভাগই বর্তমানে অব্যবহূত অবস্থায় আছে। মংলা বন্দরের ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। যেমন মংলা বন্দরে পণ্যবাহী কনটেইনার স্ক্যানিং করার সুবিধা নেই, সেখানে স্ক্যানার বসাতে হবে। ড্রেজিং করতে হবে। কিছু যন্ত্রপাতিও লাগবে। এগুলো করা তেমন কঠিন কিছু নয়। এই বন্দরটি ব্যবহারের জন্য নেপাল ও ভুটানকে উৎসাহিত করতে হবে। এই বন্দরটির অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মংলা থেকে খুলনা পর্যন্ত রেলপথ তৈরি করা ও সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকেও নজর দিতে হবে।
প্রথম আলো  বলা হচ্ছে ভারত, ভুটান ও নেপালকে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট দেওয়া হলে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে। কিন্তু লাভের পরিমাণ কী হবে এমন কোনো হিসাব-নিকাশ বা কোনো সমীক্ষা হয়েছে কি?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  এ নিয়ে বিভিন্ন সমীক্ষা হয়েছে। আর্থিক লাভের পরিমাণ কত হবে তা নির্ভর করছে বাংলাদেশ দিয়ে কী পরিমাণ পণ্য পরিবহন হবে, তার ওপর। তবে সাধারণভাবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যাবহার করে পণ্য পরিবহন করলে বিভিন্ন শুল্ক, পরিবহন, পরিবহন পথের ভাড়া ও সেবা বিক্রির মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যে দেশ অন্য দেশকে এ ধরনের সুবিধা দিয়েছে সেসব দেশ আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশের লাভবান না হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে বর্তমানে আমাদের যে অবকাঠামোগত অবস্থা তাতে শুরুতেই যে খুব লাভ পাওয়া যাবে, এমনটি নয়। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট শুরু হলে আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ প্রতিবছর ৫০ থেকে ১০০ কোটি ডলার আয় করতে সক্ষম হবে।
প্রথম আলো  ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা রয়েছে। বলা হয় এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট হবে। এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  আসলে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্টের সঙ্গে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের কোনো ব্যাপার নেই। কারণ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণই বাংলাদেশের হাতে থাকবে। আমরা তো আমাদের ভূখণ্ড লিজ দিচ্ছি না। আমরা আমাদের বন্দর, সড়ক, নৌ ও রেলপথ ভারত, নেপাল ও ভুটানকে ব্যবহার করতে দিয়ে ভাড়া নেব। দেশের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব তো আমাদের হাতেই থাকবে। আমাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করার কারণে এই দেশগুলো বরং আমাদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।
প্রথম আলো  কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলে, বিশেষ করে দেশের প্রধান বিরোধী দল যদি এর বিরোধিতা করে, তবে এ ধরনের উদ্যোগ কতটুকু সফল হতে পারে?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  আসলে বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে না দেখে অর্থনৈতিকভাবে দেখতে হবে। বর্তমান সরকার যদি এই কাজটি করে এবং জনগণকে দেখাতে পারে যে এতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে, তবে এ ধরনের রাজনৈতিক বিরোধিতা তেমন কাজে দেবে না। কারণ জনগণ যদি বাস্তবে দেখতে পারে যে এতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট হওয়ার কিছু নেই বরং অর্থনৈতিকভাবে দেশ লাভবান হচ্ছে তখন নিছক রাজনৈতিক বিরোধিতার বিষয়টি তারা মানবে না।
প্রথম আলো  সার্বিকভাবে বর্তমানে আমাদের যে অবকাঠামোগত অবস্থা তাতে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু করা কতটুকু সম্ভব?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  আমাদের বর্তমান যা অবস্থা তাতে আমরা খুব বেশি চাপ নিতে পারব না। আমাদের সামর্থ্য এখন সীমিত। অবকাঠামোগত যে উন্নয়নের কথা বললাম সে জন্য তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। তবে এ জন্য একদিকে যেমন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তেমনি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রথম আলো  বর্তমানে এ ক্ষেত্রে কাজ যেভাবে এগোচ্ছে তা কি সন্তোষজনক?
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  এখন পর্যন্ত যত দূর জানি কাজ ঠিকমতোই চলছে। তবে আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে আরও গতিশীলতা দরকার।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ  ধন্যবাদ।

No comments

Powered by Blogger.